বিবিসি ও আমি

ঊর্মি রহমান

আশির দশকের এক বরফে ঢাকা ভোরে আমি শিশুপুত্রের হাত ধরে লন্ডন শহরে গিয়ে নেমেছিলাম। আমাকে নিতে এসেছিলেন আমাদের সিনিয়র সহকর্মী সেরাজুর রহমান। তাঁরাই আমার জন্য দক্ষিণ লন্ডনে একটি পরিবারের সঙ্গে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। ঘরটি ছিল বেসমেন্টে আর পরিবারটি ছিল পাকিস্তানী। সেখানে থাকার কোন ইচ্ছে আমার ছিল না। তার ওপর সেই সময় পয়সা ঢুকিয়ে হীটিং চালু করতে হতো। সে বছর খুব ঠা-া পড়েছিল আর আমি বা আমার ছেলে কেউই সেই ঠা-ায় অভ্যস্ত ছিলাম না। আমার ভাগ্য ভাল, কাছেই এক আত্মীয়া রাজিয়া আপা থাকতেন। তিনি একটু বেলা হতে এলেন আর সব দেখেশুনে বললেন, ‘এখানে তুমি থাকবে কি করে? চলো আমার সঙ্গে।’ তিনি আমাদের তাঁর বাড়ি নিয়ে গেলেন। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর সহকর্মী গোলাম কাদেরের সদ্য কেনা বাড়ির একটা ঘর ভাড়া নিয়ে আমি আর পুত্র রূপক সেখানে চলে গেলাম। যেটা ছিল উত্তর লন্ডনে আর সেখানে থেকে বিবিসি ভবন বুশ হাউজ যেতে আন্ডারগ্রাউন্ড বা টিউবে সময় লাগত ২০/২৫ মিনিট। বিদেশ বিভূঁইয়ে একক মা হিসেবে একটু শঙ্কা যে ছিল না, সেটা বলবো না। সে শঙ্কা দূর হয়ে যায় সহকর্মীদের আন্তরিকতা ও সহযোগিতায়। তারা অধিকাংশই ছিলো বাঙালি। এর পরের শঙ্কা ছিল কাজ সংক্রান্ত। আমি প্রিন্ট মিডিয়া থেকে গিয়েছিলাম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যায়, বিবিসি মনে করতো (হয়ত এখনো করে), তারা লেখককে ব্রডকাস্টার বানাতে পারবে কিন্তু লেখার হাত বা অভ্যাস না থাকলে ব্রডকাস্টারকে লেখক বানানো যায় না। আর সেজন্যই রেডিও-টেলিভিশনের সেলিব্রিটিদের বদলে আমরা, প্রিন্ট মিডিয়ার লোকজন কাজ পেয়েছি বিবিসিতে। যাহোক, আস্তে আস্তে সহকর্মীদে র সহায়তায় কাজ শিখলাম। কাজ করতে শুরু করলাম। তখন তিনটা ট্রান্সমিশন ছিল – প্রবাহ, পরিক্রমা ও প্রভাতফেরী। শেষটা আমরা প্রচার করতাম মধ্যরাতে, যা বাংলাদেশে ভোরে শুনতে পেতো। এছাড়াও ছিল অনেক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান – নারী ও শিশুদের জন্য, সংস্কৃতি বিষয়ক, সাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা, শ্রোতাদের চিঠিপত্রের নিয়ে অনুষ্ঠান ইত্যাদি। দেশ থেকে সেরকম কেউ এলে তাদের সাক্ষাৎকারও থাকতো। এখানে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করার লোভ সম্বরণ করতে পারছি না। সেই সময় রাতের শিফট’এ খবর পড়ার প্রশিক্ষণ হতো। অর্থাৎ সবাই খবর পড়তে শুরু করতেন প্রভাতফেরী অনুষ্ঠান থেকে। তার আগে পর্যন্ত কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স’ই করতাম টীমের একজন হয়ে। আমি হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, আমাকে রাতের পালায় ডিউটি দেওয়া হচ্ছে না। আমি বিভাগীয় প্রধান জন রেনারকে গিয়ে তার কারণ জিজ্ঞাসা করাতে তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি তো জানি নাইট শিফট্’এ কাজ করতে তোমার অসুবিধা আছে!’ আমি বললাম, ‘আমি কখনো তোমাকে বলেছি আমার অসুবিধা আছে?’ তখন জন লজ্জা পেয়ে বলেছিলো, ‘না, তুমি বলোনি।’ বুঝলাম, আমার কোন পুরুষ সহকর্মী (তখন স্টাফদের মধ্যে আমি একমাত্র নারী ছিলাম) আমার এই ‘উপকার’টা করেছেন! তার পরের সপ্তাহ থেকে আমাকে নাইট শিফট্ দেওয়া হলো। অসুবিধা যে হয়নি, তা নয়। সহকর্মীরা সাহায্য করেছেন। তাদের কারো কারো বাড়িতে ছেলে রূপককে রেখে কাজে গিয়েছি। পরে ওকে যে বাঙালি মহিলা রাখতেন, ওর সেই চাইল্ডমাইন্ডারের অনুরোধে তাঁর বাড়িতেও তাঁর দুই ছেলের সঙ্গে রূপক রাতে থেকেছে।
কিন্তু সেই বিবিসি আর নেই। এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বুশ হাউজও আর বিবিসি ওয়ার্ল্ড নার্ভিসের বাড়ি নয়। এখন সেটা সরে গিয়ে ঝকঝকে কাঁচের দালানে এক সঙ্গে বিবিসি’র অন্যান্য শাখার সঙ্গে রয়েছে। বিবিসি হোম রেডিও, টেলিভিশন সবাই এক জায়গায় আছে। এখন ট্রান্সমিশন দুইটা প্রবাহ ও প্রত্যুষা। পুরনো অনুষ্ঠানের মধ্যে শ্রোতাদের চিঠিপত্রের নিয়ে শুধু ‘প্রিিতভাজনেষু’ এখনো আছে। ফোন ইন, বিশেষ প্রতিবেদন থাকে। এখন বেশ কিছু অনুষ্ঠান দেশ থেকে অর্থাৎ ঢাকা থেকে হয়। প্রচুর জিনিস অন লাইন’এ যায়। এছাড়াও চ্যানেল আই টেলিভিশনে বিবিসি বাংলার অনুষ্ঠান থাকে।
বিবিসি ছেড়েছি আজ অনেক বছর। শ্রোতাদের অনেকে আজও আমাকে মনে রেখেছেন। কলকাতার মঙ্গল শোভাযাত্রা গ্রুপের এক বন্ধু অভিজিত উত্তর বঙ্গের ডুয়ার্সের এক চা বাগানে গিয়েছিলেন, সেখানে একজন নাম শুনে জানতে চেয়েছেন, আমি বিবিসি’র সেই ব্যক্তি কিনা। সেটা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। যতদিন বিবিসি’তে কাজ করেছি, আনন্দের সঙ্গেই করেছি। কাজের পরিবেশ ভাল ছিলো। অনেক কিছু শিখেছি। সহকর্মী সবার সঙ্গে প্রায় আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। সে সম্পর্ক আজও অটুট আছে।

ছবিঃ গুগল