বিপজ্জনক গুপ্তচর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমেরিকান নারী ভার্জিনিয়া হলের জীবনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত শান্ত কোনো পুকুরের জলের মতো ছিলো না। বেশ ডাকাবুকো ভাবেই বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কী না করেছেন ছেলেবেলায়! তখন থেকেই শিকার করতে ভালোবাসতেন। অ্যাডভেঞ্চারের নেশা এতটাই ছিলো যে, স্কুলে জ্যান্ত সাপ হাতের কব্জিতে জড়িয়ে ব্রেসলেট বানিয়ে পরতেন। জীবনে হতে চেয়েছিলেন কোনো দেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত। পাখি শিকার করতে গিয়ে বন্দুকের গুলি নিজের পায়েই লাগলে পা কেটে বাদ দিতে হয়। সেখানে লাগানো হয় কাঠের পা। এত অঘটনঘটনপটিয়সী ভার্জিনিয়া হলের বেপরোয়া জীবন তাকে টেনে নিয়ে যায় গুপ্তচরের জীবনে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় তিনি ছিলেন ফ্রান্সে। জার্মানী ফ্রান্স আক্রমণ করলে জীবনের মধ্যে অ্যাডভেঞ্চার খুঁজে বেড়ানো ভার্জিনিয়াকে দেখা যায় অ্যাম্বুলেন্সের চালকের আসনে। অ্যাম্বুলেন্স চালিয়ে তিনি আহতদের আনা-নেয়ার কাজ করতেন। কিন্তু জার্মান সৈন্যরা প্যারিসে প্রবেশ করলে সেখান থেকে পালিয়ে চলে যান ইংল্যান্ডে। আর সেখানেই এক বৃটিশ গোয়েন্দার সঙ্গে পরিচয় পাল্টে দেয় ভার্জিনিয়ার জীবন। গুপ্তচরবৃত্তিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৪১ সালে কাঠের পা নিয়েই প্রথম নারী গুপ্তচর হিসেবে তিনি প্রবেশ করেন অবরুদ্ধ ফ্রান্সে।এখন ভার্জিনিয়া হলের মৃত্যুর ৪০ বছর পর তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে তিনটি বই। তৈরি হচ্ছে দু‘টি সিনেমা।

‘এ ওমেন অফ নো ইমপর্টেন্স’ বইটি লিখেছেন বৃটিশ লেখক সোনিয়া প্রুনেল। সোনিয়ার ভাষায়, ভীষণ সাহসী আর অদম্য এই নারীর জীবনের শুরুর গল্পটা ছিলো প্রত্যাখ্যানের। আকাঙ্ক্ষার মতো করে কিছুই পাননি ভার্জিনিয়া। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে ঠাই দিয়েছে বইয়ের পৃষ্ঠায়।

ভার্জিনিয়া ছিলেন ভীষণ বুদ্ধিমান এক গুপ্তচর। পূর্ব ফ্রান্সের লিয়ন শহরের পতিতাপল্লী ছিলো তাঁর আত্মগোপনের ঠিকানা।আর সেখানে পতিতাদের কাছ থেকে জার্মান বাহিনীর গতিবিধির তথ্য সংগ্রহ করতেন তিনি। সেসব তথ্য সোজা চলে যেত ফরাসী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের শিবিরে। সোনিয়া তার বইতে লিখেছেন, ছদ্মবেশ ধারণেও ভীষণ দক্ষ ছিলেন সেই নারী গুপ্তচর। একদিনে তাকে চারবার বেশ বদল করে, চারটি পৃথক সাংকেতিক নামে অবলীলায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যেতো।

প্রথমে জার্মানরা ভার্জিনিয়ার বিষয়ে তেমন কিছু জানতে না-পারলেও পরে তার কর্মকাণ্ড টের পায় গেস্টাপো সেনারা। তারা ভার্জিনিয়াকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পোস্টার তৈরি করে। সেখানে লেখা ছিলো-শত্রুপক্ষের সবচাইতে ভয়ংকর গুপ্তচর। এই মহিলাকে হত্যা করুন।জার্মান বাহিনীর হাতে ধরা পড়তে পড়তে কয়েকবার বেঁচে যান ভার্জিনিয়া। কাঠের পা নিয়েই তিনি বরফের ওপর দিয়ে ৫০ মাইল পথ হেঁটে পালিয়ে যান স্পেনে। সেখান থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয় ইংল্যান্ডে।

কিছুদিন সেখানে থাকার পর ভার্জিনিয়া আবার ফিরতে চান ফ্রান্সে। কিন্তু তার জন্য ফ্রান্স তখন ভীষণ বিপজ্জনক। বৃটিশ গোয়েন্দা বিভাগ তখন তাকে আবার কাজে নামার অনুমতি দেয়নি। কিন্তু নিষেধের বেড়াজাল তাকে আটকে রাখতে পারেনি। ১৯৪৪ সালে আবার ফ্রান্সে প্রবেশ করেন এই অদম্য গুপ্তর। তখন মেকআপ করে নিজের চেহারা পাল্টে ফেলেছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডে দাঁতের ডাক্তারদের দিয়ে নিজের দাঁত কেটে ছোট করে ফেলেছিলেন যাতে তাকে দেখতে ফরাসীদের মতো মনে হয়।
ভার্জিনিয়া হলের ভাগ্নি লোরেনা ক্যাটলিং স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সোনিয়ারকে জানিয়েছেন, ভার্জিনিয়া যখন যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরেন অদ্ভুত এক চেহারা হয়েছিলো তাঁর। সব চুল ছিলো সাদা, মুখ ছিলো রক্তশূন্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল ফুরিয়ে গেলে আমেরিকায় গোয়েন্দা বিভাগ সিআইএ গঠনের সময় ভার্জিনিয়া সেখানে যোগ দেন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ এনপিআর
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box