বিদায় হে কন্ঠযোদ্ধা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নজরুল সৈয়দ

১৯৯১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে রাজবংশীদের সংখ্যা ৫ হাজারের কিছু বেশি। যদিও সেই শুমারিতে প্রকৃতিপূজারী শৈব রাজবংশীরা হিন্দু পরিচয়ে লিপিবদ্ধ ছিলো। গত ত্রিশ বছরে এ সংখ্যা কমেছে নিশ্চিত। রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী খুঁজলে হাজার তিনেকের বেশি পাওয়া যাবে বলে মনে হয়না। যারা আছেন তারাও এখন রাজবংশী না। হিন্দু এবং বাঙালি পরিচয়ে প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে একটি সমৃদ্ধ জাতিসত্ত্বা। যাদের নিজস্ব কোনো ভাষা বা বর্ণমালা না থাকলেও সঙ্গীত আর নৃত্যকলায় ঐতিহ্য আছে। বিশেষ করে ভাওয়াইয়া গানে।

রাজবংশী নামে যে একটা আদিবাসী সম্প্রদায় বাংলাদেশে আছে, তা খুব বেশি লোকে জানেই না। একজন মাত্র খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব নিজের নামের সঙ্গে সম্প্রদায়ের নাম যুক্ত করে তবু জানান দিতে চেষ্টা করছিলেন বিশ্ববাসীকে। তিনি ইন্দ্রমোহন রাজবংশী।

করোনায় মৃত্যু হলো এই মহান শিল্পীর। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশীকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তিন বছর আগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব একুশে পদক দিয়ে সম্মান জানিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণটাও দারুণ এক গল্প। তখন তিনি ঢাকায় এক স্কুলে শিক্ষকতা করেন, ২৫ বছরের যুবক। যুদ্ধে যোগ দিতে ভারতে যাওয়ার সময় নরসিংদীতে ধরা পড়লেন পাকিস্তান আর্মির হাতে!

উর্দু চলচ্চিত্র দেখার সুবাদে সেই ভাষাতেও ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর ভালো দখল ছিলো। উর্দুতে কথা বলে পাকিসেনাদের মুগ্ধ করে দিলেন। নিজের ধর্ম, বর্ণ, জাত, নামের দিলেন ভিন্ন পরিচয়। নিজে তো বাঁচলেনই, মুক্তিযুদ্ধগামী গোটা একটা দলকে বাঁচিয়ে দিলেন!

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দোভাষী হিসেবে কাজ করলেন কিছুদিন। আর সেই সুবাদে খুব কাছ থেকে দেখলেন তাদের হত্যা, নারী নির্যাতন।

একসময় পাকি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কুমিল্লা বর্ডার ক্রস করে আগরতলায় গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করলেন। সারাদিনের প্রশিক্ষণের পর সন্ধ্যায় ক্যাম্পে গান গেয়ে সহযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতেন ইন্দ্রমোহন রাজবংশী। সেই গান শুনে একজন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক তাঁকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে পাঠিয়ে দিলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। শুরু হলো নতুন যুদ্ধ।

কে কে যাবি আয়রে, চল যাই রে

আয় বাঙালি মুক্তিসেনা বাংলার মান বাঁচাই রে

হেই ডাইন বাম ডাইন বাম ডাইন বাম…

[ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর কথা সুর ও কণ্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত গান]

চলচ্চিত্র ও লোক-সঙ্গীতে কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি সংগীত কলেজের লোক-সংগীত বিভাগের প্রধান। বাংলাদেশ লোক-সংগীত পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। আর ছিলেন লোক-সংগীত সংগ্রাহক। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে তিনি লাখ লাখ লোক-সংগীত সংগ্রহ করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সম্ভবত তিনিই একমাত্র রাজবংশী। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বেসামরিক খেতাবে ভূষিত একমাত্র রাজবংশী নিশ্চিতভাবেই ইন্দ্রমোহন।

ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু না, শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু না, শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা বা কণ্ঠযোদ্ধার মৃত্যু না… একটি জাতিগত সম্প্রদায়ের মৃত্যুঘন্টাও…

রাজবংশীরা কোচ সম্প্রদায়ের অংশ। কোচদের ছিলো নিজেদের রাজ্য কোচবিহার। ভাস্কর বর্মার বিশাল রাজত্ব। কোচদের একটি অংশ রাজবংশী। রাজার বংশী বলে রাজবংশী।

কোচদের সেই কোচবিহার বৃটিশ আমলে ছিলো প্রিন্সলি স্টেট। দেশভাগের কূটরাজনীতিতে তা ভারতের দখলে চলে যায়। কোচ, রাজবংশীরা বিলীন হতে থাকে অন্যান্য জাতিসত্ত্বায়। এখন যারা বেঁচে আছেন, তারাও কেউ আর নিজেদেরকে কোচ বা রাজবংশী হিসেবে পরিচয় দিতে চান না। আদিবাসী পরিচয়টাকেই মুছে ফেলতে চান, মিশে যেতে চান সংখ্যাগুরুর বিশালতায়।

সেই হারিয়ে যেতে থাকা জাতিগোষ্ঠীর সর্বশেষ গর্বিত ও সম্মানিত মানুষ ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মৃত্যু হলো আজ। যিনি জীবন বাজী রেখেছিলেন বাঙালি জাতিকে রক্ষার যুদ্ধে… সেই বীরের মৃত্যু হলো আজ।

বিদায়বেলায় অসীম শ্রদ্ধা তাঁর প্রতি

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box