বিকজ ইট ইজ সত্যজিৎ রায়

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা তৈরীর গল্প কিন্তু সিনেমার চাইতে কম আকর্ষক নয়। সেই অসাধারণ প্রতিভাবান চলচ্চিত্র পরিচালকের চলচ্চিত্র পরিচালনার নানা খুটিনাটি মজার গল্প ছড়িয়ে থাকে নানাজনের স্মৃতিচারণে। সম্প্রতি পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আজকাল পত্রিকায় সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ছবি ‘সতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ ছবিটি নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন।

ছবির সেটে সত্যজিৎ রায়

কবি সেই সময়ে পরিচালকের সঙ্গী হয়ে দশ দিনের জন্য গিয়েছিলেন লোখনৌতে শ্যুটিং দেখতে ।তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ।
সতরঞ্জ কি খিলাড়ি ছবিটি নির্মাণের পর চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে। সেই শ্যুটিং দেখার মজার সব অভিজ্ঞতা নিয়ে নীরেন চক্রবর্তীর লেখার কিছু অংশ তুলে দেয়া হলো প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য।
সিনেমা নিয়ে আমার মনে একটা প্রশ্ন ছিল। কীভাবে ব্যাপারটা হয়, কীভাবে ছবি তোলে। একদিন ওঁকে সাহস করে বললাম, ব্যাপারটা দেখতে চাই। উনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি। বললেন, চলুন লখনউয়ে, ‘সতরঞ্চ কি খিলাড়ি’র শুটিং দেখবেন। অফিসকে বললাম, সত্যজিতের ঘরের ঠিক উল্টোদিকের ঘরটা ব্যবস্থা করে দিতে। এই ছবির শুটিংয়ের সময় বেশ কয়েকটা দিন ওঁর সঙ্গে কাটিয়েছিলাম লখনউয়ে আর কলকাতায়। তার আগে শুটিং দেখার অভিজ্ঞতা বলতে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছবি ‘বিশ বছর বাদে’। প্রেমেনদাই নিয়ে গিয়েছিলেন। একটা লোক বাড়ি থেকে চলে গিয়ে ২০ বছর পরে ফিরে আসে। সে খুব মজার ঘটনা। তবে প্রকৃত অর্থে শুটিং বলতে যা বোঝায়, তা দেখা ওই ‘সতরঞ্চ কি খিলাড়ি’তেই। শুটিং ব্যাপারটার সঙ্গে আমার দেখা এক লেখকের লেখার বেশ মিল পাই। নামটা বলেই দিই— সুবোধ ঘোষ। সাধারণত গল্প লেখকরা কী করেন।

ছবির একটি দৃশ্যে সঞ্জীবকুমার

লিখতে বসলেন। আজকে খানিকটা লিখলেন, পরের দিন, আগের দিন যেখানে শেষ করেছেন, তার পর থেকে লিখতে শুরু করলেন। হয়তো সেদিনও শেষ হল না, তার পরের দিন। এইভাবেই গল্প লেখা হয়। কিন্তু সুবোধ ঘোষ এক অদ্ভুত কায়দায় লিখতেন। উনি তিন স্লিপ করে লিখছেন, এক দুই তিন নম্বর দিয়ে কম্পোজে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আবার তিন স্লিপ লিখছেন, পাঠিয়ে দিচ্ছেন। লেখা হয়ে গেলে নিজে প্রেসে গিয়ে যেগুলো কম্পোজ হয়ে আছে সেগুলো সাজাতেন। একের পরে পাঁচ বসাচ্ছেন, পাঁচের পরে তেরো, এইভাবে। ওইভাবে সাজিয়ে কীভাবে একটা গল্প খাড়া করতেন, দেখে অবাক লাগত। সিনেমা জগতের লোকেরাও ঠিক তাই করেন। ‘সতরঞ্চ কি খিলাড়ি’র কথাই ধরুন। গল্পের প্রায় সবটাই লখনউয়ের। কিন্তু কিছুটা শুটিং হল কলকাতায়, কিছুটা লখনউয়ে। যেটা লখনউয়ে না গেলেই হবে না, সেই অংশটা ওখানেই করলেন।
ওখানে দশদিন ছিলাম ওঁর সঙ্গে। কলকাতায় স্টুডিওতে লখনউয়ের মচ্ছিমহল ইত্যাদি সেট বানিয়ে দিলেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত। রিচার্ড অটোনবরোর অংশটা হল কলকাতার স্টুডিওতে। সেখানেও গেছি। লখনউয়ে গিয়ে অবাক। উনি তো ধরবেন নাইনটিন্থ সেঞ্চুরি, মানে ১৮৫৭–র সিপাহি বিদ্রোহের সময়টাকে। তখনকার লখনউ আর এখনকার লখনউ তো এক নয়! উনি গিয়ে তখনকার রাস্তাঘাট সব বানিয়ে নিলেন। যেমন তখনকার লখনউয়ের রাস্তায় স্ট্রিট ল্যাম্প ছিল না। কর্পোরেশনকে বলে রাস্তার সমস্ত আলো সরিয়ে দিলেন। তখন ছিল তবকওলা পান। ওইসব খুঁজতে কী ঘোরান যে ঘুরেছি, ভাবা যাবে না। সকালবেলা বেরিয়েছি। ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে লখনউয়ের বাজারে চলে গেলাম। গিয়ে এক জায়গায় ধুপ ধুপ ধুপ করে শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমায় বললেন, ওটা কীসের শব্দ জানেন? আমি বললাম, না। উনি বললেন, তবক বানানো হচ্ছে। রুপো, সত্যিকারের রুপো পেটাতে পেটাতে হালকা ফিনফিনে হয়ে যাচ্ছে। লখনউয়ের হাটবাজার, রাস্তাঘাট সমস্ত নতুন করে তৈরি করে শুটিং করলেন। যেখানে দাবা খেলাটা হলো, সেটা লখনউ থেকে ১২–১৪ মাইল দূরে একটা গ্রাম। সেই গ্রামে গিয়ে ওই দৃশ্যগুলো তোলা হল। গ্রাম পাল্টায় না, পাল্টায় শহর। তখনকার গ্রাম ঠিক বেছে বেছে বের করলেন। সেখানে পুরো একদিন। তখন ঘুড়ি ওড়ানোর কম্পিটিশন হতো। ভেড়ার লড়াই, মুরগির লড়াই, এগুলো হতো। সমস্ত লোকজন জোগাড় করে সেগুলো আবার রিঅ্যারেঞ্জ করলেন। সব লখনউতেই হলো। বাদবাকি সমস্তটা হলো কলকাতায়। তার মানে কী? তার মানে, ছবিগুলো আমি দেখলাম, এখান থেকে ওখান থেকে নিয়ে সাজিয়ে ফেলা। সব মিলিয়ে একটা কমপ্লিট হলো। যখন হলো, তখন আর বোঝাই গেলো না যে এটা এইভাবে হয়েছে!
হোটেলে ওঁর উল্টোদিকের ঘরে থাকতাম। রোজই একসঙ্গে বেরোতাম রাস্তায়, বাজারে। কখনও ওঁর ঘরে বসে গপ্পো করতাম। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করতাম, কী পরিমাণ সময়নিষ্ঠ। দশটার সময় কাজ শুরু করতেন, পাঁচটায় বলতেন প্যাক আপ। তবে যেদিন ওই গ্রামে যাব, গ্রামটা তো অনেক দূরে, যেতে গেলে ভোর পাঁচটায় রওনা হতে হবে। তখন শীতকাল। আমাকে বললেন, নীরেন, কাল কিন্তু আমাদের ভোর সাড়ে চারটের সময় হোটেলের লাউঞ্জে নেমে আসতে হবে। পাঁচটা নাগাদ বেরোনো। আমি তো অত ভোরে উঠতে পারি না! ওয়েক কল দিয়ে রাখলুম। ওরা চারটের সময় ডেকে দিল। উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিয়ে নিচে নামলাম। নেমে আমি অবাক। আমার সামনের সোফায় বসে আছেন সঞ্জীবকুমার! ওঁর ডাকনাম হরি। দেখলাম, বসে বসে একটু ঢুলছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার এত সকালে ওঠা অভ্যাস আছে? কখন ঘুম থেকে ওঠেন?’ বললেন, ‘আমি বারোটার আগে ঘুম থেকে উঠি না।’ তাহলে আজকে কী করে? উত্তরে খুব মজার কথা বললেন— ‘বিকজ ইট ইজ সত্যজিৎ রায়।’ তবে সত্যজিৎ রায় কিন্তু পাঁচটার পরে আর কাজ করতেন না। আরেকটা জিনিসও দেখেছি, সেটা হল যাকে বলে র ফিল্ম, তা একদম বাজে খরচা করতেন না।
আমি একবার রিচার্ড অটোনবরোর ইন্টারভিউ করেছিলাম। ওঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি নিজে তো একজন বড় ডিরেক্টর, আপনি অন্য পরিচালকের অধীনে কাজ করতে চট করে রাজি হয়ে গেলেন কী করে? উনি তার উত্তরে বলেছিলেন, এই লোকটাকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি।

সতরঞ্জ কি খিলাড়িতে আমজাদ খান

কবে থেকে করি সেটাও বলে দিচ্ছি। একটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আমরা দুজনেই বিচারক ছিলাম। সত্যজিৎও ছিল, আমিও ছিলাম। সেখানে ওঁকে অনেক প্রশ্ন করা হচ্ছে। ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন— ‘পথের পাঁচালী’তে একটা ব্যাপার আমরা লক্ষ্য করতুম, দেয়ার ওয়াজ আ লিরিক্যাল কোয়ালিটি অ্যাবাউট ইট। এই লিরিক্যাল কোয়ালিটি, যেমন, আপনার ক্যামেরা একটা কচুপাতার ওপরে, সঙ্গে সঙ্গে সরে যাচ্ছে না। কচু পাতাটার ওপর একবিন্দু জল জমে রয়েছে। খানিকটা দেখে আবার সরে যাচ্ছে। একটা ফড়িং কোথাও বসে আছে। আপনার ক্যামেরা ফড়িংটার ওপর পড়ছে, সঙ্গে সঙ্গে সরে যাচ্ছে না, খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছে। তার মধ্যে লিরিক্যাল কোয়ালিটি ছিলো। আপনার এখনকার ছবি অনেক বেশি দ্রুত। আপনি ওরকমভাবে ক্যামেরাকে কোথায় দাঁড় করিয়ে রাখেন না। ওটার সহজ উত্তর দিয়েছিলেন সত্যজিৎ। এই নিয়ে অনেক ফিলোজফাইজ করতে পারতেন। করেননি। খোলাখুলি বলেছিলেন, ‘আই ডিড নট হ্যাভ আ ট্রলি দেন।’ একটা ট্রলির ওপর ক্যামেরাটা বসিয়ে ঘোরাব, তার উপায় ছিল না। আমাকে হাতে নিয়ে ঘোরাতে হতো। ওই ভারী ক্যামেরা হাতে নিয়ে নিয়ে ঘুরতে হতো। এইটুকু বলে অটোনবরো বললেন, এই লোকটা সত্যবাদী লোক। তখন থেকেই ওঁকে শ্রদ্ধা করি। তাই উনি যখনই আমায় বললেন, আমি এককথায় রাজি হয়ে গেলাম।’
উনি টালিগঞ্জ পিরিয়ডটা করেছেন। পরে যখন ছবিটা তোলা হয়ে গেলো, আমাকে আরেকটা কথা উনি বলেছিলেন। বলেছিলেন, একটা ব্যাপার দেখে আশ্চর্য হই। সেটা হচ্ছে, উনি একবার শট নিয়েই ওকে। এই সাহসটা কোথা থেকে আসে? ওঁর ফিল্মে এনজি বলে কিছু নেই! তার কারণ, উনি প্রযোজকের পয়সা খোলামকুচির মতো ওড়াতেন না।
ওই ক’টা দিন সত্যজিতের সঙ্গে না কাটালে ওঁর সম্পর্কে অনেক কিছু অজানাই থেকে যেত।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ দৈনিক আজকাল, কলকাতা
ছবিঃ গুগল