বার্সিলোনায় সাতদিন…এক

ডা: অনির্বাণ ঘোষ

এক.

ফ্লাইটটা বেশ ঝাঁকুনি দিয়ে বার্সিলোনার মাটিতে নামলো। আমি আর জয়িতা দুজনেই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। বেটু কিন্তু খুব গম্ভীর মুখে বললো,
‘ এতক্ষণ ফ্লাই করে এলো তো, তাই এরোপ্লেনটার ব্যাটারি কমে গেছে। ডোন্ট ওরি মাম্মা।’

এবারের ট্রিপটা নিয়ে বেটু খুব এক্সাইটেড। স্কুলের সব বন্ধুদের বলে এসেছে বার্সিলোনা যাচ্ছে। একটা পিঙ্ক রঙের ব্যাকপ্যাক নিয়ে এসেছে আবার। বার্সিলোনার বিচে নেমে চান করা হবে, তারজন্য স্যুইমস্যুটও আনা হয়েছে। যদিও সমুদ্রের জল এখন খুব ঠান্ডা থাকার কথা। আদৌ চানটা হবে বলে মনে হচ্ছে না।

এয়ারপোর্ট থেকে মিনিট দশেক হেঁটেই ট্রেন স্টেশন। টিকিট কেটে প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন এসে গেল। ট্রেনটা দারুণ ভাল ছিলো, স্যুইজারল্যান্ডের ট্রেনগুলোর মতো চওড়া আর পরিষ্কার। তিরিশ মিনিটের ট্রেন জার্নির শেষে দশ মিনিটের মেট্রো, তারপরে পাঁচ মিনিট হাঁটা, ব্যাস চলে এলাম আমাদের বিএনবিতে।

আমরা ইউরোপে বেড়াতে এলেই এয়ারবিএনবিতে থাকি। দেশের অনেকে এখনও হয়তো এর সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের জন্য বলি, ধরুন আপনার বাড়িতে একটা আলাদা বেডরুম আছে যেটা আপনি ব্যবহার করেন না, অথবা একটা ফ্ল্যাট পড়ে আছে ফাঁকা। সেটা আপনি ট্যুরিস্টদের থাকার জন্য দিতে পারেন। এতে আমাদের মতো ট্যুরিস্টদের অনেক সুবিধা। হোটেলের থেকে অনেকটাই সস্তা, তাছাড়া বেশির ভাগ জায়গায় রান্নাঘরটাও ব্যবহার করা যায়। যেটা বাচ্চা নিয়ে ঘুরতে এলে খুব দরকারী হয়ে পড়ে। আমরা এখন আছি এনরিকের বাড়িতে।

এনরিকের বয়স দেখলাম ষাটের কাছাকাছি। স্ত্রী এর সঙ্গে থাকে৷ আর থাকে একটা বিশাল বড় সাদা রঙের কুকুর। কুকুর না বলে ভাল্লুকও বলা যায়। এনরিকে কিংবা ওর স্ত্রী কেউই একবর্ণ ইংরাজী বলে না। তাই আমাদের কথোপকথন ‘ওলা’ তে শুরু হয়েই সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে মুভ করলো। আমার বউ ভুত,পুলিশ,তিনোমুল কাউকে ভয় পায় না। পায় শুধু দুটো জিনিসকে। একনম্বর হলো ব্রণ আর দু’নম্বর হলো কুকুর। মেয়েও মায়ের এক্কেবারে ডুপ্লিকেট এ ব্যাপারে। সারাদিনই দু’জনকে পালা করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যাই হোক, এনরিকের কুকুরকে দেখে দুজনেই বাড়ির চৌকাঠেই দাঁড়িয়ে রইল। এনরিকের স্ত্রী এর দিকে তাকিয়ে আমি হাত পা নেড়ে কুকুর দেখিয়ে অনেক বার শুঃ শুঃ বলার পরে তিনি হেলে দুলে ভিতরের একটা ঘরে ঢুকলেন। আর আমিও দার,কন্যা সমেত এনরিকের বাড়িতে ঢোকার সুযোগ পেলাম।

বাড়ির দোতলার একটা ঘর আমাদের জন্য বরাদ্দ এখানে। বেশ ভাল ঘরটা, এসি আছে, মাইক্রোওয়েভ আছে,ফ্রিজ আছে। আর আছে প্রাইভেট বাথরুম। বাথরুমে চান করা, পটি করার জায়গা ছাড়াও হাগু করে পশ্চাদদ্বার ধোয়ার জন্য একটা আলাদা ব্যবস্থা আছে, অনেকটা কোমডের মতোই দেখতে। এমনটা আমরা ইতালিতেও দেখেছিলাম। তবে বাথরুমের আর একটা অবাক করা জিনিস দেখলাম, দেওয়াল ঝোলানো একটা ছবি। আমাদের দেশের, জলরঙ করা মনে হলো। ছবিটার উৎস আমি ভালো বুঝতে পারিনি। নীলরঙের লোকটিকে শ্রীকৃষ্ণ বলেই মনে হলো। ছবিটা কাভারে দিলাম,কেউ চিনতে পারলে জানাবেন।

বিএনবিতে পোঁছতে রাত সাড়ে ন’টা বেজে গিয়েছিলো। সুতরাং আজকে আর ঘোরাঘুরি কিছু হয়নি। এই লেখাটা শেষ করেই ঘুমিয়ে পড়বো, কাল ১০টা থেকে ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানির ঘোরা স্টার্ট হবে। এনরিকের বাড়ির ওয়াইফাইয়ের পাসওয়ার্ডটার কথাও বলেনি এই ফাঁকে, দেড় বছরের বাচ্চার হাতে মোবাইল পড়লে যেমন ভাবে মেসেজে টাইপ হয় ঠিক সেরকম। র‍্যানডমনেসকে র‍্যানডমনেস দিয়ে গুন করলে এরকম পাসওয়ার্ড পাওয়া যেতে পারে। এই লম্বা পাসওয়ার্ডের মাথা কলকাতায় থাকলে ন্যাজা থাকবে দিল্লীতে।

এতটা পড়লেন। এক বারের জন্যও মনে হল না আহা বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে ছেলেটা কি খেলো রাতে? থাক, এখন আর মনে করে কাজ নেই। খাওয়ার জন্যই কি জীবন নাকি? কিছু একটা খেলেই তো হলো, তাই না বলুন? আমি তাই একটু আগে বাড়ি থেকে বউয়ের বানিয়ে আনা গোটা দশেক লুচি বাঁধাকপির তরকারী দিয়ে অনেক কষ্টেসৃষ্টে খেলুম। এখন একটু ভাল লাগছে।

ঘুমোই এবারে।(চলবে)

ছবি: লেখক