বিপ্লবেঃ পরশুর পরের দিন

লেখার শিরোনাম বিপ্লবেঃ পরশুর পরের দিন। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক দেবেশ রায়ের স্মৃতিচারণমূলক একটি রচনা। লেখকের ‘প্রথম-দেখা’ বইতে অন্তর্ভূক্ত লেখাটি প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য পুনরায় মুদ্রিত হলো।

চারুদা শ্লোগান দিচ্ছিলেন। চারু মজুমদার। ১৯৫০-এ।

জলপাইগুড়িতে। মিছিলে।

তখন সবাই মিছিলকেই ‘মিছিল’ বলত। এখনকার ভাষায় হয়ত বলা যায় ‘স্কোয়াড’। জনা পঁচিশ-তিরিশ দুই সারিতে জলপাইগুড়ির সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। ঝাণ্ডা ছিল কী না মনে নেই। হয়তো ছিল সামনে একটা, পিছনে একটা।

১৯৫০। এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে কমিউনিস্ট পার্টিকে ‘নিষিদ্ধ’ করার কেন্দ্রীয় সরকারের অর্ডিন্যান্স নাকচ হয়ে গিয়েছে। নেতা ও কর্মীরা একে-একে ছাড়া পাচ্ছেন। পুরনো নেতা ও কর্মীদের বেশ বড় একটা অংশ টিবি জাতীয় অসুখ নিয়ে, হাড়গোড় ভেঙে, বার-বার অনশন-ধর্মঘটের ফলে লিভার-টিভারের নানা অসুখ নিয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়েছেন। ভুল রাজনীতির দেনা শুধরে কেউ-কেউ বসেও যাচ্ছেন। বা, চাকরিবাকরিতে ঢুকছেন।

আবার, বিস্ময়কর দ্রুততায় কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠিত হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় বেরিয়ে জানান দিচ্ছে-আমরা আছি।

তেমন জানান দিতেই অমন পঁচিশ-তিরিশজনের মিছিল।আমরা আছি। সেই সময় চারুদা জলপাইগুড়ি জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি ছিলেন।

চারুদা শ্লোগান দিচ্ছিলেন। দুই সারির মাথায় দাঁড়িয়ে, মাঝখানে। মিছিল যেন তাঁকে মাঝখানে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল আর তিনি যেন মিছিলের মাথা থেকে লেজের দিকে নেমে আসছিলেন। নৌকা যেভাবে স্রোত বেয়ে এগয়, মিছিল সেভাবে পথ কেটে এগচ্ছিল আর চারুদা মিছিলের মাথা কেটে এগচ্ছিলেন-যেভাবে হাল স্রোত কাটে।

চারুদা ছোটখাট মানুষ। মাথায় কোঁকড়া চুল। ফুলহাতা জামা। বোতাম আটকানোও বটে, খোলাও বটে। কখনো মুষ্টিবদ্ধ একটা হাত, কখনো দুই হাতই মুষ্টিবদ্ধ মাথার ওপরে ঋজু উঠে গিয়েছে। নিজের শরীরের সমস্তটুকু শক্তি দিয়ে চারুদা মিছিলকে শ্লোগান দিচ্ছিলেন।ই-ন-কি-লা-ব। আর সেই ধ্রুবপদের সঙ্গে-সঙ্গে চারুদা যেন মহীরুহ হয়ে উঠছিলেন, এমন অব্যর্থ মহীরুহ যে দিগন্তের পথিককেও নিশানা দেয়। সেই মহীরুহতে সব সময়ই প্রবল ঝড় ও নিশ্চিন্ত আশ্রয় থাকে।চারুদা একই সঙ্গে সেই ঝড়ের প্রবলতা ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে হেঁকে উঠছিলেন; ই-ন-কি-লা-ব। আমরা আছি। আর, পঁচিশ-তিরিশজন মানুষের সেই মিছিল জলপাইগুড়ির সরু রাস্তায় যেন হয়ে উঠেছিল, যেন নিশ্চিত হয়ে উঠছিল ভবিষ্যতের এক উপমা; ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড।

সেই মিছিলে আমি ছিলাম। ক্লাস এইট-নাইনে পড়ি। ‘বেআইনি’ কমিউনিস্ট পার্টির কাজ করতে গিয়ে অ্যারেস্ট হয়ে ও তিন দিনের হাজত খেটে শহরের ‘শিশুতম কমিউনিস্ট’ হিশেবে ‘দাগী’ হয়ে গিয়েছি। তার আগে-পরেও চারুদাকে অনেকবার দেখেছি নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার বাল্য-কৈশোরের স্মৃতিতে ওই একটা মিছিলে চারুদা শ্লোগান দিচ্ছেন-সেই মূর্তিটাই গাঁথা হয়ে গিয়েছে। আমি গল্পটল্প লেখালেখির চেষ্টা করব আরো বছর তিন পর। কিন্তু স্মৃতির সঞ্চয়ের রীতি আলাদা। সেই মিছিলে চারুদার ঐ শ্লোগান দেওয়ার মূর্তিটাই আমার মনে গাঁথা হয়ে আছে-মহীরুহের আহ্বান, আমরা আছি, আমরাই নিশান, আমরাই ঝড় তুলি, আমরাই আশ্রয়। এই কথাগুলি হয়তো পরের ষাট বছর ধরেই জন্মেছে। স্মৃতির নির্মাণক্ষমতা ইতিহাসের চাইতেও প্রবলতর।

চারুদার যাঁরা প্রায়-সমবয়েসি ছিলেন, তাদের কাছে, চারুদার পার্টিতে আসার গল্প শুনেছি যখন তখন আমি নিজেই ‘হাফ নেতা’। শুনেছি নরেশ চক্রবর্তী আর শচীন দাশগুপ্তের কাছেও। লিখেওছি একটু।

তখন কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের ভিতর থেকেই কাজ করে। যুদ্ধ তখন তৈরি হচ্ছে। কমিউনিস্টরা বেআইনি। ৩৭-৩৮ সাল নাগাদ। আবার, সেই সময়, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের আইনসভার ভোটাভুটি শুরু। রংপুরের ডোমার ছিল কমিউনিস্টদের বেশ শক্ত ঘাঁটি। সেখানে অনেকে আত্মগোপন করে থাকতেন। তেমনি ছিলেন-মাধব দত্ত, শচীন দাশগুপ্ত, নরেশ চক্রবর্তী।

এক সকালে মাধবদা ট্রেন ধরে চলে গেলেন শিলিগুড়ি। সেখানে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টের বাড়িতে গেলেন, প্রায়ই যেতেন। মাধবদা ছিলেন কংগ্রেসের গ্রাম সংগঠনের কর্মী, কিন্তু আসলে কমিউনিস্ট।

প্রেসিডেন্টের বাড়িতে গিয়ে প্রেসিডেন্টকে পেলেন না কিন্তু প্রেসিডেন্টের ছেলেকে পেলেন। পাবনা কি অন্য কোথাকার কোনো কলেজে অই.এ পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি এসেছে। মাধবদার ভাষায়, ‘ফুটফুটে ছেলে’।

এ-কথা সে-কথার পর মাধবদাকে ছেলেটাকে বললেন,‘বিপ্লবের কাজ করবে?’ ছেলেটা বললো, ‘হ্যাঁ’। মাধবদা তাকে ডোমারের আত্মগোপনের ডেরার ঠিকানা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবে আসবে?’। ছেলেটা বললো,‘পরশুর পরের দিন।’ ছেলেটা যেন পাঁজি জানে; মাধবদা ডোমারে ফিরে এসে তাঁর কমরেডদের কাছে সবিস্তারে এই কাহিনি বললেন। শুনে তাঁর কমরেডরা রাতারাতি ডেরা-বদল করলেন। নিশ্চিত পুলিশ আসবে।

সেই পরশুর পরের দিন-মাধবদা ডোমার স্টেশনে গেলেন ও লুকিয়ে-লুকিয়ে দেখতে লাগলেন ছেলেটা আসে কী না! কী আশ্চর্য, ছেলেটা একটা টিনের সুটকেস নিয়ে ট্রেন থেকে নামল!

চারু মজুমদার ‘বিপ্লব’ করতে এলেন।

যত দিন বাঁচবেন বিপ্লবেই বাঁচবেন।

কী অনায়াস তাঁর গৃহত্যাগ,কী অনায়াস তাঁর বিপ্লবসাধন, আর আমার চোখে সেই একটুকরো মিছিলে কী অনায়াস ছিল বজ্রমাণিকের নিশ্চয়তা নিয়ে তাঁর তেমন মহীরুহ হয়ে ওঠা, যে মহীরুহের মাথা আকাশ ছোঁয় আর সেই মহীরুহ কেমন অনায়াসে সূর্য-চন্দ্র-তারা পেড়ে আনে। আমরা আছি।

চারুদার একটা, বা দুটোই মুষ্টিবদ্ধ হাত-আকাশের দিকে তোলা, শ্লোগান দিচ্ছেন, আর পঁচিশ-তিরিশজনের মিছিল হয়ে উঠছে, কোটি কোটি মানুষের দেশ। চারুদা সেই দেশটাকে তাঁর দু’হাতের করতলে দেখতে পেতেন। আরো সবাইকে দেখাতে চাইতেন। তাই অমন ডাক দিতেন-দুই মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে তুলে।

সংকলন: প্রথম-দেখা, দেবেশ রায়

ছবিঃ গুগল