বিশ্বাসহীন ভালোবাসা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সানজিদা সৈয়দ

চায়ে চুমুক দিতে দিতে আড়চোখে  সুমিতের দিকে তাকালো শ্রেয়া, এই পাঁচ বছরে বেশ বুড়ো হয়ে গেছে তার চোখে দেখা সবচেয়ে হ্যান্ডসাম মানুষটা। চোখের নিচে কালি চুলেও বেশ পাক ধরেছে গলায় বেশ ক’টা ভাঁজ ও পড়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেছে সুমিত। প্রচন্ড ক্লান্ত মানুষটা ফেরার আধাঘন্টা পরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো। শ্রেয়া সারারাত পাশে বসে তাকিয়ে ছিলো, একবারের জন্যও লোকটা নড়েনি, গভীর ঘুমে ছিলো। তার মনের মধ্যে কে যেন বলছিলো বারবার সে ফিরেছে আমার কাছে ফিরেছে। শেষবার তাকে দেখেছিলো পাঁচ বছর আগে কোর্টে।  সেদিন তার সাজা হয়েছিলো। বাল্যকালের বান্ধবি অরিনকে আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে পাঁচ বছরের সাজা হয়েছিলো সুমিতের। নামকরা এডভোকেট অনেক প্রমান থেকে তাকে র্নিদোষ প্রমান করতে না পারলেও সাজা কমিয়ে পাঁচ বছরে আনতে পেরেছিলো।  অরিনের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক ছিলো সুমিতের, শেষের দিকে সুমিত এই সম্পর্কের ইতি টানতে চেয়েছিলো,সেকথা জানাতে অরিন সুমিতকে তার বাসায় শেষ বারের জন্য যেতে বলে, সুমিত গিয়েছিলো শেষ বারের জন্য, সেখানে অরিনের লাশ পড়ে ছিলো আর খোলা ল্যাপটপে সুইসাইড নোট, যাতে লেখা ছিলো ‘আমার মৃত্যুর জন্য সুমিত দায়ী, আমাদের সম্পর্কের জন্য আমার সংসারও আমি করতে পারিনি কিন্তু আজ ও সব কিছু শেষ করতে চায় তাই আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম’। খুব সহজে প্রমান হয়ে গেছিলো তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিলো, এবং সব সাক্ষী প্রমানে এটা সহজেই প্রমানিত হয়েছিলো। এই পুরো সময়টা শ্রেয়া চুপই ছিলো আর তার থেকেও বেশি চুপ ছিলো সুমিত। জেলে যাবার সময় সুমিত শুধু শ্রেয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, প্লিজ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো না, আমি একা থাকতে চাই, বেরিয়ে বাসায় আসবো।
সুমিত ফিরেছে, শ্রেয়ার খুব আনন্দ হচ্ছে কিন্তু প্রকাশ করতে শংকা হচ্ছে।  শেষ রাতে চোখ লেগে এসেছিলো খুট করে শব্দ হতে চোখ মেলে দেখলো সুমিতের ঘুম ভেঙে গেছে। শ্রেয়া চট করে উঠে গোসল করে নিল, লাল রঙের একটা শাড়ি পড়লো নীল পাড় করা।সুমিত দিয়েছিলো তাদের তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকীতে। পরা হয়নি। যত্ন করে চা করলো সুমিত যেমন পছন্দ করে। ছোট বারান্দায় চা নিয়ে বসলো দুজনে।
নিরবতা ভেঙে সুমিত বললো কেমন ছিলে?
হালকা করে হাসলো শ্রেয়া,তুমি বেশ বুড়ো হয়ে গেছো।
হুমম, তোমার চাকরি কেমন চলছে আগেরটাতেই আছো না বদলেছো।
না ওখানে আর থাকতে পারছিলাম না। সবাই তোমার আর অরিনের সম্পর্ক আর আত্মহত্যার  আলোচনা করতো, ভাল লাগতো না।তাই ছেড়ে দিয়ে একটা স্কুলে চাকরি নিলাম, বেশ চলে যাচ্ছে। সুমিত শান্ত ভারি চোখে শ্রেয়ার দিকে তাকালো, শ্রেয়া শিউরে উঠলো।
শ্রেয়া, অরিন আত্মহত্যা করেনি, হত্যা করা হয়েছিলো ওকে, তুমি ওকে হত্যা করেছিলে  বিষ দিয়ে। আর সামনে রেখে দিয়েছিলে বিষের বোতলটা। তার দু‘দিন আগে আমাকে দিয়েই কিনিয়েছিলে না ওটা? ইঁদুর হয়েছে বলে। শিশিটা একপাশে ভাঙা ছিলো, অনেক চিৎকার করেছিলে সেজন্য, তোমার ধারনা ছিলো ওটা নকল। সেই শিশিটাই দেখেছিলাম আমি অরিনের বেডরুমে। শ্রেয়ার গলা শুকিয়ে আসে,
সুমিত বলতে থাকে, সেদিন সকালে তোমার সঙ্গে ঝগড়া করে অফিস গেছিলাম কিন্তু খুব খারাপ লাগছিলো কিছুক্ষণ পর বাসায় ফিরে দেখি তুমি নাই, তার কিছুক্ষণ পরই অরিনের ফোন থেকে ম্যাসেজ ‘শেষ বারের মতো এসো সুমিত, কথা দিচ্ছি আর কখনো ডাকবো না আমি’। যখন পৌঁছেছি তখন অরিন আর নেই তুমি সব শেষ করে দিয়ে বেরিয়ে গেছো।  পাশে মম পড়ে ছিলো তখন যা বুঝার বুঝেছি আমি। কারন অরিন নিজে থেকে ওটা খাবে না। পরে বুঝেছিলাম সুইসাইড নোটটা তোমারই লেখা ছিলো।
শ্রেয়া ধীরে ধীরে বলল, হুমম। আমি করেছিলাম সব।কারন সেদিন সকালে তুমি বলেছিলে তোমার সঙ্গে আসলেই অরিনের সম্পর্ক আছে। সঙ্গে সঙ্গে সুমিত বললো, সেটা তো রাগের মাথায় বলেছি, তুমি রোজ এটা নিয়ে খিট খিট করতে আমি বহুবার বলেছিলাম কিছু নেই আমাদের মধ্যে।   তার কিছুদিন আগে তো আমি অরিনের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম তোমাকে বলেছিলামও, বিশ্বাস করনি তুমি।
তুমি যখন বুঝেছিলে পুলিশকে সত্যটা জানাওনি কেনো? সুমিত হাসলো।
শ্রেয়া বললো,তোমার মুখ থেকে যখন বের হলো অরিনের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক আছে, রাগে আমি পুড়ে যাচ্ছিলাম। তখনই ভেবে নিলাম তোমাদের দুজনকে শাস্তি পেতেই হবে। প্রচন্ড ভালোবাসি তোমাকে, কিছুদিন দুরত্ব হোক কিন্তু আমার কাছে তোমাকে ফিরতেই হবে। আইনের স্টুডেন্ট হওয়ায় এগুলো বেশ সাহায্য করেছিলো আমাকে। অরিন আপু আমাকে দেখে দরজা খুলে দিয়েছিলো উনাকে পয়জন খাওয়াতে বেগ পেতে হয়নি।সকালে বানানো বিষ মেশানো মম নিয়ে গেছিলাম। ওটা খাওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যে অরিন মারা যায়। তোমাকে ম্যাসেজ দিয়েছিলাম মোবাইল থেকে তারপরই। গ্লাভস পরে ল্যাপটপে সুইসাইড নোটও লিখেছিলাম যাতে তুমি ফেঁসে  যাও। তোমাকে একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছিলাম। শুদ্ধ করে ফেরাতে চেয়েছিলাম তোমাকে। কিন্তু তুমি চুপ ছিলে কেনো? কেন প্রতিবাদ করোনি সুমিত।
কারন আমি তোমাকে নিজে শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম। বিয়ে করে তোমাকে যেদিন আমার ঘরে এনেছিলাম সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তোমার কোন ক্ষতি হতে আমি দেবোনা। প্রচন্ড পাগল ছিলাম তোমার, তোমার হাসি, রাগ, কান্না সব আমাকে নাড়া দিতো। তোমার খোলা চুল,অফিস থেকে ফিরে তোমাকে জড়িয়ে ধরা, তোমার গায়ের গন্ধ সব কিছু আমার ভালবাসা ছিলো, আমি প্রকাশ করতে পারিনি তাই বলে কি ভালোবাসা কম ছিলো? হুমম এসব কিছুর বাইরেও আমার কিছু দায়িত্ব ছিলো, অরিন সেরকমই একটা দায়িত্ব। ওর হাজব্যান্ডের সঙ্গে ওর সেপারেশনের পর খুব আপসেট ছিলো, ওকে সময় দেয়া তখন আমার দায়িত্ব ছিল বন্ধুর মতো। অন্য কোন সম্পর্ক ছিলো না।  কিন্তু সুইসাইড করার মতো দুর্বল সে কখনো ছিলো না। তাই হিসাব মেলাতে অসুবিধা হয়নি। তোমার বানানো মমর বাটি দেখে যা বুঝার বুঝে গিয়েছিলাম। আমি শুধু তোমাকেই ভালোবেসেছি শ্রেয়া। তুমিও আমাকে ভালোবেসেছিলে কিন্তু সেখানে বিশ্বাসের থেকে ঘৃনা রাগ বেশি ছিলো। তাই তোমার ভালোবাসা হেরে গেছে। শ্রেয়ার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো। তুমি পুলিশকে ফোন দাও, আমার শাস্তি প্রাপ্য,ভুল করে ফেলেছি আমি।
কঠিন হাসি হেসে সুমিত বললো শাস্তি তোমার প্রাপ্য, আমি তোমাকে সেই শাস্তি দিবো। আমি চলে যাচ্ছি শ্রেয়া। কখনো ফিরবো না।আমার এই না ফেরাটাই তোমার শাস্তি। আমাকে বিশ্বাস না করার শাস্তি। তুমি জানবে আমি আছি কিন্তু তোমাকে আর আমার চাই না, এই অবহেলায় বাঁচবে। তোমার মতো করে ভালো থেকো আজ থেকে তোমার দায়িত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করে দিলাম। ভালবাসাটা আর নেই।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]