বিদায় টেলিসামাদ…ওপারে ভাল থাকুন

মাসুদুল হাসান রনি

(টরন্টো থেকে): বৃস্টিস্নাত সকালে ঘুম ভাঙ্গলো বেলা করে। বিশাল উইন্ডোর ভারী পর্দা সরাতে চোখ গেল ডাউনটাউনের দিকে। হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের ওপর আকাশটা গুমোট হয়ে আছে। থেমে থেমে ঝিরিঝিরি বৃস্টি হচ্ছে। গতরাতে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ স্নো পড়েছে।অনেকটাই পেজা তুলোর মতোন। বসন্তের এসময়টায় হাল্কাপাতলা বৃস্টি হয় কিন্ত স্নো পড়ে না। তাই কিছুটা অবাক হয়েছিলাম।
ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে চা খেতে খেতে অনলাইনে ঢু মারতে আবারও দুঃসংবাদে মনটা ভারী হয়ে গেল। আহা অনাবাসী জীবনে কি শুধুই কেড়ে নেয়ার সংবাদ শুনবো! নিউক্যাসেল প্রবাসী চিকিৎসক, কবি ও অস্ট্রেলিয়া আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মিল্টন হাসনাত ভাইয়ের একটা স্ট্যাটাস মনে পড়ে গেল।‘প্রবাস যা দেয় তার চেয়ে কেড়ে নেয় অনেক বেশী!’
সত্যি প্রবাস জীবন অর্থ, সাচ্ছন্দ্য দেয় কিন্তু কেড়ে যে নেয় অনেক বেশী! অনাবাসী জীবনের শুরু থেকে দেশে থাকা প্রিয়জনদের একে একে হারানোর সংবাদই পাচ্ছি। কাউকে শেষ দেখাটা দেখতে না পারার কি যে মর্মবেদনা কুড়ে কুড়ে খায়, তা সহজে প্রকাশ করা যাবে না। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে শুধুই শোক, সমবেদনা জানানো ছাড়া কিছু করার নেই।
সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারলাম, জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা টেলিসামাদ না ফেরার দেশে চলে গেছেন শনিবার দুপুরে। খবরটা শুনে কিছু সময় থম মেরে বসে ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কি হারালাম। টুকরো টুকরো অনেক স্মৃতি, কথা মনে পড়ে। আমাদের বেড়ে উঠা দুরন্ত কৈশোরে স্কুল ফাকি দিয়ে সিনেমা দেখার অন্যতম আর্কষন ছিলেন টেলিসামাদ।সত্যি বলতে তখন নায়ক নায়িকার চেয়ে তার অভিনয় আমাকে কেন যেন চুম্বকের মতন টানতো।তার ঝাকড়াচুলের টিংটিংগে লম্বা দেহে পর্দায় লম্ফঝম্ফ, দম ফাটানো হাসির সংলাপ আমার ও বন্ধুদের ভীষন প্রিয় ছিল।
টেলিসামাদ ছিলেন আমার পাশের জেলা মুন্সীগঞ্জের মানুষ। সেইসুত্রে কলেজ জীবনে তার সঙ্গে আমার পরিচিয় ও সখ্য গড়ে উঠেছিলো। খুব যে দেখা হতো তা না, কিন্তু যখনই যেখানে দেখা হয়েছে সালাম দিতেই আগ বাড়িয়ে জিগেস করতেন, ‘কি মামু কেমন আছো? কি করি টরি জানতে চাইতেন।’ বলতে ভুলে গেছি, টেলিসামাদের দুরসম্পর্কের এক ভাগ্নে শিমুল আমার বন্ধু। তার কারনে আমি তাকে মামা ডাকতাম। টেলি মামা। এ ডাক শুনলে তিনি হাসতেন।
২০০৭ সালের ঈদুল আজহায় একুশে টিভির জন্য একটি স্কীডশো বানানোর কথা। ফোন দিয়ে টেলি মামাকে বললাম, আপনি সময় দিলে কাজটি করতে পারবো। আমার সব পরিকল্পনা শুনে মামু বললেন, ‘আমার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না রে। এবার বাদ দে।পরের বার করে দিব।’ আমি মন খারাপ করে সেই প্রজেক্ট বাদ দিয়ে আবার নতুন পরিকল্পনা নিয়ে ‘তারকদের ঈদ’ নামে সেবার একটি অনুষ্ঠান প্রযোজনা করি। 
পরের বছরও টেলিমামা সময় দিতে পারেননি তখনও নানান রকম অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তবে তিনি আমাকে আরেক কৌতুক অভিনেতা আনিস ভাই, মহিউদ্দীন বাহার ভাই, কাজল ভাইকে নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন।আনিসভাইও তখন সিনেমা থেকে দূরে। খুব একটা কোথাও যান টান না। আমি আনিসভাইকে ফোন দেয়ার পর একটু গাইগুই করছিলেন কাজটা কেমন হবে, আমি পারবো কি না ভেবে। যখনই বললাম, টেলিসামাদ আপনার কথা বলেছেন। তখন তিনি সানন্দে কাজটা করলেন। অভিনেত্রী সোহানা সাবার উপস্থাপনায় ‘বোগাস প্লাস বোগাস’ রম্য ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটি ঈদুল আজহার রাতে প্রচার হয়েছিলো।
সেই রাতে টেলিসামাদ ফোন দিয়ে আমার ব্যাপক প্রশংসা করেছিলেন।তার মতোন একজন সুঅভিনেতার কাছে নিজের প্রশংসা শুনে আমি তো লজ্জায় কাচুমাচু খেয়ে কোন রকমে ফোন রাখতে পারলে যেন বাঁচি। কিন্তু উনি ফোন তো ছাড়েন না।এদিকে আনিসভাইয়ের ফোন, বাহার ভাইয়ের ফোন আসছে। কোনরকমে বললাম, মামা বাসা থেকে মা ফোন করছে। এখন রাখি কাল কথা বলবো। মিথ্যাবলা ছাড়া উপায় ছিলো না, একথা শুনে তিনি ফোন রেখেছিলেন।
টেলি সামাদের সঙ্গে মাঝখানে অনেকদিন যোগাযোগ ছিলো না। তার বাইপাস সার্জারীর কিছুদিন আগে হঠাৎ শিমুল ফোন করে জানিয়েছিল, রনি, মামা তোর কথা জানতে চাইছিলো। পারলে একটা ফোন দিস।
নানান ব্যস্ততায় ভুলেই গিয়েছিলাম তাকে ফোন দেয়ার কথা। গত ডিসেম্বরে ফোন ইনডেক্সে কার নাম্বার যেন খুজতে গিয়ে চোখ আটকে যায় ‘ T ‘ ঘরে এসে। তখনই মনে পড়ে টেলিমামুকে ফোন দেয়ার কথা।বাংলাদেশ সময় রাত ১০ টায় ফোন দিতে মামু প্রথমে চিনতে পারেননি,কে, কোন রনি জিজ্ঞাসায় ২/৩ মিনিট পার করেন। যখন চিনতে পারলেন তখন তার উচ্ছাস টের পাচ্ছিলাম হাজার হাজার মাইলদূর থেকে। খুব খুশী হয়েছিলেন ফোন পেয়ে।আরো ৪/৫ মিনিট কথা হয়েছিলো। পুরোটাই ছিলো তার শরীর, অসুস্থতা নিয়ে।
সেইছিলো শেষ ফোন। শেষ কথা।
মন্ট্রিয়েলের ছুটির সকালের মেঘলা আকাশের মতোন আমার মন ভারী হয়ে আছে প্রিয় কৌতুক অভিনেতার জন্য।বিদায় টেলিসামাদ, ওপাড়ে ভাল থাকুন।

ছবি: গুগল