বিকিনি কিলার শোভরাজ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ছোটবেলা থেকে দুটো কাজে ছিলো তার দক্ষতা-অভিনয় আর মেয়েদের অভিভুত করা। স্কুলে পড়ার সময় চার্লি চ্যাপলিনের অবিকল অভিনয় করে বান্ধবী মহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মানুষটি। তাই আসল নামের আগে জুড়ে যায় চার্লস। কিন্তু অভিনয় করে পৃথবীতে তার নামডাক হয়নি। একের পর এক নারীদের খুন করে জুটেছে সিরিয়াল কিলারের তকমা-চার্লস শোভরাজ, ‘দ্য বিকিনি কিলার’। শুধু সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এক ডজন নারী জন্মসূত্রে ফরাসী নাগরিক শোভরাজের হাতে প্রাণ হারান। থাইল্যান্ড দিয়ে তার খুনের মানচিত্র শুরু হলেও শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। ভারত, নেপাল, ফ্রান্স, গ্রিস, আফগানিস্তান-সহ একাধিক দেশে অপরাধের জাল বুনেছে এই ভয়ংকর খুনী। আর শুধুই কী খুন? জালিয়াতি, ডাকাতিসহ বহু ধরণের অপরাধের সঙ্গে জড়িত এই শোভরাজ।

পৃথিবীর এই নির্মম ধারাবাহিক খুনী এখনও জীবিত। নেপালের জেলে কাটছে তার দিনরাত্রি। সম্প্রতি বিবিসি তাকে নিয়ে একটি ধারাবাহিক ছবি তৈরি করেছে। ধারাবাহিকটির নাম ‘দ্য শার্পেন্ট’। অপরাধ জগতে শোভরাজের আরেকটি নাম হচ্ছে সার্পেন্ট। এই ধারাবাহিক শোভরাজকে আবার ফিরিয়ে এনেছে আলোচনায়।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় হবে সেটা। ১৯৭৫ সাল। আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল থাইল্যান্ড। স্রেফ বেপাত্তা হয়ে যাচ্ছিল সেখানে বেড়াতে আসা নারী পর্যটকেরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমুদ্র সৈকতের কাছে পাওয়া যেতো তাদের মৃতদেহ। পরনে বিকিনি। সমস্ত অর্থ, মূল্যবান অলঙ্কারের সঙ্গে ‘মিসিং’-লিস্টে থাকত তাঁদের পাসপোর্ট। প্রতিটি খুনের ঘটনায় সাদৃশ্য থাকতো ফরেন্সিক রিপোর্টে। প্রথমে মাদক প্রয়োগ, তারপর হত্যা।সেই হতভাগ্য নারীদের পরনে বিকিনি থাকার কারণেই পরে গণমাধ্যমে শোভরাজের নাম লেখা হয় বিকিনি কিলার হিসেবে। কিন্তু এই মুখোশের আড়ালে কে লুকিয়ে রয়েছে, তার সন্ধান মেলেনি তখনও।

বছর খানেক বাদে একইভাবে তাঁর শিকার হলেন থাইল্যান্ডে ঘুরতে আসা এক ওলন্দাজ দম্পতি। উঠেছিলেন সে দেশের ডাচ দূতাবাসে। কাজেই নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। তদন্তের দায়িত্ব নেন ওলন্দাজ কূটনীতিবিদ হার্মান ক্লিপেনবার্গ। সেই তদন্তেই প্রথম বের হয়ে এলো ঘাতকের পরিচয়। চার্লস শোভরাজ।১৯৭৫ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে শোভরাজের হাতে খুন হওয়া নারীদের মধ্যে ছিলেন, টেরেসো নোলটন, বিতালি হাকিম,স্টেফানি পেরি, কোমেলিয়া হেমকার প্রমূখ।

এই ধারাবাহিক খুনের মোটিভ কী? অনেক মাথা ঘামিয়েছেনে গোয়েন্দারা। কিন্তু এমন ঠাণ্ডা মাথার খুনীর মনের অতলের সন্ধান পাওয়া তো কঠিন কাজ। একের পর এক নারীরো কেন খুন হয়েছিলো শোখরাজের হাতে? প্লে-বয় শোভরাজ কিন্তু এই নারীদের কোথাও থেকে জোর করে তুলে আনেননি। তার সঙ্গে এদের এক ধরণের সম্পর্ক তৈরি হতো। সেখানে মনের চাইতে হয়তো কিছুটা বেশি শাসন করতো শরীর। আর সেই জালেই শোভরাজের সঙ্গে জড়িয়ে যেতেন নারীরা। জড়িয়ে যেতেন খুনের জালে। বিখ্যাত হতে চেয়েছিলেন শোভরাজ? আলোচিত? এ কথা বলাই যেতে পারে বিখ্যাত হবার নেশাটা তার সফল হয়েছে। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসে নেপালে ২৯ বছর বয়সী আমেরিকান পর্যটক কোনি জো ব্রনেজেক এবং ২৬ বছর বয়সী কানাডিয়ান নাগরিক লুরেন্ট ক্যামেরিকে খুন করার অপরাধে এখন কাটমাণ্ডু জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করলেও শোভরাজকে নিয়ে ৮ পর্বের ধারাবাহিক তৈরি করেছে বিবিসি। এই ধারাবাহিকে শোভরাজের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিনেতা তাহার রহিম।

ভীষণ বুদ্ধিমান আর ধারালো এক মানুষ চার্লস শোভরাজ। থাইল্যান্ডে একের পর এক খুন করে ফেরারী হয়ে চলে আসেন ভারতে। সেখানেই ১৯৭৬ সালে প্রথম পুলিশের জালে আটকা পড়েন তিনি। পরিণামে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত জেল খাটেন। ফ্রান্সে অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পর শোভরাজ বিস্তারে পড়াশোনা করেছিলেন মনস্তত্ত্ব এবং আইন নিয়ে। সেই শিক্ষা সাজা এড়াতে ছত্রে ছত্রে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। অপরাধ জগতে খুনের পাশাপাশি শোভরাজে বিখ্যাত জেলের তালা ভাঙার জন্যও। ভারতের দুর্ভেদ্যতম কারাগার তিহার জেল থেকে পলায়নই হোক কিংবা বন্দি অবস্থায় দিল্লির হাসপাতাল থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা— প্রতিক্ষেত্রেই রয়েছে তার জটিল মনস্তাত্ত্বিক ছকের পরিচয়। তিহার জেল থেকে পালানোর আগে তিহারের সমস্ত কয়েদি এবং জেলারদের নিয়ে দু’বার পিকনিকের আয়োজন করেছিলেন। তারপর তৃতীয় পিকনিকে মাদক মেশানো হল কাস্টার্ডে। প্রথম দুটি পিকনিক ছিলো জেল প্রশাসনের বিশ্বাস অর্জনের জন্য সাজানো নাটক।

তিহার থেকে পালানোর পর শোভরাজ আবার ধরা পড়েন। েগোয়েন্দাদের ধারণা ইচ্ছা করেই ধরা দিয়েছিলেন শোভরাজ। তা না-হলে জেল থেকে পালিয়ে সোজা একটা দামি হোটেলে ডিনার করতে ঢুকেছিলেন কেন! তখন তার জন্য রেড অ্যালার্ট ঘোষণা করা হয়েছে। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে।।

আসলে শোভরাজের প্রয়োজন ছিলো খানিকটা সময় কিনে নেওয়ার। কেননা ১৯৯৫ সালে থাইল্যান্ড মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল শোভরাজকে। তবে থাইল্যান্ডের আইন বলছে, রায়ের সর্বোচ্চ মেয়াদ ২০ বছর। তার মধ্যে যদি অপরাধী ধরা না পড়ে, তবে বাতিল হবে সেই আদেশ। এই ফাঁকটা কাজে লাগাতেই শোভরাজ চ্ছাকৃতভাবেই তিনি ধরা দেন ভারতীয় পুলিশের কাছে। যাতে তাকে তখনই থাইল্যান্ডে ফিরতে না-হয়। ১৯৯৭ সালের ফেব্রয়ারী মাসে শোভরাজ ভারতের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যান। কারণ তার বিরুদ্ধে সকল পরোয়ানা, প্রমাণ আর সাক্ষিরা উধাও হয়ে গিয়েছিলো।

শোভরাজ ১৬ বছর ধরে কাটমাণ্ডুর জেলেই আছেন। ২০০৪ সালে ফ্রান্সের হাইড আউট থেকে বের হয়ে এসে কেন নেপালে ধরা দিলেন এই ভয়ংকর অপরাধী সে রহস্যের কিনারা করতে পারেনি গোয়েন্দারা। হয়তো সময়ই বলে দেবে ধূর্ত শোভরাজের এটাও কোনো একটি মাস্টার স্ট্রোক।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ  ডেইলি সান যে এক্সপ্রেস, গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box