বিড়াল দরদী বৃদ্ধা

মাসুদুল হাসান রনি

(মন্ট্রিয়েল  থেকে): মধ্যরাতে বাসায় ফেরার পথে প্রায় এক বৃদ্ধামহিলাকে দেখি ফুটপাতে ছোট ছোট প্লেটে খাবার ও পানি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।তার কপালের বেল্টে সার্চ লাইট । তুমুল তুষারপাত ও বৃস্টিররাতেও দেখেছি মহিলাকে একই স্থানে দাঁড়িয়ে যেনো কাদের জন্য যেন অপেক্ষা করেন। কিন্তু কখনো থেমে কথা বলা হয়নি কিংবা একটু দাঁড়িয়ে দেখিনি এসব খাবার কাদের জন্য সাজিয়ে রেখেছেন।

গাড়ির ব্যাকবুটে বিড়ালের জন্য রাখা খাবার

রাত ২টায় বাসায় ফেরার সময় বৃদ্ধামহিলাকে দূর থেকে দেখলাম ৮/১০ টি বিড়ালকে খাবার দিচ্ছেন। কোন কোন বিড়ালের গায়ে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আবার কোলে তুলে আদর করছেন। কৌতুহলবশতঃ পা টিপে টিপে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখছিলাম বিড়ালদের সঙ্গে বৃদ্ধার হৃদতা।মাঝেমাঝে বিড়ালদের সঙ্গে ফরাসীভাষায় কথা বলছেন, বিড়ালগুলো ঘাড় বাকিয়ে উত্তর দিচ্ছে মিঊ মিঊ শব্দে। মহিলা একটু পরপর গাড়ির ব্যাকবুট খুলে নানান রকম খাবার বিড়ালদের প্লেটে তুলে দিচ্ছেন।
প্রায় ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর বৃদ্ধার চোখ পড়ে আমার দিকে। প্রথমে ফ্রেঞ্চে কিছু একটা জিগেস করলো। আমি ক্ষমা চেয়ে বলি, মাদাম, আমি ফ্রেঞ্চ জানি না। তুমি কি ইংরেজী জানো? মহিলা কোলের ইয়া ঢাউস ওজনের কালো রঙের বিড়ালকে আদর করতে করতে বলল,জানি তবে অল্প।
– আমার উপস্থিতিতে তোমার কাজে ব্যাঘাত না ঘটলে কথা বলতে পারি?
– ও শিওর।
– তোমাকে এখানে প্রায় রাতে দেখি। আজ মনে হল কথা বলি,তুমি কেন রোজ দাঁড়িয়ে থাকো?
– দেখো আমি বিড়ালদের ভালবাসি।তাদের খাবার, ঔষুধ দেই। এখানে শুধু না, আরো ৪টি স্থানে ওরা আমার জন্য অপেক্ষা করে।
– কি বলো, এ বয়সে রাত জেগে তুমি এদের জন্য ছুটে আসো? কিছু মনে না করলে জানতে কি পারি, তুমি এসব কি স্বেচ্ছায় করো নাকি কোন ভলান্টিয়ারি অরগানাইজেশন তোমাকে সাহায্য করে?

গেটের নীচে রাখা ওয়ানটাইম প্লেটে খাবার খাচ্ছে বিড়াল

– আমি নিজ থেকেই করি।কারো সাহায্য ছাড়াই। আমার গাড়ির ব্যাকবুটে বিড়ালের খাবার,ঔষুধ সবই আছে।আর হ্যা আমাদের একটা সংগঠন আছে যারা ক্যাটস লাভার, তারাই মেম্বার। সবাই নিজ উদ্যোগে এসব কাজ করি।বাই দ্যা ওয়ে, তোমার নাম জানা হলো না,কোথা থেকে এসেছো?
আমার নাম বলি। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে সত্তুরোর্দ্ধ বয়স্ক মহিলা বিস্মিতকন্ঠে জিগেস করে, তোমার দেশে কি বিড়ালদের খাবার দেয়ার সংগঠন আছে? পেট ক্যাটস ছাড়া ফ্লোটিং ক্যাটসদের খাবার দেয়ার জন্য কোন উদ্যোগ আছে?
এর উত্তর আমার জানা নেই, তাই চুপ মেরে থাকায় বৃদ্ধা কথা বলতে শুরু করে।
– আমি এমা। এ বয়সেও বিড়ালদের জন্য মাঝে মাঝে ফান্ড রাইজিং ম্যারাথন বা চ্যারিটি প্রোগ্রামে যাই।এ দেখো ছবি। বৃদ্ধা এমা তার হাতঘড়িতে মিনি ট্যাবে ম্যারাথনে অংশ নেয়া, খাবার দেয়ার ছবি দেখায়। আমি মুগ্ধ হয়ে সেইসব ছবি দেখি। আহা কি পশুপ্রেম! অথচ আমরা? বিড়াল দেখলে,রাস্তাঘাটে কুকুর দেখলে দুর দুর করে তাড়াই!
বলতে পারিনি, যে দেশে অসংখ্য মানুষ বেচে থাকে অর্ধাহারে , অনাহারে , সেখানে আবার কিসের পশুপ্রেম!

ছবি: লেখক