বিবিসি’তে কাজ শুরু

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

নাজির আহমেদ

কাদের ভাইর বাড়িতে বসবাস শুরু করলাম। বেবী আপার বাড়ি থেকে বিবিসি দফতর বেশ দূরে। কাদের ভাইর বাড়ি থেকে পাতাল রেল বা টিউবে আধা ঘন্টার মধ্যে বুশ হাউজ পৌঁছনো সম্ভব। ঘরটা দেড় তলায়, খুব বড় না, কিন্তু আমার মা-ছেলের জন্য যথেষ্ট আরাম দায়ক। খাওয়া-দাওয়া তাঁদের সঙ্গে। রূপককে কাছের স্কুলে ভর্তি করা হলো। কাদের ভাইর স্ত্রী রীতা ভাবী স্কুল শেষে ওকে নিয়ে আসতেন আর ওর দেখাশোনা করতেন। রূপক কাদের ভাইর মেয়ে রূপন আর ছ’মাসের শিশুপুত্র রায়ানের সঙ্গ পেয়েই খুশি। বিবিসিতে কাজের শুরুতে একজন সিনিয়র সহকর্মীকে দায়িত্ব দেওয়া হলো আমাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে। তাতে গোড়াতেই কিছু সমস্যা দেখা দিলো। তিনি আমাকে ডিকটেশন দিতে চাইলেন, আমি আপত্তি জানালাম। অনুবাদ করতে আমি জানি। আমি বিনীতভাবে তাঁকে বললাম, ‘আমি অনুবাদ করার পর আপনি দেখে দেবেন।’ বলা বাহুল্য তিনি তাতে একটু অসন্তুষ্ট হলেন। তবে কাজ কর্ম সবই দেখালেন। কিভাবে মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলতে হয়। কিভাবে সেল্ফ অপারেটডে স্টুডিও বা সংক্ষেপে সেল্প অপ ব্যবহার করতে হয়, ইত্যাদি। প্রথমদিকে ট্রান্সমিশন চলার সময় দেখলাম, কিভাবে সম্প্রচারের কাজটা হয়। তারপর আমাকে কাজ দেওয়া হলো।

শ্যামল লোধ

এবার সহকর্মীদেও কথা বলি। শ্যামলদা (লোধ) ও সিরাজ (রহমান) ভাইয়ের কথা তো বলেছি। সিনিয়র সহকর্মী আরো ছিলেন দীপঙ্কর ঘোষ ও নূরুল ইসলাম। এছাড়া কাদের ভাই ছিলেন, ড.গোলাম মুরশিদ ছিলেন। তাঁকে নামে চিনতাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, তাঁর লেখা বই পড়েছি। কলকাতার দূরদর্শণ থেকে এসেছেন পঙ্কজ সাহা। আর ছিলো দীপায়ন চট্টোপাধ্যায়। তরুণতম সদস্য। কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছিলো। প্রথম প্রথম দীপায়ন খুব একটা কথা বলেনি। আমি ভেবেছিলাম, ছেলেটা হয় দাম্ভিক নয়তো মেয়েদের পছন্দ করে না। পরে অবশ্য সেই আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠলো, যে বন্ধুত্ব আজও অটুট আছে। যাঁরা খন্ডকালীন কাজ করতেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন মানসী বড়ুয়া, শামীম চৌধুরী, সাখাওয়াত হোসেন, তালেয়া রেহমান। তালেয়া আপা আগে সার্বক্ষণিক কাজ করেছেন আর মানসী পরে স্টাফ হিসেবে যোগ দিয়ে এখনো বিবিসি বাংলা বিভাগে কাজ করছে। আর ছিলেন নাজির আহমেদ। অনেকে তাঁর নাম জানেন। তিনি বলতে গেলে কিংবদন্তীর চরিত্র। আকাশবাণী ও ঢাকা বেতারের সঙ্গে তো জড়িত ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে যে ঘটনার কথা বিখ্যাত হয়ে আছে, সেটা হলো আকাশবাণীতে একবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আসতে না পারায় তিনি মহালয়ার দিন ভোরে নির্ভুল উচ্চারণে মহিষাসুর মর্দিনীর পাঠ করেছিলেন। তিনি যখন ঢাকায় ফিল্ম ডেভলাপমেন্ট কর্পোরেশনের মহাপরিচালক চিলেন, তখন আব্বা সেখনে কর্মরত ছিলেন। সে কারণে কিনা জানি না, নাজির ভাই আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। তার প্রকাশ পরবর্তীতে অনেকবার দেখেছি। সময় এলে সেসব লিখবো। সেখানে কাজের পরিবেশ খুব ভাল ছিলো। সবার সঙ্গে সবার খুব ভাল সম্পর্ক ছিলো। দুপুরের ট্রান্সমিশন শেষ হতো সওয়া দু’টোয় আর আমাদেও ক্যান্টিনের খাবার পরিবেশন বন্ধ হতো আড়াইটায়। আমরা স্টুডিয়ো তেকে বেরিয়ে দুপুরের খাবার ধরার জন্য ছুটতাম। অবশ্য ক্যান্টিন ২৪ ঘন্টাই খোলা থাকতো এবং লাঞ্চ বাদে অন্য সব হাল্কা খাবার পাওয়া যেতো। খাবার উপাদেয় ছিলো, সেই সঙ্গে খুব সস্তা। মনে আছে চায়ের দাম ৬ পেনী থেকে ৭ পেনী হওয়াতে আমরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। সন্ধ্যায় আড্ডা হতো বিবিসি ক্লাবে। পানীয়র ব্যবস্থা ছিলো। যাঁরা মদ্য পান করেন না, তারাও আড্ডায় অংশ নিতেন।

তখন সংবাদ পাঠের প্রশিক্ষণ হতো রাতের শিফট’এর ডিউটিতে। হঠাৎ টের পেলাম আমাকে রাতে শিফট’এ ডিউটি দেওয়া হচ্ছে না। একটু অবাকই হলাম। তারপর একদিন বিভাগীয় প্রধান জন রেনারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাকে কেন রাতের ডিউটি দেওয়া হচ্ছে না। ও খুব অবাক হয়ে বললো, ‘আমি শুনেছি তোমার রাতের শিফটে কাজ করার ব্যাপারে অসুবিধা আছে।’ আমি বুঝলাম অসুবিধাটা রূপককে কোথাও রাখার এবং আমার সহকর্মীরা দয়া পরবশ হয়ে আমার হয়েই জনকে একথা বলেছে। আমি বললাম, ‘আমি কি কখনো তোমাকে বলেছি যে আমার অসুবিধা আছে আর আমি নাইট শিফট্ করতে পারবো না?’ জন একটু লজ্জা পেয়ে বললো, ‘না তুমি বলোনি।’ তারপর দেখলাম রোটায় আমার নাম নাইট শিফট্’টে রয়েছে। অসুবিধা যে হয়নি, তা নয়। রাতের কাজ মানে রূপককে কোথাও রাখা। কিন্তু নারী হিসেবে কখনো কোথাও সুবিধা নেবো না, সেটা আমার নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা ছিলো। এ ব্যাপারে সহকর্মীদেও কেউ কেউ এগিয়ে এসেছিলো, রূপক তাদের কাছে রাতে থাকতো। আমি সকালে গিয়ে নিয়ে আসতাম। তারপর এক বাঙালি মহিলাকে পেলাম যিনি রূপকের চাইল্ড মাইন্ডার ছিলেন। তিনি একদিন বললেন, ‘আপনার রাতে কাজ থাকলে রূপক আমার কাছেই আমার ছেলেদের সেেঙ্গ থাকতে পারে।’ পরে সেই ব্যবস্থাই হলো। পরবাসে অনেকেই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন, সেটা জানলাম।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box