বার্সিলোনায় সাতদিন- দুই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা: অনির্বাণ ঘোষ

বেটুর আজকাল লোগো,সাইন এসবে খুব আগ্রহ। স্কুলে ট্রাফিক সাইন গুলো শেখাচ্ছে, সেই জন্যই বোধহয়।

-বাবা দেওয়ালে ওটা কী আঁকা আছে?
– কোনটা?
– ওই যে সিগ্রেটের ছবির ওপরে লাল দাগ।
-সিগ্রেট নয় বাবা, সিগারেট। ওটা মানে এখানে সিগারেট খাওয়া যাবে না।
-সব জায়গায় আঁকা থাকে এটা। সিগারেট খাবে না কেন তাহলে?
– সিগারেট খাওয়া ভাল না বেটু। খেলে বুদ্ধি কমে যায়।
-আমি খুব স্মার্ট বাবা। বিকজ আমি সিগ্রেট খাইনা।
-হুঁ, সিগ্রেট না, সিগারেট।

বেটু যত বড় হচ্ছে ততো ওর কথাবার্তায় নিজেই বোকা বনে যাই মাঝে মাঝে।

আজকে বেরোলাম দশটা নাগাদ। আকাশে আজকে সারাদিন সূর্য আর মেঘের ডুয়েল চলেছে। হালকা একটা শীতের ভাবও ছিলো। তাই বেটু ওর পাতলা কার্ডিগানটা পড়ে পোজ দিয়ে কয়েকটা ছবি তুলেই সোয়েটারের ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলো। আজকে প্রথমে গেলাম সাগরাদা ফ্যামিলিয়া দেখতে। গুগুলের বার্সিলোনা লিখে সার্চ দিলেই ন্যু ক্যাম্প ছাড়া আর যে ছবিটা আসে সেটা এইটার। বিশাল বড় একটা চার্চ, গত ১৩০ বছর ধরে তৈরি হয়েই চলেছে। ইউরোপের বাকি চার্চগুলোর থেকে একদম আলাদা এটা। তার কারণ অ্যান্তনি গৌদি নামের একজন পাগলাটে আর্কিটেক্ট। মর্ডানিজম নামের শিল্পের যে জোয়ার একসময় স্পেনে এসেছিলো তার মুখ্য কারণ ছিলেন ওই মানুষটা। এমনই অদ্ভুত তার কাজ যার তুলনা করাটা প্রায় অসম্ভব। নিজের জীবৎদশায় কোনদিন সুখ্যাতি পাননি। পরে ষাটের দশকে সালভাদোর দালি গৌদির কাজকে বিশ্বের সামনে আবার তুলে ধরেন। এখন গৌদির বানানো সাতটা স্থাপত্য ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। তার মধ্যে একটা এই সাগরাদা ফ্যামিলিয়া। সাগরাদার আকার আর গায়ের সুক্ষ কাজ সত্যি অবাক করার মতো। তবে আমার খুব একটা ভাল লাগেনি। হয়তো আমি আর্কিটেকিচারের কিছু বুঝিনা বলেই। আমার চোখে দেখা সবচেয়ে সুন্দর চার্চ মিলানের ক্যাথিড্রাল।

সাগরাদা দেখার পরে ওরই সামনের চওড়া রাস্তাটা দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। পরপর দেখলাম গৌদির বানানো আরো চারটে বাড়ি। কাসা পেদরেরা, কাসা আমেতলিয়ের, কাসা লেও মোরেরা আর কাসা বাতলো। শেষেরটা ভালো করে দেখতে পারিনি। সামনের অংশের গোটাটা ঢেকে সংরক্ষণের কাজ চলছে এখন। বাড়িগুলোর সবকটাই অদ্ভুত রকমের দেখতে। কোথাও একটাও সরল রেখা নেই। সব কিছুই যেন কেন অগোছালো, আবার তার মধ্যেই যেন একটা ছন্দও আছে। এগুলো দেখার পরে দেখলাম প্যালেস অফ কাতালান মিউজিক। এখানে নিয়মিত অপেরা হয় এখনও। বাড়িটা একটা ছোট্ট ঘিঞ্জি গলির মধ্যে। কিন্তু সামনে এসে দাঁড়ালে তাক লেগে যায়। বাইরের দেওয়াল আর থাম বিভিন্ন স্থাপত্যে মোড়া। ভিতরটাও খুব সুন্দর। লাল ভেলভেট মোড়া মেঝের দুদিকে সিঁড়ি উঠে গেছে। তার থামগুলো ঝকঝকে সোনালী রঙ করা। ছাদের জায়গাতে বিশাল বড় রঙিন কাঁচের ডোম। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে বেটুর কটা ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম।

প্যালেস থেকে মিনিট পনেরো হাঁটলেই এসে পড়া যায় ‘লা রাম্বালা’ য়। কলকাতার যেমন পার্ক স্ট্রিট, লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিট, প্যারিসের অ্যাভিনিউ দে শ্যঁ এলিস, তেমনই বার্সিলোনার সবচেয়ে নাম করা রাস্তা হল লা রাম্বালা। গিজগিজ করছে ট্যুরিস্টের ভীড়ে। দু’পাশে অস্থায়ী দোকানের ভীড়। বেশিরভাগেতেই স্যুভেনির বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ আবার বাজনা বাজাচ্ছে, কেউ দারুণ ভাল ছদ্মবেশ নিয়ে মডেলের মতো দাঁড়িয়ে আছে, কাছে না এলে বোঝার উপায় নেই সত্যিকারের মানুষ বলে। সবমিলিয়ে জমজমাট একটা পরিবেশ।

রাম্বালার ওপর দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই আমাদের ডানদিকে পড়লো বোকারিয়া মার্কেট। একদম অপ্রত্যাশিত ভাবে। আমরা ভেবে রেখেছিলাম যে এই ট্রিপে এখানে একবার আসতেই হবে। কিন্তু বাজারটা যে এইখানেই সেটা একেবারেই জানতাম না। বোকারিয়ার বাজার ইউরোপের সবচেয়ে বড় বাজার গুলোর মধ্যে একটা। আমার মতো পেটুকদের স্বর্গরাজ্য বলা যায় এটাকে। কী পাওয়া যায় না এখানে! পরপর ফলমূলের দোকান, যেখানে সেসব ফলও পাওয়া যাচ্ছে যা ইউরোপে একান্তই দুর্লভ। আমি ডোরিয়ান আর ড্রাগন ফ্রুট দেখতে পেলাম। দুটোই খাওয়ার খুব ইচ্ছা আছে, ক’দিনের মধ্যে আরেক বার এসে খাব। এছাড়া এখানে আছে অগুন্তি রেস্তোঁরা, জুস শপ, কাঁচা মাংস আর মাছের দোকান। আজকে একটা দারুণ জিনিস খেলাম! জীবনে প্রথমবার!

ওয়েস্টার!!

এক্কেবারে কাঁচা, টাটকা। বার্সিলোনা শহরটা সমুদ্রের গায়ে হওয়ার এখানে সিফুডের ছড়াছড়ি। আমার ওয়েস্টার খাওয়ার ইচ্ছা অনেকদিনের। কিন্তু একটা ভাল জায়গা খুঁজছিলাম। কোন নতুন খাবার প্রথম দিনেই খুব খারাপ জায়গা থেকে খেলে তার অভিজ্ঞতাটা এত বিশ্রি হয় যে তা আর খেতে ইচ্ছা করে না কখনো। এটা আমাদের সঙ্গে হয়েছিলো চাইনিজ হাঁসের রোস্ট খাওয়ার সময়। যাই হোক ওয়েস্টার কেমন খেলাম সেটা বলি। আমার সামনে একটা ছোট্ট ছুরির মতো জিনিস দিয়ে মাঝখানে চাড় মেরে ওয়েস্টারটাকে খুলে ফেলা হলো। এবারে সেটাকে খেতে দিলো দু’কোয়া লেবুর সঙ্গে। একটু লেবু নিংড়ে নাও ওর ওপরে, তারপরে চামচে করে ভিতরের নরম মাংসটা তুলে সুরুৎ করে মেরে দাও। মুখের মধ্যে গেলেই প্রথমেই যেটা মনে হবে তা হলো আপনি সাগরের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। তারপরেই একটু মিষ্টি ভাব, ততক্ষণে সুখাদ্যটি আপনার গলা দিয়ে নেমে গেছে। খোলার মধ্যে পড়ে থাকা জলটাও চুমুক দিয়ে মেরে দিলাম। এমন জিনিস রোজ খেতে পারলে একটা মায়াবী ব্যাপার হতে পারতো। কিন্তু সমুদ্রের এক্কেবারে কাছের শহর ছাড়া ভাল ওয়েস্টার পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই।

বোকারিয়া মার্কেট থেকে বেরিয়ে আবার লা রাম্বালা দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। রাস্তাটা শেষ হয় একটা বিশাল বড় মন্যুমেন্টের সামনে। নাম কলম্বাস মন্যুমেন্ট। বার্সিলোনার এই জায়গায় নাকি ভদ্রলোক একবার এসেছিলেন। এই মন্যুমেন্টকে নিয়ে একটা মজার কথা বলার আছে। মন্যুমেন্ট বানানোর সময় প্ল্যান ছিলো যে মাথায় কলম্বাসের একটা মূর্তি বসানো থাকবে। মূর্তির ডান হাত নির্দেশ করবে কলম্বাসের আবিষ্কার করা ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’কে, মানে ডোনাল্ড ট্রাম্প এর দেশ আর কী। কিন্তু সে মূর্তি বানিয়ে বসানোর সময় ভুল করে অন্যদিকে মুখ করে বসানো হলো। ফলে কলম্বাস এখন হাত তুলে আমেরিকা না, আলজেরিয়া দেখান!

বেটুকে অনেকক্ষণ ধরে বোঝানো হয়েছিলো আর একটু হাঁটলেই সমুদ্র। বেচারি ভেবেছিলো বিচ হবে বোধহয়। তার জায়গায় পাকা জেটি দেখে ক্ষেপে গেলো। শেষে তাকে শান্ত করতে নিয়ে গেলাম লা’অ্যাকরিয়াম দেখাতে। বাংলা ভাষায় যাকে আমরা মাছঘর বলি। আমাদের চিফিয়াখানার উল্টোদিকেই আছে। খুব কম লোক যান সেখানে। আমি একটা সময় ওখানে প্রেম করতে যেতাম। কেন এবং কী ভাবে সেটার চিন্তা মনে একদম আনবেন না। ছোট মেয়েটা মাছ দেখছে এখন তাতে মন দিন। বার্সিলোনার অ্যাকোরিয়ামটা খুব ভাল লাগল, ভীষণ ভালভাবে প্ল্যান করা। লন্ডনে টেমসের ধারে একটা অ্যাকোরিয়াম আছে, তার থেকে আকারে বড় এবং ভাল। বেটু এখানে পেঙ্গুইনদের খাওয়ানো দেখলো। ইয়াব্বড় শার্ক আর স্টিংরের দল দেখলো, সি হর্স দেখলো। তবে যেটা দেখে সবচেয়ে মজা পেলো সেটা হলো নিমো আর ডোরি! নিমো আসলে ক্লাউন ফিশ আর ডোরি পেসিফিক ব্লু ট্যাং। সব বাচ্চাকেই দেখলাম ওখানেই সবচেয়ে বেশি ভীড় জমাতে। একটা কথা বলতে ভুলে গেলাম। বেটু শার্ক দেখে ভয় পেয়ে গেলেও বাড়ি ফেরার সময় বলল শার্ক অ্যাটাক করলে হ্যামার দিয়ে পেটাবে। তবে শার্ককে ডাঙায় আসতে হবে তার জন্য, বেটু জলে নেমে পা মেসি করবে না।

মেসি সে ইয়াদ আয়া। কাল ন্যু ক্যাম্প।

বি:দ্র: আজকে লাঞ্চে খেয়েছি বারিতো আর এমপানেদা। দুটোই স্প্যানিশ খাবার। খেলাম টাকো বেল নামের একটা ইটারি থেকে। এটাকে অনেকটা ম্যাকডোনাল্ডের স্প্যানিশ ভাই বলা যায়। বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় বৃষ্টি পড়ছিলো খুব। তখন একটা বেকারিতে ঢুকে কফি খেয়েছি। তখনই সিগারেটের কথাটা হয়েছে বাপ বেটিতে। তারপরে আমরা এই বৃষ্টিতে যদি বন্যা হয় তাহলে আসন্ন অ্যাপক্যালিপ্সের কনটিঞ্জেন্সি প্ল্যানিংও করেছি। তা নিয়ে আরেক দিন লিখবোক্ষন।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]