বার্সিলোনায় সাতদিন- তিন

ডা: অনির্বাণ ঘোষ

দালির মিউজিয়াম

ছোটবেলায় আমি যতটুকু বিশ্ব চিনে ছিলাম তার গোটাটাই আনন্দমেলার হাত ধরে। সেই বইতেই একবার দেখেছিলাম একটা লোকের ছবি। কেমন যেন উঁকি মারছে। চোখ দুটো বড় বড়, অবাক হয়েছে যেন খুব। আর লম্বা গোঁফের দুটো দিক ওপরের দিকে উঠে গেছে। নাম জেনেছিলাম দালি। তখন ওঁর আঁকা ছবি ততটা ভাল লাগেনি।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন হাতে আঁকা ছবি, স্থাপত্যের মতো আর্ট ফর্মের প্রতি আগ্রহী হলাম তখন আবার নতুন করে দালির সঙ্গে আলাপ হলো। ওঁর আঁকা ‘পারসিস্টেন্স অফ মেমরি’ ছবিটা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভাল করে বুঝতে পারিনি মানে। তারপরে সেটা জানতে অনেক নেট ঘাঁটাঘাঁটি করতে হলো। বুঝলাম এগুলোকে সারিয়ালিস্ট আর্ট বলে। এরপরে দালির আরো অনেক ছবি দেখেছি, সবই নেটে। সিম্বলিজমের ছড়াছড়ি ছবিগুলোতে। আজকে তার বেশিরভাগকেই নিজের চোখে একেবারে সামনে থেকে দেখার সুযোগ হলো।

সালভাদোর দালি, জন্ম ১৯০৪ এ, মারা যান ১৯৮৯ এর জানুয়ারি মাসে। আধুনিক যুগের দা ভিঞ্চি বলা যায় এঁকে। মারাত্মক প্রতিভাবান এবং একই সঙ্গে খামখেয়ালী একজন মানুষ। যার ছবি ক্রিস্টি, সোথবিতে নিলাম হয় কয়েকশো হাজার ডলারে। যার বন্ধুরা ছিলেন হিচকক,ডিসনি,বুনুয়েল। সেই দালি নিজেই নিজের একটা মিউজিয়াম বানিয়েছিলেন। ফিগারেস নামের একটা ছোট্ট শহরে। এই ফিগারেসেই ওঁর জন্ম। আজকে আমরা দালির সেই মিউজিয়াম থেকে ঘুরে এলাম।

বার্সিলোনা শহরের মধ্যে গোটা তিনেক বড় রেলস্টেশন আছে। আজকে আমরা ট্রেনে উঠলাম এল ক্লট অ্যারাগো স্টেশন থেকে। এক ঘন্টা পঞ্চাশ মিনিট লাগলো ফিগারেসে পৌঁছতে। ছোট্ট স্টেশন, তিনটে মাত্র প্লাটফর্ম। স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে ১৫ মিনিটে দালির মিউজিয়াম। মিউজিয়ামে যাওয়ার রাস্তাটা বেশ মনোরম। দুটো পার্ক পড়লো পথে। গোলাপি চেরী ব্লসমে ভরা গাছ রাস্তার দু’পাশে। দালির মিউজিয়ামটা প্রথমে নজরে এলেই চমকে যেতে হয়। দেখে মনে হলো কোন রূপকথার প্রাসাদে ঢুকতে যাচ্ছি মনে হয়। গাঢ় লাল রঙের দেওয়াল। ছাদের কিনারায় বিশাল বড় বড় ডিম রাখা। তার মাঝে মাঝে সোনালী মানুষের মূর্তি।

টিকিটের ঘরে বসে থাকা মহিলাটি জানতে চাইলেন কোথা থেকে আসছি। যখন বললাম দেশের নাম তখন নমস্তে বলে হেসে টিকিট দিলেন হাতে। ফিগারেসের একটা পুড়ে যাওয়া থিয়েটারকে দালি কিনে নিয়ে ১৫ বছর ধরে বানান এই মিউজিয়াম। জীবনের শেষ কটা দিনও তাঁর এখানেই কাটে। এখানেই ওঁকে সমাধিস্থও করা হয়। দালির আঁকা শেষ ছবিটিও আছে এখানেই। মিউজিয়ামটায় তিনটে তলা। বাইশটা ঘর। এক থেকে ২২ নম্বর করে মার্ক করা আছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রথমে একটা গোল খোলা জায়গা। চারিদিকে উঁচু দেওয়াল। দেওয়ালে অদ্ভুত সব স্কাল্পচার বানানো আছে। বেশিরভাগ আমি চিনতে পারিনি। তারমধ্যে একটা ছিলো ভেনাস দি মিলো। তার সর্বাঙ্গে কাপড় জড়ানো। খোলা জায়গাটার মাঝে বসানো আছে দালির অন্যতম বিখ্যাত একটা ইন্সটলেশন, রেইনি ট্যাক্সি। একটা ক্যাডিলাক গাড়ি কিনে দালি এটা বানিয়েছিলেন। ট্যাক্সির ওপরে রাখা একটা বিশাল বড় ব্রোঞ্জের নারী মূর্তি। তার দুটো হাত দুইদিকে ছড়ানো। এর পরে একে একে বাকি ঘর গুলোও দেখলাম। সত্যি বলছি আমার মাথা ঘুরছিলো একটা সময়। একটা মানুষ তার একটাই জীবনে প্রায় হেন কোন আর্ট ফর্ম নেই যা নিয়ে কাজ করে যাননি। রোমান আর্ট থেকে শুরু করে রেঁনেসাস ঘরানার ফ্রেস্কো, সেখান থেকে কিউবিজম,ইম্প্রেশনসিস্ট আর সারিয়ালিস্টিক আর্ট, ত্রিমাত্রিক ছবি, হলোগ্রাম, স্টিরিওস্কোপি, সবেতেই যেন মানুষটা অনায়াসে খেলে বেরিয়েছেন। মিউজিয়ামের গায়েই দালির বানানো জ্যুয়েলারির সংগ্রহও আছে। সেটাও দেখলাম। সেটাও অবাক করার মতো।

ঘন্টা তিনেক ছিলাম দালির মিউজিয়ামে। যখন বেরোলাম তখন ঘড়িতে বাজে বিকাল চারটে। ফেরার সময় একটা মজার ব্যাপার হলো। আমরা সাধারণত নতুন কোন জায়গায় গেলেই সেখানকার একটা ম্যাগনেট কিনে নিয়ে আসি। আজকে দালির একটা দারুণ সুন্দর ম্যাগনেট পেলাম। সেই ছবিটা যেটা ছোটবেলায় প্রথম দেখেছিলাম আনন্দমেলার পাতায়। যে ছবি দিয়ে দালির সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ।

আজকে এই টুকুই। কাল মন্তসেরাতে যাচ্ছি!(চলবে)

ছবি: লেখক