বেঁচে থাকলে প্রিয়বিয়োগের বেদনা হবেই…

আব্দুন নূর তুষার

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ছাত্রলীগ মেডিকেল কলেজ শাখার নবীনবরণ। সোলস এসেছে, আইয়ুব বাচ্চু, নকিব খান, তপন চৌধুরী, নাসিম, রনি … সোলস , মাদার অব ব্যান্ডস ইন বাংলাদেশ। মঞ্চে আমাকে দেখে বাচ্চু ভাই বলেন, কি ডাক্তার। আমি তখন প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমাকে প্রথম ডাক্তার বলে ডেকেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। এরপর আর সেই ডাক কখনো বদলে যায় নাই।

বাচ্চু ভাইয়ের মায়ের অসুখ, ভাইয়ের অসুখ, ঔষধ খাওয়ানোর আগে বাচ্চু ভাই আমাকে ফোন করতেন।

শুভেচ্ছার ২য় অনুষ্ঠানটিতে গান গাইলেন বাচ্চু ভাই। সেই তুমি… প্রথম অনুষ্ঠানে মাইলসকে ডেকে আনায় তার অভিমান।

কি ডাক্তার? ভাইকে বাদ দিয়ে ম্যাগাজিন বানিয়ে ফেললেন? রসিকতা করে বললেন, আমরা চাটগাইয়া তো , ইংলিশ ভাল পারি না। বলে হা হা হা করে হাসলেন। এরপর শুভেচ্ছার প্রতিটি বিশেষ অনুষ্ঠান, ঈদ এবং প্রতি চারমাসে একবার বাচ্চু ভাই গান গাইতেন।

তার সোলো বের হলো, কষ্ট। ঈদের অনুষ্ঠান শুভেচ্ছার। তিনি গাইলেন। আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি।

উড়াল দেবো আকাশে, হাসতে দেখো গাইতে দেখো, সুখেরি পৃথিবী, নির্ঘুম রাত, ঘুম ভাঙ্গা শহরে, সাড়ে তিনহাত মাটি, কত যে গান। বিপাশার জন্য শচীনের গান ট্র্যাক করে দিলেন। শুভেচ্ছার ঈদ অনুষ্ঠান, আনন্দমেলার টাইটেল।

বাচ্চু ভাইয়ের এবি কিচেনের চটপটি আর ফুচকা, তার সঙ্গে বিকেলের আড্ডা। শুভেচ্ছা জোর করে বন্ধ করে দেয়ার পরে তার কষ্ট কে দেখে? আমাকে বললেন, আপনার জন্য বাচ্চু সারাজীবন থাকবে। সত্যি ছিলেন তিনি।

তার কালো লেভিন আর আমার পুরোনো স্টারলেট দিয়ে ঢাকা চিটাগাং হাইওয়েতে পাল্লা দেয়া। গাড়ী থেকে নুরজাহানে নেমে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, মেরেই তো ফেলতেন আমাকে আরেকটু হলে। চাটগাইয়া ভাষায় বললেন অনর বাংগা গারীর শিনার জোর আছে।

বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে একাধিকবার আমি মঞ্চে হাসতে দেখো গাইতে দেখো গেয়েছি। এটা গাওয়ার সময় তিনি, আমি দর্শকে আছি জানলেই মঞ্চে ডাকতেন।

একসাথে জাপান, ইটালী, দুবাই অনুষ্ঠান করতে গেছি। জাপানে এক গীটারের দোকানে ঢুকতেই দোকানী আমাদের পাত্তা না দিয়ে অন্য কাস্টমার এর সঙ্গে কথা বলছিল। বাচ্চু ভাই বিনয়ের সঙ্গে বললেন, মে আই প্লে দিস গীটার?

গীটারে বেজে উঠল জিমি হেনড্রিক্স, নফলার ব্রাদার্স আর সান্টানার সুর। তারপর গীটার আর থামে না। শেষে এরিক ক্ল্যাপটন। দোকানের বাইরে ভীড়। কয়েক’শ লোক। বাচ্চু ভাই বাজিয়ে দিলেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।

গীটারের দোকানী বাচ্চু ভাইকে জড়িয়ে ধরে আর ছাড়ে না। দোতলায় নিয়ে তার দোকানের সব গীটার তাকে মেলে ধরে বলে একটা নিয়ে যাও। যে দাম খুশী সে দাম দাও।

আমি খুশীতে চোখ ভিজিয়ে ফেলেছি। বিদেশে গেলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে সবখানে ঘুরতেন। বলতেন ডাক্তার সঙ্গে থাকলে আমি সেফ, বিপদ নাই।

তার মায়ের চিকিৎসাতে আমার খানিকটা ভুমিকা থাকাতে তিনি বারবার সেই কথা বলতেন। গেলাম ইটালী। সেখানে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ইটালিয়ান শ্বেতাকায়। সে কোনো কথা বোঝে না। সাউন্ড চেকে বাচ্চু ভাই গেয়ে ফেললেন পরপর, মানি ফর নাথিং, সালটান অব সুইং আর বিউটিফুল টুনাইট। তারপর সাউন্ড এর লোক আর তার পিছু ছাড়ে না। আমি হাসি। মাসুদ আর স্বপন ভাই হাসে আর বলে বস ইজ বস।

টুটুল এল আর বি ছেড়ে দেয়ায় খুব দু:খ পেয়েছিলেন। এরপর এল আর বি তে কেউ কীবোর্ড বাজায় নাই। তিনি বলতেন সে চলে গেছে যাক, তার জায়গা কাউকে দেব না। তাকে কয়েকজন গানের শিল্পী বারবার কষ্ট দিয়ে কথা বলেছেন। তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, কি করবো ডাক্তার। সব তো সন্তানের মতো। আমি বলেছিলাম, ধৈর্য ধরেন। তিনি অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। কিছুই বলেন নাই, ধৈর্য। ধরেছিলেন।

বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে মাদক বিরোধী কনসার্ট। ক্যানসার সোসাইটির কনসার্ট। বাংলাদেশের ক্রিকেট কনসার্ট। আর্মি স্টেডিয়াম আর ইনডোর স্টেডিয়ামে শুভেচ্ছার ঈদ অনুষ্ঠান। চট্টগ্রামে স্টেডিয়ামে সিনটিলার কনসার্ট। মেডিকেল কলেজের অ্যালামনাই ডে তে কনসার্ট।

বিরাট শব্দে স্পীকারে ডাক্তার শব্দটা শুনবোই।

একবার বাচ্চু ভাই ব্যাংকক এয়ারপোর্টে সবাইকে ফল কিনে খাওয়াচ্ছেন। কি ব্যাপার ভাইজান? বলেন

পকেটে এত গুলা টাকা, কোথায় খরচ করবো? এত টাকা কোথা থেকে এলো? তাই সবাইকে ফল খাওয়াচ্ছি।

একটু পরে এসে বলেন , ডাক্তার মা চলে যাওয়ার পর সব অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছি। সেজন্যই টাকা শেষ হচ্ছে না। কিছুদিন বাচ্চু ভাই সিগারেটও খান নাই।

বাচ্চু ভাই, আপনার প্রায় সব গান আমার মুখস্থ। আপনার গান, আজম খানের গান, মাকসুদ ভাই, মাইলস, ফীডব্যাক, সোলস আমার বড় হওয়ার সংগী । মন খারাপের সময় আমি আপনার গানটা গাই,

বহুদূর যেতে হবে
এখনো পথের অনেক রয়েছে বাকি
ভালোবাসার বিশ্বাস রেখো
হয়তো অচেনা মনে হতে পারে আমাকে

তুমি ভয় পেওনা
তুমি থেমে যেওনা

তুমি ভয় পেওনা।

বহুদুর যাত্রা করেছেন ভাই আমার।
ভয় পাবেন না।

এত কোটি মানুষকে জীবনে আনন্দ আর বেদনার সময় গান গেয়ে ভাল রেখেছেন।

তাদের দোয়া আপনাকে বহুদুরের সেই দেশে ভাল রাখবেই।

বেঁচে থাকলে প্রিয়বিয়োগের বেদনা হবেই।
আপনার না থাকার বেদনা বাকি সময় বহন করতেই হবে আমাকে।

আমি এখনো আপনার গান শুনছি

বহুদুর যেতে হবে।

ভালোবাসা।

ছবি: গুগল