বিদ্যাসাগরকে এখনও প্রয়োজন আছে…

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ

চযাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রথম কীর্তি ।বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ভিক্ষা করবার সময় মুখে মুখে ছন্দ আকারে যে কথা বলতেন পরে সেগুলিকে গ্রন্থিত  করেই এই কাব্যগাঁথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পাড়ি দিয়ে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে ।অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যের পথ চলা শুরু হলেও পরবর্তী প্রায়  এক হাজার সাল বাংলা সাহিত্য বিশেষত গদ্য সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি হয় নি ।ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রথম গদ্যে যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার করতে সক্ষম হন ।  রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ,’’বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উশৃঙ্খল  জনতাকে সুবিভক্ত,সুচিন্তিত,সুপরিচ্ছন্ন  ও সুসংহত করিয়া তাহাকে সহজগতি ও কর্মকুশলতা দান করিয়াছিলেন ।‘’তাঁকে বলা হয় ‘বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী ‘।বাংলা  ‘পাঠ্য বইয়ের’ প্রায় অন্ধকার যুগকে ভেঙে অসামান্য মনীষায় যুগোপযোগী পাঠ্য বই রচনায় প্রায় নীরব বিপ্লব সাধন করেন । তাঁর রচিত ‘বর্ণ পরিচয়’ কমোলমতি শিশুদের সহজেই বুঝতে পারা ,আনন্দমাখা একটি  শিশুপাঠ্য ।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের  মেদিনীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন ।তাঁর বংশ পদবী বন্দোপাধ্যায়,বিদ্যাসাগর তাঁর উপাধি । শৈশবেই তাঁর তীক্ষ্ণ মেধার অসংখ্য নজির প্রায় ’মিথ’ হয়ে আছে ।বালক ঈশ্বরচন্দ্র বাবার সঙ্গে কোলকাতা যাচ্ছিলেন ।পথে মাইলস্টোন দেখে খুবই কৌতূহলী হয়ে উঠেন ।পিতার সহযোগিতায় পাথরের গায়ে খোদিত ইংরেজী অঙ্কগুলি দ্রুত শিখে নেন ।তাঁর অভাবিত মেধাশক্তির পরিচয় পেয়ে নিকটজনেরা পরামর্শ দেন ঈশ্বরচন্দ্রকে যেন ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করা হয় ,কারণ ইংরেজী ভাল জানা থাকলে ইংরেজ সাহেবদের বড় বড় দোকানে কাজ পাওয়া যাবে ।তাঁর পিতা ঠাকুরদাস  একথা কানে নেননি ।বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তি ছিলো কিংবদন্তীর মত ।অসুস্থ মাকে দেখবার জন্য তিনি সাঁতরে প্রমত্তা নদী পাড়ি দেন ।

 নিজগ্রামের পাঠশালায় হাতেখড়ি হলেও ১৮২৯ সালে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন ।টানা এক যুগ সেখানে ব্যাকরণ,কাব্য, অলংকার ,বেদান্ত, স্মৃতি ,ন্যায় ,  জ্যোতিষ শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন । সকল বিষয়ে অনন্য সাধারণ ফলাফল লাভের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে অভিষিক্ত হন ।প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের হেড পণ্ডিত হিসেবে যোগদান করলেও পরে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন ।বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসেবে কাজ করবার সময়ে তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিশটি মডেল স্কুল এবং পঁয়ত্রিশটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় ।নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে তিনি তৎকালীন মেট্রোপলিটন কলেজ স্থাপন করেন ।

তাঁর চরিত্রে কুসুম ও কঠোরতার এক অপরূপ মিশেল দেখতে পাওয়া যায় ।দরিদ্র ব্যক্তির কাছে তিনি ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ ।অথচ ,ইংরেজ প্রশাসকের কোন অন্যায় নির্দেশ মেনে নেন নি ।তাঁর চরিত্র মাধুর্য সন্মন্ধে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেন ,’  ঋষির প্রজ্ঞা ,ইংরেজদের কর্মশক্তি এবং বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি ‘র সন্মিলন ঘটেছিলো তাঁর মাঝে । কর্মজীবনের শেষে ইংরেজদের সঙ্গে আপোষ না করে ‘পেনশন ‘ না নিয়েই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন  ।

বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি অন্নছত্র খুলে প্রায় হাজার খানেক মানুষকে দুবেলা খাবার ব্যবস্থা করেন ,যারা চক্ষুলজ্জার ভয়ে সামনে আসতে চাইতো না তিনি তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতেন ।অনেক দরিদ্র ছাত্রকে নিজ নাম গোপন রেখে পড়ার খরচ চালিয়ে গেছেন । বিদ্যাসাগর নিজে একবার অর্থকষ্টে পরেন ।সেইসময়ে    মাইকেল মধুসূদন দত্ত অর্থকষ্টে পরলে ধার করে টাকা ফ্রান্সে পাঠিয়ে দেন ।

সমাজ সংস্কারক বিদ্যাসাগর বিধবাদের ব্যথা বুঝতে পেরেছিলেন ।তিনি শুধু বিধবা বিবাহপ্রথা চালুরই অগ্রদূত নন স্বয়ং নিজ ছেলেকে দুঃখিনী এক বিধবার সঙ্গে বিয়ে দেন । তৎকালীন সমাজপতিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে  বালিকা বিবাহ রোধে এগিয়ে আসেন । ধিক্কার ও লাঞ্ছনা সয়ে তিনি নারীশিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যান ।সংস্কৃত কলেজে শুধু উচ্চবর্ণের বদলে সকল বর্ণের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করেন ।অপাংতেয় সাঁওতালদের সাথে মিশে  যেন তাদেরই একজন হয়ে যান ।

 মৌলিক সাহিত্য রচনা  , সম্পদনা , হিন্দি – সংস্কৃত -ইংরেজি সাহিত্য থেকে অনুবাদ করে অনেক মণিমাণিক্যে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন ।  ভ্রান্তিবিলাস নামে উইলিয়াম শেক্সপীয়রের নাটক  ‘কমেডি অব ইরর ‘এর এক অসাধারণ অনুবাদ করেন । এই কাহিনী  নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র বিশেষভাবে দর্শক নন্দিত হয় ।লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৮৯১ সালের  ২৯ শে জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন ।আজ তাঁর  ১২৭ তম মৃত্যুবার্ষিকী ।মৃত্যু নশ্বর  মানুষের অখণ্ডনীয় পরিণতি ।আশেপাশে যখন শুনি শিক্ষা পণ্য হয়েছে , ‘ভ্রান্তি বিলাস ‘ কারো কারো জন্য ‘রাইট’ হচ্ছে  আর অন্ধকারের শক্তি আমাদের পিছনের দিকে ঠেলতে চাইছে তখন রংধনুর দেশে চিরতরে চলে যাওয়া  বিদ্যাসাগরকে আরেকবার দরকার হয়ে পরে ।

ছবি: গুগুল

লেখক: (মেজর উপ অধিনায়ক ,আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরটরী)