বুলবুল ভাইয়ের কাছে দু’টো টাকা পাওনা ছিলো

মামুন রিয়াজি

(ক্যালিফোর্নিয়া থেকে) ‘দুটো টাকা এখনো পাওনা ছিলো আমার বুলবুল ভাইয়ের কাছে’। ৮০এর দশকের কথা তখন আমি ছাত্র সেই সময় আমি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলাম ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, সঙ্গে সঙ্গে অফার পেলাম চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য। আমার প্রথম অভিনীত ছবি ‘মেঘ বিজলী বাদল’ আর সেখানেই ছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয় বুলবুল ভাই। সেই ছবিটিতেই তিনি প্রথম সংগীত পরিচালক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। দেখা হতো কখনো কখনো বিটিভির ক্যান্টিনে, কখনো এডিটিং রুমে এফডিসিতে ,কথা হতো মজার মজার। বুলবুল ভাই অত্যন্ত অমায়িক ভদ্র রুচিসম্মত একজন ব্যক্তি ছিলেন ।একদিন বিটিভির অনুষ্ঠান শেষ করেই আমি বাইরে এসে দাড়িয়েছিলাম নিউমার্কেটের কাছে হোস্টেলে আসবো বলে। ছাত্র অবস্থায় পকেটের অর্থনৈতিক অবস্থাটা তেমন শক্তিশালী ছিলো না। ছবি বিক্রি হতো আর বিটিভির অভিনয়ের টাকা দিয়ে মাস পার করে দিতাম। পকেট অতটা জোর ছিলো না । তারিখ ,মাস এগুলো মনে নেই ,তবে একদিন বিটিভির গেটের সামনে রিকশার নেওয়ার জন্য। রিকশা ডাকলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি বুলবুল ভাই দাঁড়িয়ে, আমি রিকশাওয়ালা কে জিজ্ঞেস করলাম এই নিউমার্কেট যেতে কত নেবে ? রিক্সাওয়ালা তিনি বললেন ১০ টাকা। আমি আবার রিক্সাওয়ালার সঙ্গে একটু পীড়াপীড়ি করলাম যদি একটু কমে যাওয়া যায় । ছাত্র মানুষ দু-এক টাকা বাঁচালে অনেক টাকা। আমি  রিক্সাওয়ালাকে বললাম এ ভাই ৭ টাকায় যাবা? রিক্সাওয়ালা মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালেন। আমার বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি বুলবুলও ভাই দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং এমনই একটা সুযোগ খুঁজছিলেন কেউ যদি তার সঙ্গে সহযোগী হিসাবে তার গন্তব্য স্থানে যেতে পারে।
তিনি আমার কাছে এসে ঘাড়ের উপরে হাত রেখে বললেন চলো, ‘আমি তোমার সঙ্গে শেয়ার করবো আমিও নিউ মার্কেটে যাবো, আমি আজিমপুরের ওখানেই থাকি’। ভাগ্য খুলে গেল দু’জনার সঙ্গে সঙ্গে। রিকশাতে উঠে দু’জনার গল্প শুরু হয়ে গেল মেঘ বিজলী বাদল নিয়ে গল্প হলো, আবার যদি কিছু মনে না করেন অনুষ্ঠানের গল্পও শুরু হলো। আমাকে বলছিলেন যে, ‘মামুন অনেক প্রতিভাবান শিল্পী তুমি। অভিনয় করো মানুষকে জমিয়ে রাখতে পারো।আবার সুন্দর ছবি আঁকো।’ আমি বললাম, ‘আপনিও তো অনেক উচ্চতার একজন সঙ্গীত পরিচালক আপনার গান আমি মেঘ বিজলী বাদল রেকর্ডিং শুনেছি অপূর্ব কম্পোজিশন আপনি করেছেন।’ উনি খুশি হলেন আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিলেন। ওনার হাসিটা ছিলো অত্যন্ত মিষ্টি ধরনের , বুলবুল ভাইয়ের হাসিতে চোখ দু’টো যেন কথা বলতো আর ছিলো মার্জিত ভাবে কথা বলার ভঙ্গি ছিলো। অনেক সুন্দর কথা বলতে বলতে একসময় বলাকা সিনেমা হলের পাশে পৌছালাম তারপরে বুলবুল ভাই আমাকে বললেন, ‘তুমি কোথায় নামবে?’ আমার হোস্টেলে শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসে । রিক্সাটি নিউ মার্কেট গেটের সামনে থামিয়ে আমি রিকশাওয়ালাকে সম্পূর্ণ দশটাকা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম ,কিন্তু দুই পকেট হাত দিয়ে দেখি আমার কাছে শুধু মাত্র সাতটি টাকা রয়েছে , বুলবুল ভাই বুঝতে পেরেছেন যে আমার কাছে এর বেশি টাকা নেই,বুলবুল ভাই বললেন, ‘আমি বুঝতে পেরেছি বাকি তিনটা টাকা আমি দিচ্ছি।’ উনি তিন টাকা দিলেন আর আমার সাত টাকা মিলে ১০ টাকা হলো। রিকশাওয়ালাকে বিদায় দিলাম। তারপর দু’জন দু’জনের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। উনি যাওয়ার সময় আমাকে বললেন, ‘মামুন আই ও ইউ টু টাকা।’ আমি হেসে বললাম, ‘যে ঠিক আছে আপনি একটা চেক লিখে পাঠিয়ে দিয়েন।’ ওটাই ছিলো উনার সঙ্গে আমার শেষ কথা। দেশ ছেড়ে চলে এলাম আমেরিকাতে ৩০ টি বছর হয়ে গেলো হঠাৎ দু’বছর আগে ডক্টর রুবি আপা আমাকে জানালেন উনার লেখা গান কম্পোজ করে  অ্যালবাম করছেন আর তার সুরকার হচ্ছেন বুলবুল ভাই। আমি খুব খুশি হয়ে বললাম বুলবুল ভাইয়ের নাম্বারটি আমাকে দেবেন রুবি আপা ? সঙ্গে সঙ্গে উনার নম্বরটি দিলেন। আমি ক্যালিফোনিয়া থেকে কল দিলাম তার পরের দিন। বুলবুল ভাই কে বললাম যে, বুলবুল ভাই ৩০ বছর হয়ে গেছে আপনার কি মনে আছে ‘সেই মেঘ বিজলী বাদল’ এর কথা?’ ‘হ্যাঁ আপনি কে বলছেন ?’ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। তারপর আমি আবারো বললাম, ‘আপনার কি মনে আছে আপনার কাছে আমার পাওনা দুটো টাকা এখনো আমাকে দেননি? ? তিনি আবার বললেন, ‘আপনি কে বলছেন?’ আমি যখন নামটি বললাম তখন উনি হঠাৎ করে কি না পেয়ে বসলেন বললেন, ও মামুন আমাদের টেলিভিশনের শিল্পী মামুন?’ আমি বললাম হ্যাঁ।এবার বললেন, ‘বলো ভাই কেমন আছো ? কোথায় আছো ?কি করছো ?অনেকদিন হয়ে গেলো তোমাকে তো দেখি না?’ আমি বললাম, ‘বুলবুল ভাই আমি তো ৩০ বছর বিদেশে থাকি। সুদূর আমেরিকাতে।’ বললাম, ‘আপনার তো সম্মান বাংলাদেশের এখন অনেক উপরে । কখনো কি আমেরিকাতে এসেছেন?’ তিনি বললেন, ‘না কখনো যাইনি।’ বললাম , ‘আমার প্রদর্শনীতে আপনাকে বিশেষ অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ করবো এবং টিকিট পাঠিয়ে দেব আপনি কি আসবেন?’ বুলবুল ভাই একটু মৃদু হেসে বললেন, ‘ওরে বাবা আমি কি অত উপরের সম্মান পাবার মানুষ নাকি ?’ আমি বললাম’ হ্যাঁ বুলবুল ভাই সংগীত জগতের আপনি এখনকার সময়ের অনেক অনেক উপরের একজন সংগীত পরিচালক।’বললেন, ‘ঠিক আছে দেশে এলে দেখা করো’। বললাম, ‘বুলবুল ভাই আপনার কি মনে আছে একদিন রিক্সায় চড়ে আমি আর আপনি একসঙ্গে আজিমপুর গিয়েছিলাম ?’ বুলবুল ভাই বললেন, ‘মামুন সেতো অনেক আগের কথা।’ তারপর বললাম, ‘আপনার কি মনে আছে দু’টো টাকা আপনি আমাকে বাকি রেখেছিলেন বলেছিলেন চেক লিখে দেবেন।’ তখন উনি হেসে উঠে বললেন, অতটা মনে না থাকলেও মনে আছে আমি তোমার সঙ্গে রিকশায় গিয়েছিলাম।’ আমি আবার বললাম, ‘বুলবুল ভাই আমি কষ্টে আছি আমেরিকাতে। আমার সেই যে দু’টো টাকা- আপনি পাঠিয়ে দিলে খুশি হবো।’ বুলবুল ভাই হেসে উঠলেন সুন্দর ভাবে বললেন, ‘আমেরিকায় যারা থাকে তারা কি আমাদের মত দেশে কষ্টে থাকে তবে আমি খুব খুশি হলাম মামুন তুমি বিদেশে চলে গেছো। আমি অনেকদিন খুঁজেছি যে মামুন রিয়াজী গেলো কোথায় ? খুশি হলাম তোমার ফোন পেয়ে দেশে এলে দেখা করো আমি হয়তো বাসা বদলিয়ে অন্য কোথাও নতুন ঠিকানায় যাবো তবে কাউকে জিজ্ঞেস করো আমাদের সঙ্গীত জগতে তারা তোমাকে আমার ঠিকানাটা দেখিয়ে দেবে।’ অনেক বছর পরে দেশে ফিরে এলাম হঠাৎ করে দেখলাম আপনি বাসা বদলিয়েছেন চিরদিনের জন্য বাসা থেকে চলে গেছেন। আমি এখনও জানি না আপনি কোথায় আছেন তবে আমি কিন্তু ওই দু’টো টাকার জন্য  আপনাকে খুঁজতে যাব জান্নাতুল ফেরদৌস ।আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে ওই জান্নাতুল ফেরদৌসে আপনার সু-কন্ঠে মাধুর্য নিয়ে কম্পিত হবে আল্লাহর সুসজ্জিত দরবার কম্পিত হবে সূরা আর রহমান, সূরা ইয়াসিন, সূরা বাকারাতে। আজ মহা পবিত্র জুম্মা শুক্রবার ফজরের নামাজে হাত তুলে দোয়া করেছি ও আল্লাহ বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে যেন আমার জান্নাতুল ফেরদৌস এ আবার দেখা হয়। আমিন।

ছবি: গুগল