বার্সিলোনায় সাতদিন- চার

ডা: অনির্বাণ ঘোষ

মন্তসেরাত!

শতাব্দী প্রাচীন কগ হুইল রেলে বসে এডমন্ড কার্শ উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে এসে পৌঁছলেন একটা ছোট্ট স্টেশনে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছেন এক খ্রীষ্টান মঠের বিশপ। এই সেই মঠ যেখানে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলন হয়৷ এই মঠেই আছে খ্রীষ্ঠান ধর্মের দুর্লভ পুঁথি। গেম থিওরি নিয়ে কাজ করা বৈজ্ঞানিক এই ধর্মীয় মঠে কী করছেন?

এভাবেই শুরু হয়েছে ড্যান ব্রাউনের সাম্প্রতিকতম উপন্যাস ‘অরিজিন’। যে পাহাড়ে এই থ্রিলারের শুরু তার নাম,মন্তসেরাত।

স্প্যানিশ ভাষায় মন্ত মানে পাহাড়। আর সেরাত শব্দটার মানে করাতের মতো খাঁজকাটা। ইংরাজী সেরেটেড শব্দটার সঙ্গে মিল আছে। বার্সিলোনা থেকে একটু দূরে এই পাহাড়। পাহাড়ের গায়ের মনেস্টরি এতটাই পবিত্র যে স্প্যানিশরা জীবনে অন্তত একবার পায়ে হেঁটে এখানে আসার চেষ্টা করে। সারারাত ধরে হেঁটে ভোরের সূর্যটা দেখে ওরা। আমাদের বাঙালির তারকেশ্বরে যাত্রার কথা মনে পড়ে যায়।

দুটো মেট্রো বদল করে আমরা এলাম ‘প্লাজা এস্প্যানিয়া’ নামের স্টেশনে। স্টেশনের ভিতরে খুব পরিষ্কার ভাবে বোঝানো আছে মন্তসেরাত যাওয়ার ট্রেন কোথা থেকে পাওয়া যাবে। এক ঘন্টা সেই ট্রেনে কাটিয়ে আমরা এলাম মন্তসেরাত এরি নামের একটা ছোট্ট স্টেশনে। একটাই ট্র‍্যাক স্টেশনের। এই স্টেশনের গায়েই কেবল কারের স্টেশন। মানে রোপওয়ে। তাতে চড়ে আমরা হাজার ফিট ওপরে পাহাড়ের গায়ে চলে এলাম। বেটু খুব মজা পায় কেবল কারে চড়লে। এবারেও হাসি হাসি মুখ নিয়ে চারপাশ দেখতে দেখতে এলো। এছাড়া কগহহুইল ট্রেন দিয়েও এখানে আসা যেতো। যেভাবে ড্যান ব্রাউনের বইয়ের এডমন্ড কার্শ এসেছিলেন।

কেবল কার থেকে নেমে সামান্য খাড়াই পথ বেয়ে উপরে উঠলেই চলে আসা যায় মন্তসেরাত মনেস্টরিতে৷ এগারোশো শতাব্দীতে তৈরি হওয়া এই মনেস্টরি অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের সময় বার বার ভাঙা গড়া হয়েছে এর। এখানকার বয়েজ কয়ার ইউরোপের প্রাচীনতম। তাদের গানও শুনলাম। আরো একটা কারণে এই মনেস্টরি বিখ্যাত। ব্ল্যাক ম্যাডোনা।

ইউরোপ জুড়ে তিনশোটা মত ব্ল্যাক ম্যাডোনা ছড়িয়ে আছে। তাদের বেশির ভাগই বাইজানটাইন আমলে বানানো। মন্তসেরাতের ব্ল্যাক ম্যাডোনার একটা প্রচলিত লোককথা আছে। খ্রীষ্টান সাধুরা যখন ঠিক করেন মঠটাকে আকারে বাড়াবেন তখন ম্যাডোনাকে অনেক চেষ্টা করেও নড়াতে পারেননি। তাই মূর্তির চারিদিকেই মঠ বানাতে থাকেন। মঠের ভিতরে ঢুকে ডানদিকের একটা সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। তার দুপাশে অ্যালাবাস্টারে বানানো সন্তদের মূর্তি। ব্ল্যাক ম্যাডোনার গায়ের রঙ আসলে গাঢ় বাদামী। কোলে শিশু যীশুকে নিয়ে বসে আছেন। যীশুর এক হাতে পবিত্র গোলক, আরেক হাতে আশীর্বাদ করছেন।

মনেস্টারি বেরিয়ে দেখলাম সামনের খোলা জায়গায় কোন স্প্যানিশ স্কুলের বাচ্চারা নাচছে। গানের ভাষা বুঝতে না পারলেও সুর বেশ চনমনে। সেই সুরের সঙ্গে বেটু আর বেটুর মাও একটু নেচে নিলো। তারপরে আমরা পাহাড়ের গা বেয়ে বানানো পাকা রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলাম।

রাস্তার একপাশে দেখলাম স্থানীয় লোকেরা মধু,চীজের পসরা সাজিয়ে বসেছে। খাবার দেখলেই আমি কেমন একটা হয়ে যাই। এবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সাত আট রকমের চীজের স্যাম্পেল টেস্ট করলাম। সেগুলোর কোনটা ছাগল, কোনটা ভেড়া, কোনটা গরুর দুধ দিয়ে বানানো। প্রতিটার স্বাদ, গন্ধ আলাদা। চীজ খাওয়ার পরে বেটুর মায়ের বানানো হ্যাম স্যান্ডিউচ খেলাম পাহাড়ের গায়ে একটা খোলা জায়গায় বসে। তারপরে কিছুক্ষণ মা মেয়ের ফটোশ্যুট চলল। এবারে ফেরার পালা। মনেস্টারিতে ফেরার পথে আগের ছোট বাজারটা থেকে আরেকটা দারুণ জিনিস খেলাম। মাতো।

টাটকা কটেজ চীজ। অনেকটা আমাদের ছানার মতো। কিন্তু গন্ধ নেই। আর একটু বেশি জমাট বাঁধা। এই চীজের ভিতরে গর্ত করে ঢেলে দেয় স্থানীয় রোজমেরি ফুলের মধু। এবারে সেটা চামচে করে তুলে খাও। মুখে দিলেই মিলিয়ে যাও। অতুলনীয় স্বাদ এর! এমন কিছু আমরা আগে সত্যিই খাইনি।

প্লাসা এসপ্যানিয়া স্টেশনে যখন ফিরে এলাম তখন ঘড়িতে বাজে পৌনে ছটা। এখানকার ন্যাশনাল আর্ট মিউজিয়ামের মন্যুমেন্টটা খুব সুন্দর। ওখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। তারপরে একটা স্প্যানিশ রেস্ট্যুরেন্টে ঢুকে কবজি ডুবিয়ে ডিনার করলাম।

ছবি: লেখক