বিদায় নিলেন অদ্রিশ বর্ধন

‘ফ্যান্টাস্টিক’ নামে পত্রিকাটির একটি বিশেষ সংখ্যা আমার হাতে আসে সত্তরের দশকের শুরুর দিকে। বাঁধানো পত্রিকা। মনে আছে, দু’রঙা প্রচ্ছদে আজগুবী ধরণের দেখতে একটা মহাকাশযানের আঁকা ছবি ছিলো। ওপরে বড় করে লেখা ফ্যান্টাস্টিক। পুরো পত্রিকা ঠাসা সায়েন্স ফিকশেন গল্প। এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে এনেছিলাম পত্রিকাটি। তাই কয়েক দিন মুখ গুঁজে পড়ে থাকলাম ফ্যান্টাস্টিক নিয়ে। সেই প্রথম বাংলা ভাষায় আমার সায়েন্স ফিকশন গল্প পাঠ। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন অদ্রিশ বর্ধন। কলকাতা থেকে বের হতো ছোটদের কাগজটি।আজ হঠাৎ একটি সংবাদ মাধ্যমে অদ্রিশ বর্ধনের চিরবিদায়ের খবরটা পড়ে থমকে গেলাম।

প্রয়াত হলেন বাংলা ভাষায় ‘কল্পবিজ্ঞান’ চর্চার অন্যতম পথিকৃত মানুষটি।

তাঁর বয়েস হয়েছিলো ৮৭ বছর। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গতকাল সোমবার রাতে নিজের বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাংলা ভাষার কিশোর সাহিত্যে বিজ্ঞানের অনুষঙ্গ প্রবেশ করিয়ে কিশোর–কিশোরীদের প্রথম অন্যরকম গল্পের স্বাদ দিয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। পরবর্তীকালে সেই উত্তরাধিকার বহন করে বিষয়টাকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এদের পাশাপাশি প্রায় সমান্তরাল ভাবে গত শতকের ছয়ের দশক থেকে কিশোর পাঠকদের অনুবাদের মধ্যে দিয়ে সরাসরি বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পের জগতে নিয়ে গিয়েছিলেন অদ্রীশ বর্ধন। জুল ভার্নে–এর অসামান্য উপন্যাসগুলির সঙ্গে বাংলা ভাষার পাঠকদের প্রথম পরিচয় ঘটেছিলো তাঁরই হাত ধরে। এরপর টিভি–ইন্টারনেট বিহীন প্রজন্মের সঙ্গে তিনি পরিচয় ঘটিয়েছিলেন  এডগার অ্যালান পো’র দুনিয়ার। তাঁর অনূদিত কোনান ডয়েলের শালর্ক হোমস আজও পাঠক–পাঠিকাদের কাছে সমান জনপ্রিয় প্রথম প্রকাশের দিন থেকেই। এডগার রাইস বারোজ–এর টারজান ও কোনান ডয়েলের প্রোফেসর চ্যালেঞ্জার–এর অনুবাদের জন্য বাংলার সাহিত্যপ্রেমিকরা দীর্ঘদিন তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন।

তিনি সত্যজিত রায়ের সভাপতিত্বে গড়ে ওঠা ‘সায়েন্স ফিকশন সিনে ক্লাব’–এর প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। সায়েন্স ফিকশন–এর বাংলা ‘কল্পবিজ্ঞান’ শব্দটি তাঁরই উদ্ভাবন। অতীন্দ্রিয় ও অতিপ্রাকৃত জগত নিয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় কাহিনীর এই লেখকের কর্মজীবন ছিল বিচিত্র। বিভিন্ন চাকরি ও ব্যবসা করার পর তিনি একটা সময়ে পাকাপাকি ভাবে লেখার জগতে চলে আসেন। কল্পবিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য তিনি যেমন ফিল্ম কাব করেছেন তেমনই সুযোগ পেলেই ব্যবহার করেছেন রেডিও সহ অন্যান্য গণমাধ্যমকেও। সাহিত্যকৃতির জন্য তিনি পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার।

অদ্রীশ বর্ধনের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারার প্রারম্ভিক যুগের অবসান ঘটলো।

ইরাজ আহমেদ

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ দ্য ওয়াল, কলকাতা