বিবিসির প্রশিক্ষণ সময়

উর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকব। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

বিবিসি সবসময় প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মীদের পুরোপুরি তৈরী করে নেয়। এই প্রশিক্ষণ শুরু হয় কাজে যোগ দেবার পর পর আর চলতে থাকে কাজ করার পুরোটা সময়। কাজে যোগ দেবার কিছুদিন পরই আমাদের পাঠানো হলো লন্ডনের বাইরে ঊডনর্টন হাউজ বলে একটি জায়গায়। সেখানে পুরো সপ্তাহান্ত কাটালাম আমরা বিভিন্ন সেকশনের কিছু কর্মী। সেখানে শুধু কাজ নয়, বিলেতে বসবাসের টুকিটাকিও শেখানো হলো। একদিন একজন এমপি এলেন। তিনি নানা কথা বোঝালেন। আর একদিন বিবিসির এক বড় কর্তা এসে আমাদের বললেন, ‘পথে ঘাটে কখনো পুলিশের ঝামেলায় পড়লে তোমারা বলো, ‘আমরা বিবিসির জন্য কাজ করি।’ একটি ভিয়েতনামী ঠোঁট কাটা ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ‘তাতে কোন লাভ হয় না।

পুলিশ বলে, ‘আমরা রাণীর জন্য কাজ করি’ (We work for the Queen).’ আমরা পুরো সময়টা খুব উপভোগ করলাম। আলাপ হলো অনেকের সঙ্গে – ক্যামেরনের জাঁ ভিক্টর এনকোলো, মিশরের আব্দুর রাজ্জাক, মেক্সিকোর আরাসেল্লি এবং আরো অনেকে। কারো কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিলো। যেমন জাঁ ভিক্টর পরে নেদারল্যান্ড বেতারে যোগ দেবার পরও আমরা পরস্পরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি। ঊডনর্টন হাউজ থেকে ফেরার পর আমার ও আব্দার রাজ্জাকের অবসর সময়ে ও আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘ব্রিটিশ মিউজিয়ম দেখেছো?’ আমি ‘না’ বলাতে আমার কোন কথা না শুনে টানতে টানতে আমাকে ব্রিটিশ মিউজিয়মে নিয়ে ইজিপসিয়ান গ্যালারী দেখিয়ে বললো, ‘দ্যাখো, সব ওরা চুরি করে নিয়ে এসেছে।’ আরাসেল্লি ছিলো একটি মহা ফুর্তিবাজ মেক্সিকান মেয়ে। তার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়েছিলো। আরো একটি ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিলো, যার নাম টমাজ। যুগোস্লিাভিয়ার ছেলে। দেশে পপ গায়ক ছিলো। আমাকে ওর একটা এলপি রেকর্ডও উপহার দিয়েছিলো, যা এখনো আমার কাছে আছে। খুব ফূর্তিবাজ ছেলে। দেশে ওর বান্ধবী আছে, যার সঙ্গে দীর্ঘদিন ও লিভিং রিলেশনশীপে আছে। ছেলেমেয়েও আছে। ওদের যে কোন একজন দেশ ছাড়লে সে যাবার আগে উইল করে যায়।

বিবিসি তখন সেপারেশন অ্যালাউন্স দিতো বিবাহিত কর্মীদের। তারা স্ত্রী/স্বামী ও ছেলেমেয়েদের জন্য টাকা পেতো। টমাজ অনেকদিন ধরে সেটা দাবী করে আসছে, কিন্তু বিবিসি ওকে সেটা দিতে অসম্মতি জানাচ্ছে। তাতে ও খুব চটে আছে। আমি একদিন ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে বললাম, ‘একই মানুষের সঙ্গেই যখন থাকো, তাহলে বিয়ে করে নিলেই পারতে। তাহলে বিবিসির সঙ্গে এই ঝগড়াটা তোমাকে করতে হতো না।’ খুব রেগে বললো, ‘তুমি তো বিয়ে করেছিলে। কি হয়েছে তোমার?’ বলাবাহুল্য আমার মুখে জবাব ছিলো না। আমরা দু’জনেই হেসেছিলাম। আর একজন ছিলো, যার নামটা মনে পড়ছে না। দেখা হলে যখন জিজ্ঞাসা করতো, ‘কেমন আছো? How are you?’ আমি বলতাম, `Surviving. টিঁকে আছি।’ ও অবাক হয়ে বলতো, ‘তুমি এখানে এসে খুশি নও? ফিরে যেতে চাও তোমার দেশে?’ বলেছিলাম, ’নিশ্চয়ই ফিরে যেতে চাই। একদিন ঠিক ফিরে যাবো।’ পূর্ব ইউরোপের অনেকেই দেশ থেকে বেরোতে পেরে খুশি ছিলো। কিন্তু আমার ধারণা বাংলাদেশের মানুষ সেটা ভাবে না। তবে কেউ কেউ নিশ্চয়ই ভাবে।

কারণ অনেকেই ফিরে যাবার কথা ভাবে না, ভাবেনি এবং ফিরে যায়ওনি। আমার মনে হতো, আমরা লড়াই করে, অনেক রক্তের বিনিময়ে আমাদের বাংলাদেশকে অর্জন করেছি। দেশের প্রতি ভালবাসা আমাদের অন্য রকম। আমি সেজন্য গর্বিত। তাই এত বছরেও আমি আমার পাসপোর্ট বদলাইনি। প্রায় তিরিশ বছর লন্ডন থাকা এবং ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাবার সুযোগ থাকলেও আমি আমার সবুজ পাসপোর্ট ছাড়িনি। আমি ডুয়েল পাসপোর্ট’এ বিশ্বাস করি না। কলকাতা এসে বসবাস করার পর ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি তা প্রত্যাখ্যান করেছি। যে অফিসার আমাকে বলেছিলেন, আমি চাইলে ভারতীয় পাসপোর্ট পেতে পারি, তিনি অবাক হয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি ভারতীয় পাসপোর্ট নিতে চান না? কেন?’ আমি বলেছিলাম, ‘আমরা দেশটা লড়াই করে আর্জন করেছি।’ তখন অবশ্য তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, কারণ পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষের মত তাঁরও শিকড় আমাদের ভূখ-ে। অনেকে আমার এই একগুঁয়েমীকে বোকামী মনে করে। কিন্তু অনেকে আমার এই সিদ্ধান্তকে সম্মান করে। কলকাতার উপ-হাউকমিশনে প্রেসের দায়িত্বে থাকা একজন কারো সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলে সগর্বে বলতো, ‘ওনার পাসপোর্ট কিন্তু এখনো বাংলাদেশী।’ আমি এটাকে স্বাভাবিক বিষয় বলেই মনে করি, কোন গৌরবের কিছু নয়।

ছবি: প্রাণের বাংলা


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box