বৃষ্টিকাল কবে আসবে নন্দিনী

রৌদ্রলাঞ্ছিত আকাশ ফুটে আছে তৃষ্ণার্ত চিলের ডাকনাম হয়ে। মেঘ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে কোথাও? তাপের পাত্র নিঃস্বার্থের মতো ঢেলে দিচ্ছে শেষ সঞ্চয়। বর্ষাকাল এখন খাতাকলমে। হয়তো কারো কদমফুলের স্বপ্নে জীবন্ত। কল্পনায় রিনিঝিনি বৃষ্টিমুখর কোনো দিনে অথবা মাথা চুলকানো কোনো আবহাওয়াবিদের বিব্রত ভবিষ্যতবাণীর কাটাকুটিতে বর্ষাকাল স্ক্রিনশট হয়ে ঝুলছে।     

কদমফুল জাগিয়ে দিতে কবে ফিরবে বর্ষাকাল? বিভূতিভূষণের গল্পের মতোন বৃষ্টি নামবে কবে উন্মুখ গাছেদের শরীরে, পিঁপড়ার বাড়িতে? কবে বৃষ্টি নামবে ধানক্ষেতের বিস্তারে, লঞ্চঘাটে করুণ চায়ের দোকানের তোবড়ানো চালে? ঝরে পড়বে রিকশার টুংটাং বেলের উপর। দাঁত বের করে পড়ে থাকা শহরের ক্লান্ত জেব্রাক্রেসিংয়ে, ঘর্মাক্ত পুলিশের শার্টে কবে নামবে বৃষ্টি? কবে নন্দিনী  ছাতা মাথায় বৃষ্টিমুখর কোনো ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খুঁজবে কাউকে? তার চশমার কাচে ভেসে যাবে বৃষ্টি ছড়ানো কোনো বর্ষাক্লান্ত বিকেলের স্মৃতি?

আবহাওয়া অফিসের করিডোরের দেয়াল জেনেছে আরবসাগরের অজানা ভূগোলে জমা হয়েছে নিম্নচাপ। সুদূর থেকে উড়ে আসেছে ঘূর্ণিঝড় ‘বায়ু’। এই বায়ুর প্রভাব না কাটলে মৌসুমী বায়ূ সচল হবে না। আর তাতেই তালা পড়েছে বর্ষার 

বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতায় বর্ষা সগর্বে তার হাজিরা জানান দিচ্ছে। কিন্তু বারিধারা অনুপস্থিত। ওষ্ঠাগত মানুষের প্রাণ। অপেক্ষায় নন্দিনীও। রোলকলের খাতায় অনুপস্থিত বৃষ্টিকাল নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘বৃষ্টিকাল কবে আসবে নন্দিনী’।

মেঘমল্লার শব্দটা উচ্চারণ করলে শুধু একটা রাগের কথা মনে পড়ে না। বাতাসে যেন উড়ে আসে একটা ঋতু। আসে ঘনিয়ে আসা মেঘ আর বৃষ্টি। ভৈরবী কি শুধুই উদাস ভোর? দরবারি কানাড়া রাজার অশ্রুপাত?
মেঘমল্লার যেন আর একটু এগিয়ে, কারণ এটি প্রায় এক স্বয়ংসম্পূর্ণ কবিতার মতো, ধ্বনি ও অক্ষরের গড়নে, যাতে মেঘগর্জন, বারিধারা, বিজলিচমক, রুপালি আঁধার, বিরহ, হয়তো আনন্দ, এবং প্রেম ছেয়ে আছে। এই অনুভূতিগুলো জড়িয়ে আছে আমাদের বর্ষাকালের সঙ্গে। এই ঝড় আর বন্যার দেশে মেঘ ও বর্ষার জন্য কী প্রমত্ত উপাসনা আমাদের! পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে তাঁর ‘হিন্দুস্থানী সংগীত পদ্ধতি’র দ্বাদশ ও শেষ খণ্ডে নয় প্রকার মল্লারের স্বরলিপি ও গান রেখেছেন। সেখানে মেঘমল্লারের গানের সংখ্যা সর্বাধিক এগারো।রবীন্দ্রনাথ জীবনের প্রথম চল্লিশ বছরে ঋতুসংগীত রচনা করেছেন সংখ্যায় কম, কিন্তু তার মধ্যেও বেশিটাই বর্ষা নিয়ে আর তার সবই মল্লারের ঘরের। পরের চল্লিশ বছরে ঋতুসংগীত লিখলেন অনেক এবং সেখানেও বর্ষার গানের প্রাধান্য, প্রয়োজনে নিজের মতো করে নিলেন মল্লারকে, যেমন রবিমল্লার, এবং এক সময় ইমন, ইমনকল্যাণ, সিন্ধু, সিন্ধুকাফি, ভূপালি, বেহাগ, ভৈরবীও জুড়ে গেল বর্ষায়। বর্ষা ছাড়া বাঙালির জীবন অসম্পূর্ণ।হয়তো নন্দিনীরও।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছে বৃষ্টিহীন এখন প্যারিসের আকাশও। তীব্র উত্তাপে আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা বেড়ে গেছে প্রায় ৬ ইঞ্চি। ৩২৪ মিটার উচ্চতার এই টাওয়ারের লোহালক্কড় গরমে সম্প্রসারিত হয়ে আরো ৬ ইঞ্চি বেড়ে গেছে। বৃষ্টি নামলে আবার স্বাভাবিক হবে তার উচ্চতা। তপ্ত প্যারিস শহরেও কি কেউ লং প্লেইংয়ে বাজাচ্ছে এখন মেঘমল্লার? বৃষ্টির স্মৃতি চোখে নিয়ে অপেক্ষায় অন্য কোনো নন্দিনী? কে জানে?

কবি আবুল হাসান তাঁর কবিতায় লিখেছেন,

‘ বৃষ্টির ফোঁটাকে মনে হয় তোমার পায়ের পাতার শব্দ

আকাশের ভ্রু চমকে জল নামেঃ জল আয়ুস্মতী।’

আকাশের ভ্রু চমকে জল নামে! এতো বজ্রপাত আর বৃষ্টির গল্প। আকাশের ভ্রু তো চমকায় বজ্রপাতের সময়। আর এমন বৃষ্টি তো বর্ষাকালেই মানায়।আর সেই বর্ষাতেই তো কিবি কালিদাসের কাল থেকে হেঁটে আসছে প্রণয়িনী।

কবিদের কল্পনায় বাংলা কবিতায় এই বর্ষা বন্দনার নজির তো আজকের নয়। রবীন্দ্রনাথ তো ‘ বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ’-এর মতো একটা লাইন লিখে বাজিয়ে দিয়েছেন বর্ষাকে অন্য তন্ত্রীতে। ওই বৃষ্টি পতনের ছন্দ আমাদের মনকে নিয়ে যায় দূর কোনো এক নির্জনতায়। সেখানে মাঠের পর মাঠ জুড়ে বৃষ্টি নেমেছে, আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে আছে ধূসর মেঘের প্রেমে।ক্লান্ত ঘুঘু ডেকে যাচ্ছে কোনো আড়াল থেকে, হাওয়ার বেগে দুলছে সুপারি গাছের মাথাগুলো। আকাশ থেকে উড়ে আসা বৃষ্টি সাদা চাদর বিছিয়ে রেখেছে জলের উপর, অলস দিগন্তজুড়ে ঝুলে আছে বৃষ্টির পর্দা।বর্ষার সঙ্গে কত কী জড়িয়ে থাকে আমাদের! ইলিশমাছ, গরম চা, মুড়ি, বাইরের বারান্দা থেকে ভেসে আসা হুকার তামাকের কটু ঘ্রাণ, বাগানে সাদা জবাফুলের গাছ, ঘরের কোণে আলস্যে জাল বুনতে ভুলে যাওয়া মাকড়সা, শহরের ভেজা গলিতে কিশোরবেলা ভারী হয়ে যাওয়া ফুটবল, কোনোদিন স্কুলে রেইনি ডে-এর দরখাস্ত লেখা, হারিয়ে যাওয়া ছাতা…আরো কত কী?

‘এলো বরষা যে সহসা মনে তার’…সতীনাথের গান কয়েক’শ বছর আগে বাজছে রেডিওতে। কার মনে সহসা বরষা নামে? নন্দিনী তখন কোথায়? শহরের পথে একমনে ভেসে যাওয়া পর্দাটানা রিকশার নিভৃতিতে নন্দিনীও কি তখন ভেসে যেতো সেই একশ বছর আগে? সব যেন রিপভ্যান উইংকেলের গল্প! ঘুম ভেঙে উঠে সব পাল্টে গেছে জাদুকরের ম্যাজিকের ছোঁয়ায়। সে জাদুকর বিরূপ প্রকৃতি, যে রুষ্ট হাতে পাল্টে দিয়েছে বাঙালির চিরচেনা বর্ষাকালকে। একদা বর্ষার আগমন মানে কদমফুল ফুটে ওঠা গাছ ঝাপিয়ে। বৃষ্টির দাপটে ঝরে পড়া কদমফুলের রেণু আলো করে রাখতো আমাদের শহুরে গলিপথগুলোকে।তখন দড়িতে চকচকে ইলিশ ঝুলিয়ে কেউ বাড়ি ফিরতো।ইলেকট্রিকের তারে বসে ভিজতো একলা কাক, বৃষ্টিক্লান্ত বিকেলে ছাতার তলায় চলতো বন্ধুর সঙ্গে চিনাবাদামের অন্তহীন ফুরফুরে আড্ডা। বারান্দায় এসে দাঁড়াতো কেউ।গামছায় মাথা মুছতে মুছতে কেউ বলতো-এত বৃষ্টি! আজ বাস চলেনি, ভিজেই ফিরলাম। চা হবে এক পেয়ালা?

দিনগুলো লিটমাস পেপারের মতো সব ভালোলাগা শুষে নিয়ে হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে হয়তো কোনো নন্দিনীর স্মৃতিও।

বর্ষা মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের অঞ্চলগুলোতে উদযাপিত একটি ঋতু। মৌসুমী বায়ুর প্রভাব সক্রিয় হলে এই ঋতুতে শুরু হয় প্রবল বৃষ্টিপাত। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী এটি হচ্ছে বাংলা বছরের দ্বিতীয় ঋতু, যেখানে আষাঢ় ও শ্রাবণ এই দুই মাস জুড়ে বর্ষাকাল ব্যাপৃত থাকে।বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘তালনবমী’ গল্পের শুরুতে লিখছেন, ‘ ঝমঝম বর্ষা। আজ দিন পনেরো ধরে বর্ষা নেমেচে, তার আর বিরাম নেই, বিশ্রামও নেই’। গ্রামীণ বর্ষার অদ্ভুত সুন্দর জলছবি বিভূতিভূষণের লেখায়। মাঠঘাট এক করে দেয়া সেই বর্ষার বৃষ্টিকে এখন হঠাৎ মনে হয় অতীতকালের গল্প। রৌদ্রে পুড়ছে গ্রাম, ধানক্ষেত, তৃষ্ণার্ত পাখির মতো শুকনো পুকুর হা করে আছে বৃষ্টির আশায়। বিরামহীন সেই বৃষ্টিরেখা হঠাৎ করেই শুকিয়ে যাচ্ছে যেন।

তবু বাঙালির জীবনে বর্ষা আসে উৎসবের মতো। বর্ষাকে আবাহন জানাতে কখনো গান হয়ে জেগে ওঠে নাগরিক ভোর। নন্দিনীর কথা ভাবতে ভাবতে আজো কেউ বাতাবিলেবুর গাছে সাইকেল হেলান দিয়ে চলে যায় কোন বিজন পথে। নন্দিনী বর্ষাকাল ভালোবাসতো, হয়তো আজো বাসে।নন্দিনীর চশমার কাচে সেই কবেকার বর্ষার বৃষ্টির ছাঁট লেগে আছে। কোথাও রেডিওতে গান বাজছে-আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন…। বৃষ্টিকাল কবে আসবে নন্দিনী?

ইরাজ আহমেদ
কৃতজ্ঞতাঃ প্রয়াত কবি ভাস্কর চক্রবর্তী
ছবিঃ গুগল