বেলমন্ট লেক :পথে যেতে যেতে…

স্মৃতি সাহা

পথে যেতে যেতে কত গল্পই তো জমা হয়। আমারো জমেছে কিছু গল্প, যাবার পথে নুড়ি কুড়ানোর গল্প বা একটি নিস্তব্ধ দুপুরের গল্প। সেদিন ছিল সপ্তাহান্ত। নাগরিক সকাল ছুটি নিয়েছিল সেদিন। মেঘেরাও ঘুরতে গিয়েছিল পাহাড়ে। একচ্ছত্র নীল আকাশ মাথার উপর সামিয়ানা হয়ে ঝুলে ছিল। তাতানো রোদের দিন ঘর ছাড়ার অবিরত হাতছানি দেয় যখন, তখন তাকে উপেক্ষা করার সাধ্যি অন্তত আমার হয় না। উদ্দেশ্যহীন হয়ে পথে বের হই, পথিক হয়ে। যেতে যেতে শহর ছাড়িয়ে চলে যাই উপশহরের প্রান্তে। আটলান্টিকের তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এই নীরব জনপদটি; যার নাম নর্থ ব্যাবিলন, লং আইল্যান্ড। আমার পথ থমকে গেলো বেলমন্ট লেকের এই নিস্তব্ধ পাড়ে। নীরবতার আধ্যাত্মিক সুর ততক্ষণে মনের মধ্যে ঢেউ তুলেছে। লেকের পাড় ধরে কাশফুলের মতো বন্য গাছগুলো বাতাসে দুলে দুলে যে লয় তুলছিলো তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল গাছের পাতার তিরতিরানি সুর।  আমি যেন তখন পথ ভুলে পৌছে গেছি কোন যাদুর রাজ্যে। যেখানে কোন যাদুকর তার যাদুর ছড়ি ঘুড়িয়ে রাজপুত্রকে মৌন প্রকৃতি বানিয়ে দিয়েছে । আর ঝিরঝির বাতাস হয়ে গেছে কোন ঘুঁটে কুড়োনি, যে অবিরাম বাতাসের তানপুড়ায় সেধে চলেছে সপ্তক; রাজপুত্রর মৌনতা ভাঙতে। বাতাসের সেই সুর আমার সময় থমকে দিলেও চোখ মেলে দিয়ে রেখেছিলাম লেকের নীল জলরাশিতে। মনের অন্ত:পুরে ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল “সে নদীর জল, তোমার চোখের মতো ম্লান বেতফল”। আমার সামনের জলরাশি তখন আকাশের রঙ মেখে নীলোত্তম হয়ে উঠেছে। নীল জলাধার পেরিয়ে চোখ পড়লো ওপাড়ের সবুজ প্রাচীরে। আমি বহুদূরের কোন দ্বীপের বাসিনী হয়ে গেলাম যেন তৎক্ষণাৎ। সেই দূর্ভেদ্য সবুজের আড়ালে কোন অজানা কল্পরাজ্যের ছবি চোখের পাতায় এসে ভর করলো। আর ঠিক তখন ঝিরিঝিরি বাতাসের ফিসফিসানি যেন আরো বেগবান হয়ে উঠলো। জৈষ্ঠ্যের তপ্ত দুপুর ততক্ষণে ব্যসে ছোট হতে শুরু করেছে। সূর্য তখন মাঝ আকাশ ছেড়ে আস্তে আস্তে পশ্চিমে জায়গা করে নিয়েছে। আমি অদ্ভুত ভাবে আকাশের রঙ পালটে যাওয়া দেখলাম। আচ্ছা, আকাশ কি জীবনের গল্প চুরি করে এমন রঙ পালটায় নাকি জীবন ধার করে আকাশের গল্প! আমার ক্লোবাল্ট ব্লু আকাশ তখন গোধূলির সাজে সেজে ওঠার প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে। আকাশ সলজ্জ লাল পরিধানে যখন লাস্যময়ী হয়ে একটি দিনের সমাপ্তি গাঁথা শোনাতে যাবে তখন সেই ঝিরিঝিরি বাতাসের ফিসফিসানি যেন রুদ্র হয়ে ওঠে। গাছের পাতার লয়ে লয় মেলানো বন্য কাশফুলের সেই সুর যেন হঠাৎ করেই যেন লয়হীন হয়ে পড়ে। সারাদিন সপ্তক সেধে চলা সেই ঘুঁটে কুড়ানি তখন আশাহত আরেক টি দিন ব্যর্থ হবার ব্যথায়। রাজপুত্রের সেই মৌনব্রত আজও যে অটুট রইল! ও পাড়ের সবুজ প্রাচীরে বাতাস ধাক্কা খেয়ে ডমরু বাজিয়ে চলছিলো, তখন পথিককে ঘরে ফেরার তাগিদ দিয়ে আকাশে উড়ে যায় এক ঝাঁক বক পাখি। আকাশ তখন নিজের বুকে সূর্যকে লুকিয়ে এই যাদুর রাজ্যে আঁধার নামাতে বদ্ধ পরিকর। আকাশের বুকে সূর্যটাকে ডুবে যেতে দেখে কবির কথা মনে পড়ে ,” যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ, মরিবার হলো তার সাধ।” তবে আমি এমন নিঃস্তব্ধ দুপুর, বাতাসের তানপুরা, নীল জলরাশি আর সবুজ যাদুর রাজ্য পেলে বেঁচে থাকতে চাই অনন্তকাল; আমার প্রিয়তমা পৃথিবীর জন্য।

ছবিঃ গুগল