বিউটি বোর্ডিং: আবেগ আর ইতিহাসকে খুঁজে দেখার জায়গা

স্নিগ্ধা চক্রবর্তী (পশ্চিমবঙ্গ)

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

বিউটি বোর্ডিং- এক অদ্ভুত আবেগ এবং ইতিহাসকে খুঁজে দেখার জায়গা।ঢাকা থাকবো আর পুরান ঢাকায় বিউটি বোর্ডিং-এ যাব না, তা হতে পারে না। আজ থেকে প্রায় ৬ বছর আগে আমার জীবন জুড়ানো দুই বন্ধু কলি আর ইরাজ দা এই পুরানো ঐতিহ্যবাহী স্থানটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর যখনই সুযোগ পেয়েছি, এখানে ছুটে চলে যাবার প্লান করে ফেলি। গত কাল দুপুর বেলা তাই আবার ওদের সঙ্গেই চলে গেলাম।
এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো ১৯৪৯ সনে। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শ্বহীদ প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা। এখানে থাকার ও খাবার ব্যবস্থা আছে। সেই সময়ে ঢাকার বাইরে থেকে যারা আসতেন, তার এই বিউটি বোর্ডিংএ থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বা জগন্নাথ কলেজে পড়াশুনা করতেন বা কাছাকাছি কোথাও চাকুরি করতেন। সস্তায় এত ভাল ব্যবস্থা ওই এলাকায় আর কিছু ছিলো বলে মনে হয় না। আজো তাই অনেক লোকই ওখানে থাকেন।
একাত্তরের স্বাধীনতার যুদ্ধে ২৮ শে মার্চ পাক-হানাদার বাহিনী নির্মম ভাবে প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা সহ মোট ১৭ জনকে হত্যা করে এই বোর্ডিং দখল করেছিলো। পরবর্তী কালে তার স্ত্রী প্রতিভা রাণী সাহার উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে আবার এই বোর্ডিং চালু হয়। এই বোর্ডিং-এ দুই বাংলার সৃষ্টিশীল ব্যক্তিবর্গ, যেমন, সাহিত্যিক, কবি, লেখক, চলচ্চিত্র পরিচালক, রাজনীতিবিদ, ছাত্র, এমন সকলেই এই বিউটি বোর্ডিং-এ সময় কাটিয়েছেন। কেউ গান লিখেছেন, কেউ কবিতা, কেউ পত্রিকা ছাপিয়েছেন। সৈয়দ শামসুল হক নাকি ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত এখানেই সব লেখা লিখেছেন। এমন কি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস ও এখানে এসেছিলেন নাকি! এরা যারা এখানে বেশীর ভাগ সময় কাটিয়েছেন তাদের নাকি বিউটিয়ান বলা হতো! বিউটি বোর্ডিং-এ গিয়ে পৌছাতেই মনে হলো এক ইতিহাসের পাতা উলটে পালটে দেখতে এসেছি, আবেগ দিয়ে উপলব্ধি করতে এসেছি হারিয়ে যাওয়া সব ঐতিহ্য। এখানে যা খাবার পাওয়া যায় তা এই দামে এত সুস্বাদু খাবার আর কোথাও পাওয়া গেলেও এমন ইতিহাস আর এমন ঐতিহ্যের ছোঁয়া পাওয়া বিরল। করলা ভাজা, টাকি মাছের ভর্তা, ইলিশ সরিষা আর আমড়ার চাটনি দিয়ে পরম তৃপ্তি সহ খেলাম। দেখলাম, অনেকেই বাইরে থেকে এখানে খেতে এসেছেন। ভাল লাগল দেখে যে কিছু তরুন তরুনীও বাইরের অন্য উপাদেয় খাবার না খেয়ে এখানে খেতে এসেছেন।
ঘুরে ঘুরে দেখলাম  সেই সময়কার ঘরের দরজা, ছোটবেলায় ব্যবহার করা তালা দেবার সেই কায়দা। ধিক ধিক করে টিকে থাকা পুরোন ঘর, হারিয়ে যাওয়া সব খাবারের তালিকা, সেইযুগের সব নমস্য বিউটিয়ানদের পদধূলি পাওয়া এবং সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী থাকা সেই মাটির ছোঁয়া পাবার আবেগ, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভুতি নিয়ে ফিরে আসলাম। ফেরার সময় আশুরা-র মিছিল দেখা ছিল উপরি পাওনা আর গাড়িতে বসে ভাবছিলাম যে আজকের শপিং মল, বানিজ্যকরন আর আত্মবিলাসি মানসিকতার চাপে এই ঐতিহ্যবাহী এবং বিরল স্থান কি টিকে থাকতে পারবে? কে জানবে যে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধে হিন্দুরাও শহীদ হয়েছিলেন এবং তারা ও শহীদ হিসাবে মর্যাদা পেয়েছেন?
আকাশে শরতের মেঘ দেখতে দেখতে মন গুনগুন করছিল…
মেঘ বলেছে যাব যাব, রাত বলেছে যাই , সাগর বলে কূল মিলেছে– আমি তো আর নাই।। দুঃখ বলে রইনু চুপে তাঁহার পায়ের চিহ্নরূপে আমি বলে মিলাই আমি আর কিছু না চাই।। ভুবন বলে তোমার তরে আছে বরণমালা গগন বলে তোমার তরে লক্ষ প্রদীপ জ্বালা।  প্রেম বলে যে যুগে যুগে তোমার লাগি আছি জেগে, মরণ বলে আমি তোমার জীবনতরী বাই।

ছবি: লেখক