বৃক্ষের ঢাকা, ঢাকার বৃক্ষ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

এমন কিছু নয় -সাধারন একটি তালগাছ। দাঁডিয়ে আছে সোজা হয়ে রবি ঠাকুরকে প্রমান করে – ‘তালগাছ, এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে’। কত বছর ধরে দেখছি গাছটিকে – পঞ্চাশ বছর ধরে। কত ছোট ছিলো গাছটি তখন – এখনকার যাদুঘরের সামনে।

তখন গাছটির চারপাশে এতো কিছু ছিলো না, সুতরাং ছোট গাছটিকেও চোখে পড়তো – হাজার হলেও তালগাছ তো। ‘মৌলিতে’ যেতে চোখে পড়তো, বেতার ভবন থেকে ফিরতে ফিরতে তাকাতাম, শাহবাগের সামনের ফোয়ারার জলের ভেতর দিয়ে গাছটির আন্দোলিত পাতার থরথর দেখতে পেতাম – যেন দয়িতার জন্য আকুলি-বিকুলি।

এখন যখন ঢাকায় যাই, তখন গাছটিকে খুঁজতে হয় – যদিও এতদিনে সে আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়েছে। কারন তার আশে পাশে এত কিছু হয়েছে যে তারা যেন তালগাছটিকে ঢেকে দিয়েছে। এবারো যখন ঢাকায় গিয়েছি, তখনও বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার পথে ওই মোড়ে এসে গাড়ীর কাঁচ দিয়ে তৃষিত চোখ উর্ধমুখী করেছি গাছের পাতা পর্যন্ত দৃষ্টি ছড়িয়ে দিতে। কি আশ্চর্য্য! এবারে ফলভারে যেন গর্বিত তালগাছটি। ভারী ভালো লাগলো।

তালগাছটি যাদুঘরেরে সীমানার বাইরে পায়ে চলা পথের ওপরে। আর সীমানার ভেতরে আছে একটি শিমুল গাছ। বয়সে সে কি তালগাছটির বয়োকনিষ্ঠ? হবে হয়তো। ঠিক মনে নেই। তবে শিমুল গাছটিকেও দেখছি বহুদিন ধরে। বহু চৈত্রের দুপুরে চোখ গেছে লাল লাল ফুলে ঢেকে যাওয়া শিমুল গাছটিতে। পত্রবিহীন কন্টকসমৃদ্ধ বৃক্ষটি যেন ফুলসজ্জায় সেজে উঠতো। গাছটির তলা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কতদিন তুলে নিয়েছি ভারী শিমুল ফুল। অভিজাত পুষ্প নয়, কিন্ত ভালোবাসতাম খুব। স্বল্পনামা এবং অনামা পুষ্পদের প্রতি আমার মমতা চিরদিনের।

লালের কথায় আরো তিনটে বৃক্ষের কথা মনে পড়ে। একটি ছিলো তেজগাঁ পুরোনো বিমান বন্দরের উল্টোদিকে রাস্তার ওপাড়ে একটি পলাশ গাছ। আশির দশকেও দেখেছি গাছটিকে – আমার আরেক বন্ধু। ফাল্গুনে আনত হয়ে যেতো পাতাবিহীন গাছটি রক্তিম ফুলভারে। কেন যেন গল্প-উপন্যাসে পড়া সাঁওতালী মেয়েদের কথা মনে হতো – তাদের খোঁপায় গোঁজা পলাশ ফুলের কথা মনে হতো।

প্রায় প্রতিদিনোর দেখা আর একটি লালফুলের গাছের কথা জেনেছিলাম নাসিম আরা মিনুর লেখা পড়ে। কলাভবনের কোনায় মধুদা’র ক্যান্টিনের দিকে – অধ্যাপক বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীরের সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্রের জানালার বাইরে ঝিরিঝিরি পাতার গাছটি। পাশের হাঁটু ভাঙ্গা দ’য়ের গাছটি চিনতাম – সাদা কাঠগোলাপের গাছ। সংবাদে মিনু আপার লেখার কল্যানে জানা গেলো, ওইটি অশোক গাছ। সেবারই প্রথম অশোক ফুলের গুচ্ছ দেখেছিলাম সচেতন ভাবে।

তৃতীয় ছোট ছোট লাল ফুলের গাছটি ছিলো পুরোনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের দপ্তর আর বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারেরে মাঝামাঝি জায়গায় পথের পাশে মোটা ভেলভেটের পাতার গাছটিতে আগুন রঙ্গের আইরিশ পপির মতো ফুল ফুটতো ওই বসন্তেই। গাছটি আর নেই এবং ফুলটির নামও জানা হয়নি। এক জীবনে সব কি জানা যায়, না জানতে আছে?

ঢাকা শহরের আরো কতগুলো গাছের কথা স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। যাদুঘরের ভবনের পাশে ছোট্ট পুকুরটির পাড়ে একটি চালতা গাছ ছিলো। ওই গাছটির তেল চকচকে পাতাগুলো আমাদের বরিশালের বাড়ীর পেছনের বিশাল চালতা গাছটির কথা মনে করিয়ে দিতো।

এখনও চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সলিমুল্লাহ ছাত্রাবাসের সামনের রাস্তা-ছাওয়া শিরীষ গাছ, বর্তমান উদয়ন বিদ্যালয় ভবনের পাশে বিশাল তেঁতুল গাছটি, স্যাভেজ রোডের মেহগিনি বৃক্ষের সারি, মেডিকেল কলেজের সামনের উর্ধমুখী তেলসুর গাছগুলো, ফুলার রোড আর রোকেয়া হলের সামনে জারুল গাছের সারি আর সেগুলোর বেগুনী আর হলুদ ফুলগুলো। কলাভবনের সামনের বটগাছটির রোপনও তো প্রত্যক্ষ করেছি ১৯৭২ এ।

এখন ঢাকায় গেলে দেখতে পাই, সব অদ্ভুত অদ্ভুত গাছ আরও অদ্ভুতর ভাবে রোপিত, পরিচর্যিত ও বর্ধিত হচ্ছে। আমাদের সবার মনে রাখা দরকার – সব বৃক্ষ ঢাকা শহরের সঙ্গে যায় না এবং ঢাকা শহরও সব বৃক্ষের জন্য নয়। ঢাকা শহরের একটি মন আছে এবং সে মন সব গাছকে গ্রহন করে না। শহর ঢাকা উল্টোপাল্টা বর্হিঃসৌন্দর্য বর্ধনে আগ্রহী নয়, সে তার মনের সৌন্দর্য বাড়াতে চায়। আমার যাতে শহরটির আত্মাটিকে হনন না করি।

ছবি: গুগল

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]