বুকের ভেতর অবাক বর্ষাকাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

দুই.

নদী খুব আপন স্বজন হয়ে ছেয়ে আছে এইখানে। পদ্মা, ধলেশ্বরী, ইছামতি কত নদী। নদীর খাল, খাল থেকে জোলা আর বিলের থৈ থৈ জল। এই জনপদের মানুষের বুকে নদী, মনে নদী। নদী আর পানিকে ঘিরেই মানুষের নিত্যবসবাস।

গ্রাম থেকে একটু দূরে জলের উচ্ছাস পদ্মা। সেই পদ্মার গতরভরা ইলশামাছ। বাইষ্যাকালে গ্রামের বড়োরা দলবেধে নদীতে যায়। রাত জেগে ইলশা মাছ ধরে। ভোরের আলো ফোটার আগে  নাও ভরে ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফেরে। তারপর সকাল থেকে রাত বাতাসে কেবল ইলশা মাছের ঘ্রাণ। নদীর বুকভরা মাছ। সবচেয়ে বেশি ইলিশ। এই জনপদের মানুষ ইলিশকে আদর করে ইলশা মাছ বলে। পদ্মার নাম এলেই ইলিশের নাম। ইলিশ ছাড়াও পদ্মার সঙ্গে মানুষের আরো কত প্রেম। এই নদী নৌকায়, লঞ্চে করে প্রিয়জনকে নিয়ে যায় দূরে দূরে। নদীতে ভেসেই আবার স্বজনরা আসে বুকের কিনারায়। নদী যেন ফুঁসে না ওঠে। নদী যেন পাড় ভেঙে নিশ্চিহ্ন না করে দেয় গ্রামের পর গ্রাম; মানুষের বসতি, তাই নদীর জলে থাকা খোয়াজ খিজিরের নামে শিন্নি দেয় মানুষ। স্বজনরা যেন জলে স্থলে নিরাপদ থাকে তাই ভোগ দেয় মানুষ।  ভোরে, ঘরের গাইয়ের দুধ দিয়ে ঘন করে পায়েশ রান্না করে তা হাঁটুজলে নেমে মন্ত্র পড়ে; দোয়া পড়ে ঢেলে দেয় মানুষ। নদী আর মানুষের এমন জীবন, এমন বন্ধুত্ব নিয়ে লেখা হয় হাজারো কবিতা, কত কত গল্প।

আর, বিক্রমপুরের বাইষ্যাকাল মানেই ঘরে ঘরে গল্প। গল্পের আসর। উন্নাকালে যে বউ গেছে বাপের দেশে, সে নাইয়োর শেষে ফিরে আসে নব বর্ষার জলে ভেসে ভেসে। তার সঙ্গে ভেসে আসে কত-শত গল্প। আষাঢ়ের শুরুতে আকাশ ভেঙে বৃষ্টিনামার দিনে তিরতির করে পানি ঢুকে গ্রামে। পুবের জালালপুর বিল, পশ্চিম দক্ষিণের পদ্মা থেকে পানি আসে। আষাঢ় শেষে শ্রাবণ। পানি ভাসিয়ে দেয় খেলার মাঠ, ফসলের ক্ষেত। বাড়ির উঠান ছুঁই ছুঁই করে জলের সাম্রাজ্য। গ্রামের সবচেয়ে বয়সী মানুষ  গোলবর খাঁ লাঠি ভর দিয়ে ঘরের বাইরে আসেন। মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে যতটা বড় করা যায় চোখ বড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করেন, পানি কি এইবার সব তলাইয়া দিবো? তাইলে তো মানুষের বিপদ অইবো; বড় বিপদ।
বর্ষায় পানি যেমন নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে  এ অঞ্চলে। আবার বিপদ আপদও কম নিয়ে আসে না। প্রায় ছয়মাস পানিতে তলিয়ে যায় পুরো জনপদ। তখন মানুষের জীবন-জীবিকা হয়ে পড়ে সীমিত। সন্ধ্যানামার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। যাদের নিজেদের নৌকা নেই তারা হাটবাজারে যেতে নির্ভর করে অন্যের ওপর। ফসলের ক্ষেত ডুবে আছে তাই কাজ নেই। একধরনের স্থবিরতা নেমে আসে পুরো জনপদে।
তবে, এই থেমে যাওয়া সময়কে একটুখানি গতি দিতে আয়োজনের শেষ থাকে না। জলের ওপর নৌকা নিয়ে মাছ ধরা তখন হয়ে পড়ে নিত্য কাজ। আর একটু দূরে পদ্মায় ইলিশ মাছ ধরার ঘুম পড়ে তখন।  এই গ্রামে, ওই গ্রামে লেগে থাকে নৌকাবাইচ।
আর গ্রামে গ্রামে, তরুণরা মেতে উঠে নাটকের মহড়ায়। পানি নেমে যাবে, একদিন জেগে উঠবে পুরো গ্রাম। হেমন্তের ধানে ধানে মেতে উঠবে বাতাস। তারপর নামবে শীত। সেই শীতে মাঠে মাঠে মঞ্চ পেতে হবে নাটক, পালাগান। তারই মহড়া হয় বাইষ্যাকালে।

এসব, আমাদের বিক্রমপুরের নিকট অতীতের কথা, দেখা দৃশ্য। এখন হয়তো বদলে গেছে সব। এখন হয়তো সবকুল ছাপিয়ে ‘বাইষ্যাকাল’ আসে না বিক্রমপুরে। তারপরও বুকের তলে রয়ে গেছে অবাক বর্ষাকাল।

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]