বৃষ্টিতে থাকলো নির্জন সাইকেল…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বৃষ্টি কখনো কখনো মনকে অদ্ভুত সব দৃশ্যের ভেতরে নিয়ে যায়। বৃষ্টি এলে একটা পুরনো বাইসাইকেল কেন জানি না মনের মধ্যে ফিরে আসে। দেখতে পাই, বেড়ার গায়ে হুড়মুড়িয়ে জেগে ওঠা একটা মাধবীলতার ঝাড়ের নিচে ঠেস দিয়ে রাখা সেই সাইকেল ভিজছে বৃষ্টিতে একা। হঠাৎ কোত্থেকে যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বের হয়ে আসেন। তারপর সাইকেলে চড়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চলে যান। কোথায় যান বিভূতিভূষণ? সে তো্ জানি না। কিন্তু দেখি দৃশ্যটা। কেন জানি না বৃষ্টি পতনের সঙ্গে মনের মধ্যে একটি উদ্বাস্তু বাইসাইকেল এসে জুড়ে যায়-রঙ চটা, সামনের চাকা সামান্য একটু বাঁকা, হয়তো দু’একটা স্পোক হারানো, নড়বড়ে সিটের একটা পুরনো সাইকেল। বুদ্ধদেব বসুর পুরানা পল্টনের স্মৃতি কাহিনিতে সাইকেলের কথা আছে। বিনয় মজুমদার লিখেছেন সেই অমোঘ লাইন-ফিরে এসো চাকা। এই চাকার সঙ্গে সাইকেলের চাকার কোনো যোগসূত্র নেই হয়তো, কিন্তু কোথায় যেন একটা যোগ আছে বলে মনে হয়। বৃষ্টি নামলে উদ্বাস্তু সাইকেল কোথায় যেন চলে যাবার কথা বলে। 

বাঙালির জীবনের সঙ্গে সাইকেল জড়িয়ে আছে। সাইকেল মাঠের পর মাঠ ভাঙে, শহরের পথ পার হয়। সাইকেলে চড়ে একদা ডাকপিওন আসতো ছাতা মাথায়। গভীর বর্ষায় কেউ সাইকেলের হ্যান্ডেলে ইলিশ মাছ ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতো, দুধওয়ালা একটা পাড়ায় পাড়ায় আসতো সাইকেলে চড়ে। বেশ রাতে গ্রামের পথে কাউকে দেখা যেত সাইকেলে হ্যারিকেন ঝুলিয়ে দূরের পথে যেতে।

বৃষ্টি নামলে কোত্থেকে যেন সাইকেলটা এসে হাজির হয়। দেখা যায় বিভূতিভূষণকেও। তাঁর উপন্যাসে, গল্পে বৃষ্টিমুখর দিনে গাঢ় প্রকৃতির সঙ্গে সাইকেল জড়িয়ে থাকে কখনো।আমাদের জীবনে ব্যস্ততার ধাক্কায় অপেক্ষাকৃত কম গতিশেীল এই বাহনটি একটু একটু করে পিছিয়ে পড়েছে। সেই সাইকেলকে নিয়ে এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘বৃষ্টিতে থাকলো নির্জন সাইকেল…’।

সাইকেল শুধু চলে যাবার কথা বলে না,বলে ফিরে আসার কথাও। একদা কতো মানুষ সাইকেলে চেপে অফিস থেকে বাড়ি ফিরতো। তাদের অনেকের ক্যারিয়ারে বাঁধা থাকতো খাবারের বাক্স। রেলস্টেশনে সব ট্রেনে যে যার গন্তব্যে চলে গেলে গভীর নিশিথে বাড়ি ফিরতো কোনো মফস্বল শহরের নির্জন স্টেশনমাস্টার আর তার অবধারিত সাইকেল। সে সব প্রত্যাবর্তনের গল্প কোথাও কেউ লিখে রেখেছে কি? কোনো কোনো শীতকালে গ্রামের লঞ্চঘাটের চায়ের দোকানে শেষ লঞ্চে বাড়ি ফেরা যাত্রীর জন্য রেখে যাওয়া সাইকেল শহরের গল্প শুনবে বলে বসে থাকতো। প্রাইমারি স্কুল, বিনুদের বাড়ি আর বারুইপাড়ার পানের বরজ পার হতে হতে গুনগুনিয়ে কত গান ভাসতো শীতের রাত্রির হাওয়ায়। সাইকেল আর তার আরোহীর বহু গল্প জমা হতো রাত্রির অনিশ্চিত অন্ধকারে।

বাইসাইকেল কখনো কাঁধেও চাপে। গ্রামে দূরের পথ সাইকেল পার হয়ে যায় কাঁধে চেপে। সে সাইকেল বিয়ের যৌতুক।বরযাত্রীদের কেউ নতুন সাইকেল কাঁধে তুলে বহন করে নিয়ে যায়। সাইকেল কখনো কাঁধে চড়ে বর্ষার দিনে টইটম্বুর খাল পার হওয়ার সময়। এসব দৃশ্য সিনেমার রীলের মতো একের পর এক মনের ভেতর থেকে উঠে আসে। মনে হয় চোখের সামনে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে কতকাল আগে দেখা দৃশ্যের। মনে হয় পুরনো হয়ে যায়নি কিছুই। অনুভূতির এক পৃথিবীতে নিখুঁত সাজানো আছে যেন একটা সময়ের ছবি।

সাইকেল কখনো নির্জন সাক্ষীও। বলিউডের শ্রী ৪২০ ছবিতে বৃষ্টিতে ভিজে রাজকাপুর আর নার্গিস যখন গান গাইছিলেন তখন এক সাইকেল আরোহীকে দেখা যায় তাদের পাশ দিয়ে হেসে চলে যেতে। সেই সাইকেল আরোহী বৃষ্টিভেজা ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে রয়ে গেলো গোটা জীবন। আবুল হাসান লিখেছেন তাঁর সাইকেল কবিতায়,

‘সাইকেল ছিলো মেঘমাখানো বিকেলে খালার পাহাড়ভূমির স্থলপদ্ম!

রাত্রিবেলা নারীশরীরের শৌখিন ঘর, আঙ্গিনাতে কাঠবাদাম’!

সাইকেল চক্কর খেতে থাকে কখনো একটি বাড়িকে ঘিরে। হয়তো কোনো গার্লস স্কুলের আশপাশের গলিতে। কির কির শব্দ তোলে সাইকেলের চাকা। তখন হয়তো আকাশে ছাইবর্ণ মেঘ বৃষ্টি নামাতে প্রস্তুত। হয়তো বৃষ্টি পড়ছে। ভিজছে কেউ, ভিজে পথ চলছে সাইকেল আর তার আরোহী কারো অপেক্ষায়। কেউ ছাতা মাথায় স্কুল ছুটির পর বের হয়ে এলো আর গোয়েন্দা শার্লক হোমসের মতো অনুসরণ শুরু করলো সাইকেল। ছাতার পাশ ঘেঁষে বৃষ্টির মতোই হাওয়ায় ভেসে যেতে যেতে ছাতার মালিকের হাতে গুঁজে দেয়া চিঠি কখনো কালীদাসের অপেক্ষাকেও হার মানিয়ে দিতো।

এখানে বলে রাখা ভালো, শার্লক হোমসের স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল নিজেও বাইসাইকেলে চেপে ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন।স্ত্রীকে নিয়ে লন্ডন শহরের রাস্তায় তাকে সাইকেল চালাতে দেখা যেতো কয়েক শতাব্দী আগে। দার্শনিক, প্রাবন্ধিক জাঁ পল সার্ত্রের কাছে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো ছিলো একঘেয়ে বিষয়। সাইকেলে ভ্রমণ তাকে বিপুল আনন্দ দিতো। যেমন তার সঙ্গিনী সিমন দ্য বোভায়ার নিজের লেখা চিঠিতে সাইকেল চালানোকে যৌন আনন্দের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

সাহিত্যে আর সিনেমায় বাইসাইকেলকে মূখ্য চরিত্র হয়ে উঠতে দেখা গেছে। ইতালীয় চলচ্চিত্রকার ভিত্তোরিয়া দে সিকার সেই বিখ্যাত ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ ছবিতে একটি সাইকেলই তো কেন্দ্রীয় চরিত্র। চুরি হওয়া সেই সাইকেল আর তার সঙ্গে জুড়ে থাকা অভাবী কয়েকজন মানুষের করুণ জীবনের কাহিনি আজও বেদনা আনে মনে।

বেড়ার গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা সাইকেলে চেপে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে বিভূতিভূষণ কোথায় চলে যান আমার মন সে উত্তর কোনোদিনই খুঁজে পায়নি। পাওয়ার কথাও নয়। কিন্তু সাইকেল কোথায় যেন এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের হাতে ধরে চলে আসে কাছে। ছাতা এক হাতে ধরে অন্য হাতে সাইকেলের ভারসাম্য বজায় রাখতে রাখতে গলি বেয়ে চলে যায় ডাকপিওন। তার চিঠির ব্যাগ ভিজে যায়। ইলিশ মাছ নিয়ে ক্ষান্তবর্ষণ বিকেলে যে এসে দাঁড়ায় গলিতে তার জামাও ভেজা। সাইকেল বৃষ্টি জমিয়ে রাখে না। গল্প জমানো থাকে। আরোহী পাল্টে যায়, পাল্টায় গল্পও। এই গভীর বর্ষায় যখন অবরুদ্ধ শহরের আকাশে মেঘ জমে, চারপাশ আচ্ছন্ন করে বৃষ্টি নামে তখন কখনো নির্জন সাইকেলের কথাও মনে পড়ে। রঙচটা, নড়বড়ে সাইকেল মনে পড়িয়ে দেয় অনেক কথা। সব বৃষ্টিতে একাকার হয় মাধবীলতার ঝাড়ের নিচে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল, মুনীর উদ্দিনের ফেইসবুক ওয়াল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box