বিশ্বাসের পৃথিবী জুড়ে থাক মননের মৈত্রেয়ী

লুৎফুল কবির রনি

ছোটথেকেই রবীন্দ্র বাতাবরণে বড় হচ্ছিলেন মৈত্রেয়ী দেবী। তার বাবা প্রখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত। মা বাবা দু’জনেই ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত। প্রথম থেকেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি একটা অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করতেন মৈত্রেয়ী। তাঁকে ঘিরেই তৈরী হতো তার স্বপ্ন জগত।
প্রথম দেখা রামমোহন লাইব্রেরীর এক অনুষ্ঠানে। সেদিন দিদিমা, মা ও মাসীর সঙ্গে মৈত্রেয়ীও হাজির একেবারে সামনের সারিতে। একটু পরেই রবীন্দ্রনাথ ঢুকলেন। সভার সমস্ত মানুষ স্তব্ধ, মন্ত্রমুগ্ধ। গেরুয়া রঙের জোব্বা। মালা চন্দন ভূষিত উন্নত ঋজু দেহ। সমস্ত পরিব্যপ্ত করে এক উদ্ভাসিত মহিমা! তাঁকে দেখতে দেখতে একটা অব্যক্ত বেদনায় মৈত্রেয়ীর শিশুমন ব্যাকুল হয়ে চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো।
হ্যাঁ , দিশাহারা হয়েছিলেন মৈত্রেয়ী। যেদিন রবীন্দ্রনাথকে বাড়ীতে দেখলেন। সেদিন তার মা পঞ্চব্যঞ্জন নয় পঞ্চাশব্যঞ্জন রান্না করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের জন্য। আসনে বসিয়ে থালাবাটি সাজিয়ে খুশিমনে একটি একটি করে বাটি এগিয়ে দিচ্ছিলেন। একটু দূর থেকেই এই বিরাট মানুষটিকে দেখে তার মনে হচ্ছিলো যেন পরিচিত জগতের বাইরের নূতন ভুবনে উদিত কোন নূতন বিবস্বানের আলো এসে পড়েছিলো। যাকে ধারণ করার, বুঝবার, স্মরণে রাখার মত বুদ্ধি ও মন তখনও তার তৈরী হয়নি।
সেই অপক্ক অপরিচিত মনের বিস্ময়টির কথা তার মনে পড়েছিলো বহুদিন পর এক পাদ্রী কন্যার গল্প শুনে। আমেরিকায় এক পাদ্রীর বাড়ীতে চায়ের নিমন্ত্রনে রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত। হঠাৎ পাদ্রীর পাঁচ বছরের কন্যা দৌড়ে এসে রবীন্দ্রনাথের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো তারপর মুখ তুলে দেখে আবার দৌড়ে ফিরে এসে বাবার কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিল “Father I have seen God.” সেদিন বাড়ীতে রবীন্দ্রনাথকে দেখে মৈত্রেয়ী দেবীর ওই রকমই উপলব্ধি হয়েছিলো।
মৈত্রেয়ী দেবীর রিচিরোডের বাড়ীর সামনে গলির পাশে একটি শিশু ছাতিম গাছ ছিলো। সেই সপ্তপর্নীই ছিলো ওর ভালোবাসা। গাছটিকে তিনি আদর করতেন, আলিঙ্গন করতেন, কবিতা শোনাতেন। ওর কাছে গিয়ে কাঁদতেন। ওকে না দেখে সে থাকতে পারতেন না। তাঁর ধারনা হয়েছিলো ছাতিম গাছের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের একটা সম্পর্ক আছে। গাছটা ছিলো তার প্রতীক। ‘একটি মেয়ের প্রেমের কথা’ চলতো ওই ছাতিম গাছের সঙ্গে।
ছাতিম গাছকে নিয়ে একটা কবিতা লিখে রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিল চিঠি। রবীন্দ্রনাথ উত্তরে লিখেছিলেন ‘চিঠির ভিতরে ছাতিম গাছের যে কবিতাটি লিখেছো সেটি সুন্দর হয়েছে -ওই ছাতিমে ভাবী কালে যে ফুলের মঞ্জরী ধরবে তোমার কবিতাটুকুর মধ্যে এখনি তার গন্ধ পাচ্ছি’। এটিই ছিল মৈত্রেয়ী দেবীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের প্রথম চিঠি।
মৈত্রেয়ী বড় হতে থাকলেন। সেইসঙ্গে বাড়তে থাকলো রবীন্দ্রনাথের প্রতি অনুরাগ। মৈত্রেয়ীর বাবা জানতেন মেয়ের রবীন্দ্রানুরাগের কথা। মেয়ের অনুরাগের কথা জানিয়ে এক পত্র লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ আহ্বান জানালেন। পালে লাগল রাবিন্দ্রিক বাতাস। রবীন্দ্রভাবে ভেসে চললেন মৈত্রেয়ীর তরনী।
বাবা মাকে সঙ্গে করে মৈত্রেয়ী এলেন জোড়াসাঁকোয়। বাবা মা বসার ঘরে বসলেন। মৈত্রেয়ী গেলেন ‘বিচিত্রা’ ঘরে। সেখানে তখন পুরোদমে রিহার্সাল চলছে। ঘর ভর্তি ছাত্র- শিক্ষক। গান থামতেই এগিয়ে গেলেন মৈত্রেয়ী। বসলেন রবীন্দ্রনাথের পায়ের কাছে। হাতে দিলেন ফুলের বদলে ছাতিম গাছের কচি বৃন্ত। প্রণাম করলেন। রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত। প্রশ্ন করলেন, “কেগো তুমি? তারপর হাতের ছাতিম বৃন্তের দিকে লক্ষ্য পড়তেই বললেন ‘এ যে সপ্তপর্ণ ! ওঃ তুমি মৈত্রেয়ী’ ? ঘরের সমস্ত লোক তাকিয়ে আছে মৈত্রেয়ীর দিকে। একটা চাপা গুঞ্জন! ফুলের ভাষায় কথা বলা যায় কিন্তু পাতার ভাষায়? সেদিন থেকে শান্তিনিকেতনের মেয়েদের কাছে তাঁর নাম হলো ‘ছাতিম পাতা’।

মৈত্রেয়ী দেবী ও মির্চা

এরপর সেই ছাতিম পাতার আর বাধ মানেনি। কখনো বাবাকে সঙ্গে করে বা নিকটাত্মীয় কোন চলনদারকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হতেন রবীন্দ্র সকাশে। কখনো জোড়াসাঁকোয় কখনও বা শান্তিনিকেতনে।
মৈত্রেয়ীর নিজের কথায়- ‘আমার অস্ফূট হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক অনাস্বাদিত আনন্দধারা বইয়ে দিতো। গভীর রহস্যঘন যবনিকার আড়াল থেকে যৌবনোন্মেষের বেদনায় মথিত হয়ে এক অজ্ঞাতলোকের অনির্বচনীয় আভাষ আসতো। তখন রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে একজন অভাবনীয় মানুষ মাত্র নন। তিনিই তাঁর কবিতার মূর্তি, তিনিই সেই চন্দ্র যাঁর কবিতা জ্যোৎস্নাধারার মতই অবিরাম আমার অন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে যেন রূপকথার মায়ালোক সৃষ্টি করছি।’
মৈত্রেয়ীর জীবনে ঘটে গেলো এক অঘটন। তার জীবনে এসেছিলেন এক বিদেশী। মির্চা এলিয়াদ। মৈত্রেয়ী তাকে ভলোবেসেছিলেন। ভালোবাসার কথা জানাজানি হতেই এলিয়াদকে তার পিতা নিষ্ঠুরভাবে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিলেন। মির্চা হারিয়ে গেলো মৈত্রেয়ীর জীবন থেকে। এক অব্যক্ত বেদনায় বিষাদগ্রস্ত হলো মৈত্রেয়ীর জীবন। তার অধ্যাপক বাবা অনেক চেষ্টা করেও তাকে স্বভাবিক করে তুলতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত তার মা তাকে পাঠালেন সেই পরমপুরুষের কাছে। মৈত্রেয়ী তাঁর পায়ের কাছে পড়ে বললেন , ‘ আমাকে আপনার কাছে থাকতে দিন’। কবি হৃদয় দিয়ে অনুভব করলেন মৈত্রেয়ীর দুর্দশাগ্রস্ত হৃদয়ের কথা। তাকে শান্ত করলেন।
এর কিছুদিনের মধ্যেই মৈত্রেয়ীর বিয়ে হয়ে গেলো। কবি তখন শিলং-এ। বিয়ের তিন চার দিন পরে কবি ফিরে এলেন। খবর পেয়ে মৈত্রেয়ী শান্তিনিকেতনে দেখা করতে এলেন। হাতে কানে গলায় গয়না, মাথায় সিঁথি, সিঁদুর। সম্পূর্ণ বধূ বেশে। রবীন্দ্রনাথ দেখেই দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন- ‘এসো অমৃতা’। মৈত্রেয়ী কোলের উপর পড়ে কাঁদতে লাগলেন। রবীন্দ্রনাথ একটু সময় নিলেন। বললেন, ‘যদি তুমি সুখী না হও অমৃতা ,যদি তুমি পরাজিত হও- তাহলে আমি মনে করব সে আমারি পরাজয়…. যদি তুমি একখানি নীড় তৈরী করতে পার, যেখানে তোমার আনন্দের সংসারে সকলে আনন্দিত তাহলে আমি কথা দিচ্ছি আমি যাব তোমার সেই ঘরে’।
মৈত্রেয়ী চলে গেলেন তার স্বামীর সঙ্গে মংপুতে। মৌন পাহাড়ের এক ভয়ংকর নির্জনতায় তার দিন কাটে! এরপর কবির সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ খুব সহজ ছিলো না। নূতন জীবনে নানা কর্তব্যভারে জড়িয়ে গেলেন মৈত্রেয়ী। কিন্তু কবি মৈত্রেয়ীর কথা ভূলেননি। এক চিঠিতে শেষে লিখলেন,- -‘কেমন আছো? তোমার খবর অনেকদিন পাইনি’। চিঠি পেয়ে মৈত্রেয়ীর মন উতলা হলো। বুঝতে পারলেন কবি দেখা করতে চান। মনে পড়লো কবির কথা- -তোমার ঘর যদি আনন্দের ঘর হয় তবে আমি যাব তোমার কাছে…। স্বামী স্ত্রী দুজনে সই করে এক চিঠিতে আমন্ত্রন জানিয়ে লিখলেন, ‘এখানে না এলে বুঝবেন কি করে আমি কেমন আছি’?
কবি এলেন। মৈত্রেয়ীর কথায় ,‘তিনি যখন আমার ঘরে এলেন তখন তাঁকে আরো অভাবিত মনে হয়েছিল -সেঁজুতির সেই কবিতার মত –‘আজিও যাহারে কেহ নাহি জানে দেয়নি যে দেখা আজও কোনখানে ‘-সেই অ ভাবিত কল্পনাতীত আবির্ভাব -যার জন্য আমার আজন্ম প্রতীক্ষা। তাঁর উপস্থিতি চারিদিকে এক অনাস্বাদিত আস্বাদ, অনির্বচনীয় সুঘ্রাণে ভরে যেত। কন্ঠে ঝঙ্কৃত হত সেই গান— ‘ তুমি পাখির কন্ঠে আপনি জাগাও আনন্দ, তুমি ফুলের বুকে ভরিয়া দাও সুগন্ধ’ ’। রবীন্দ্রনাথের অধিষ্ঠানে মংপু মায়াপূরীতে পরিনত হলো। মৈত্রেয়ীর বাড়ীতে নেমে এলো স্বর্গ।
কবি একবার নয় মোট চারবার গিয়েছিলেন মৈত্রেয়ীর কাছে মংপুতে। সেপ্টেম্বরে আবার আসবেন বলে দু’ব্যাগ জামা কাপড় রেখে এসেছিলেন। কবির কাছে মৈত্রেয়ী ছিলেন একনিষ্ঠ ভক্ত, সেবিকা কখনও প্রিয়া কখনও মাতা কখনও বা কন্যা। কবি আদর করে কত নামেই তাকে ডাকতেন! ‘মিত্রা’ ‘ অমৃতা’ ‘মাংপবী’ ‘সুনয়নী’ ‘শুনাইনি’ এবং ‘মৈত্রেয়ী’। আর মৈত্রেয়ীর কাছে? মৈত্রেয়ীর কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন মহামানব; তার -জীবনের ধ্রুবতারা—প্রভাতের সূর্য–তার সন্ধারাগ।
শেষের কটা দিন মৈত্রয়ীর কাছে থাকবেন বলে রওনা হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কালিম্পং এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে মৈত্রেয়ী ছুটে আসেন। তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। সেবার মৈত্রেয়ী দেবী প্রায় একমাস কবির কাছে ছিলেন। এছাড়াও আর একটিবার মৈত্রেয়ী দেবী কবির সেবা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেবার শ্বাশুড়ী মা অসুস্থ থাকায় মৈত্রেয়ী দেবীকে কলকাতায় আসতে হয়। সেখান থেকে ব্যবস্থা করে কোনরকমে শান্তিনিকেতনে চলে আসে মৈত্রেয়ী।
কয়েকটা দিন মাত্র কবির কাছে ছিলেন মৈত্রেয়ী। কত গল্প, কত গান, কত কবিতায় মাতিয়ে রেখেছিলেন অসুস্থ কবিকে। কবিও ছাড়তে চাইছিলেন না তাঁর অমৃতাকে। আসার সময় এক প্রকার ‘নিজেকে ছিড়ে নিয়ে ‘ আসতে হত! তখন কবিকে খুবই অসহায় লাগত!’ ভাবতে অবাক লাগে কিভাবে একটি মেয়ে আপন সাধনা, ভক্তি, প্রেম ,ভালোবাসা ও নিষ্ঠার দ্বারা রবীন্দ্রনাথের আত্মার আত্মীয় হতে পেরেছিলেন! পেয়েছিলেন উচ্চ আসন -যা আর কেউ পায়নি! রবীন্দ্রনাথের মতো ব্যক্তিত্ববান, সংবেদনশীল মানুষ ‘ঘরের মানুষ’র হয়ে মৈত্রয়ী দেবীর কাছে এসেছিলেন চার বার -এমন সৌভাগ্য আর কারো হয়নি।
একবার মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করলেন আপনার বিয়ের গল্প বলুন।
কবি জবাব দিলেন…….
আমার কোনও বিয়ের গল্প নেই। বৌঠানরা বিয়ের জন্য জোড়াজুড়ি শুরু করলে আমি বললেম তোমাদের যা ইচ্ছে করো, আমার কোনও মতামত নেই। তারপর বৌঠানরা যশোরে গিয়েছিলেন। আমি বলেছিলেম আমি কোথাও যেতে পারবোনা। আমার বিয়ে জোড়াসাঁকোতেই হবে।
মৈত্রেয়ী দেবী বললেন….
কেন আপনি বিয়ে করতে যাননি?
কেন যাবো? আমার একটা মানসম্মান আছেনা? রবীন্দ্রনাথের সাফ জবাব।
‘ প্রেম কি একটা বস্তু যে তুমি একজনের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে অন্যকে দেবে? একি বিষয়সম্পত্তি? সোনার গহনা? এতো একটা আলো মির্চা, একটা আলো। যেমন বুদ্ধির আলো জ্ঞানের আলো তেমনি প্রেমের আলো।… এ আলো জ্বললে ত্রিভুবন প্রেমময় হবে- অপ্রিয় প্রিয় হবে- তুমি বিশ্বাস কর মির্চা তোমাকে মনে পড়বার পর আমার স্বামী আমার কাছে প্রিয়তর হয়েছেন, এতো ভালো তাঁকে আগে কখনো বাসিনি। বিশ্বাস করবে তুমি?’
নিশ্চয়ই মনে পড়ছে মৈত্রেয়ী দেবীরআকাদেমী পুরস্কার প্রাপ্ত ‘ন হন্যতে’ উপন্যাসের কথা।
“ন হন্যতে” মৈত্রেয়ী দেবীর বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। “ন হন্যতে” অর্থ হল দেহ ধ্বংস হলেও আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না …শ্রীমদ্ভগবদগীতা-ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে। মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’ উপন্যাসটিকে বলা হয়েছে সমকালের একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।
১৯১৪ সালে ১ সেপ্টেম্বর ইংরেজ শাসিত বাংলার চট্টগ্রাম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মৈত্রেয়ী দেবী। পিতা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত একজন দার্শনিক এবং প্রবন্ধকার আর মা হিমানী মাধুরী রায়। যদিও তার শৈশব কাটে বরিশালে, পিতার আদিনিবাস বরিশালের আগৈলঝারা গ্রামে। পরে পিতার কর্মক্ষেত্রের সুবাদে কৈশোরেই সপরিবারে চলে আসেন কলকাতার ভবানীপুরে। একদিকে পিতার আদর্শ আর অন্যদিকে তৎকালীন কলকাতার ‘এলিট’ সম্প্রদায়ের সাহচর্য, মৈত্রেয়ী দেবীর মননে আনে দার্শনিকতার ছাপ। ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন
রোমানিয়ান যুবক মির্চা এলিয়াদ ও বাঙ্গালী কিশোরী মৈত্রেয়ী দেবীর অসম্পূর্ণ প্রেমের উপাখ্যানের দুই পক্ষের জবানবন্দী এই দুই বই। ‘লা নুই বেঙ্গলী’ বইখানা মির্চা এলিয়াদ লিখেছেন ১৯৩৪ সালে, আর তার জবাবে মৈত্রেয়ী দেবী তার ‘ন হন্যতে’ লিখেন ১৯৭৪ সালে।
‘ন হন্যতে’ আর ‘ লা নুই বেঙ্গলী’ বইদুটি পরস্পরের মধ্যে কথা বলে। পাঠক হিসেবে আমরা বাস্তবের চরিত্রদের আখ্যানের হয়ে উঠতে দেখি, দেখা আর দেখানোর পার্থক্যে, সত্য ও কল্পনার নিরিখে এই দুই সৃষ্টি যেন দুই সংস্কৃতির কথা বলে। সংসার, সমাজ, আত্মীয়স্বজন সবার সামনে বিগত জীবনের ইতিহাসকে স্বীকার করা কম কথা নয়। নারীবাদী দৃষ্টিতে এই উপন্যাসকে বিচার করলে নতুন অভিমুখের হদিশ পাওয়া যাবেই। এই উপন্যাসের দর্শন ভারতীয় সংস্কৃতির বিশ্বাসের মর্মে নিয়ে যায়। যেখানে শেষ বলে কিছু নেই।
রবীন্দ্রনাথের কথা আমরা পেয়েছিলাম‘ন হন্যতে’ (১৯৭৪) উপন্যাসে। বহুমাত্রিক সে পরিচয়। আমরা জানি অল্প বয়স থেকেই মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রসান্নিধ্য পেয়েছেন। ‘ মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ (১৯৪৩), ‘স্বর্গের কাছাকাছি’ (১৯৮১) বইদুটিতে সে পরিচয় বিধৃত হয়েছে। জীবনের একেবারে শেষ পর্বে রবীন্দ্রনাথের মংপুতে বসবাসের এই বিবরণ রবীন্দ্রনাথের জীবনী রচনার অন্যতম উপাদান হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
১৯৭১ এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন ও শরনার্থীদের কল্যানে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর কলকাতা থেকে একে এক সবাই দেশে ফিরে আসা শুরু করেন। এ সময় সৈয়দ আলী আহসান কলকাতায় যারা তাদেরকে সাহায্য করেছিলেন, তাদের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎকারে মিলিত হন। কলকাতার পাম এভিনিউয়ে থাকতেন মৈত্রেয়ী দেবী। তাঁর বাসায়ও যান সৈয়দ আহসান। মৈত্রেয়ী দেবী দূরদর্শী মানুষ ছিলেন বলেই তাঁর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎকারে সৈয়দ আলী আহসানকে অকপটে বলতে পেরেছিলেন, ‘দেখুন, পাকিস্তান একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র ছিল। তারা মৌলবাদের উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। এর ফলে আপনারা বিক্ষুব্ধ হলেন। এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হলেন। আপনারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে আপনাদের রাষ্ট্রের একটি আদর্শ হিসেবে স্থির করেছেন। সেই আদর্শ যাতে অক্ষুন্ন থাকে, তাই আমি চাই। একটু হেসে বললেন, দেখুন দেশটা যেন মুসলমানী দেশ না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখবেন।’ (যখন সময় এল : সৈয়দ আলী আহসান )।
রুচির যে আভিজাত্য, পান্ডিত্যের যে প্রাঞ্জল প্রকাশ, আবেগের যে দীপ্ত উচ্চারণ আজ প্রায়শই দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে, সে সময় মৈত্রেয়ী দেবীকে ফিরে পড়তেই হবে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে হোক, কিংবা স্মৃতি- লেখায় কিংবা রবীন্দ্রনাথের সৃজন রহস্যের অংশীদার হতে।
স্বর্গের কাছাকাছি যেন উন্নীত হতে পারে আমাদের অস্তিত্বের বোধ। আর মৃত্যুদিনের প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে সেই অমোঘ শ্লোক-বিশ্বাসের পৃথিবী জুড়ে থাক মননের মৈত্রেয়ী।

ছবি: গুগল