বোকামানবী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শাহিদা আরবী ছুটি

(ক্যানবেরা অস্ট্রেলিয়া থেকে): জন্মদিন শেষ। আসেন সবাই এবার উইশ করা বন্ধ করে দিয়ে বরং জন্মদিন নিয়ে একটা লেখা পড়ি।

কিছু কিছু মানুষ জন্মের পর থেকেই খুব সম্ভবত ইমোশনাল থাকে। আমি হলাম সেই শ্রেণীর মানুষ। আমি ছোটবেলা থেকেই অল্পতে রাগী , অল্পতে কাঁদি আবার অল্পতে ব্যাপক হাসি।

ইমোশনাল মানুষরা সব কিছুই সিরিয়াসলি নেয়। মজা কম বুঝে কিংবা প্রায় বুঝেই না। আমি হলাম সেই শ্রেণীর বোকা মানবী। তবে আমি ডার্ক কমেডি বুঝি। জীবনের কঠিন বিষয় আমি সহজ করে, মজার সঙ্গে বলে ফেলতে পারি। তেমন দুইটা কঠিন গল্প সহজ করে বলি ..

তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি। পারিবারিক একটা ঘটনার জের ধরে, আমি হারপিক খাই। খাবার আগে এবং পরে , আমি মরেই যেতে চেয়েছিলাম। হারপিক খেতে কেমন আমার জানা নাই। কারণ আত্মহত্যা চেষ্টার সেই আগ মুহূর্তে ডোপামিন মাত্রা বেড়ে আমার টেস্ট বাড সম্ভবত নষ্ট করে ফেলেছিলো। আর ইন্টারনাল ওয়াশ কি চিজ সেটা যাদের একবার হয় তারা জানে। সেই মেডিক্যাল প্রসেস এর পর আমার আসলে হারপিক খেতে কেমন লেগেছিলো সেটা যেমন মনে নাই তেমনি হারপিক খাবার যথাযথ কারণও মাথায় নেই।

ক্লাস এইট এ পড়ার সময় তিরিশটা ঘুমের ওষুধ খাই। সেটাও কোনো পারিবারিক ঝামেলা বা যন্ত্রনা থেকে । সেবারও বড় কোনো ঝামেলা ছাড়া বেঁচে যাই। তবে এইবার একটা ধাক্কা খাই। সেই ধাক্কাটা হলো, আমার আব্বু তখন ভয়াবহ অসুস্থ্য। মৃত্যুর দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার এই ঘটনায়, আব্বু আমার মাথার পাশে বসে কেঁদেছিলো অনেক্ষন। আর বার বার বলছিলো, ‘আমি তোমাদের একটা সুস্থ্য জীবন দিয়ে যেতে পারলাম না’।

জীবনে আমি অনেক অপরাধ করেছি, অনেক …কিন্তু এই অপরাধের ক্ষমা আমি নিজেকে নিজে বোধহয় কখনোই করতে পারবোনা। সন্তানের এহেন প্রচেষ্টায় বাবা মার্ যে কি পরিমান যন্ত্রনা হবার কথা সেটা তখন না বুঝলেও, এখন মা হবার পর বুঝতে পারি।

সেই যন্ত্রনা বোঝানোর জন্য এই লেখা না। জন্মদিন অতি আনন্দের দিন। আমি ক্লাস এইটের সেই অপরাধ করার পর, আজকে পর্যন্ত বেঁচে আছি, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর হয়না। এরমধ্যে কত শত ভালোমানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। কত এচিভমেন্ট আমার।…

অনেকেই বলে জন্মদিন নিয়ে আদিখ্যেতা করার কিছু নেই। আমার মনে হয় জন্মদিন নিয়ে অবশ্যই আদিখ্যেতা করা উচিত, জন্মদিন আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমি বেঁচে আছি ,আরো একটা বছর আমি কোনো ঝামেলা ছাড়া বাঁচলাম।
কি আনন্দ !!
এই আনন্দে আমার সঙ্গে যদি আরো দশটা মানুষ শরিক হয় তাহলে আমার আনন্দ দোষগুণ বেড়ে যায়।

মৃত্যু সহজ নাকি কঠিন জানিনা। তবে দৌড়াদৌড়ি করে বেঁচে থাকার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। পড়াশুনা শেষ করে চাকরি, তারপর বিয়ে, তারপর বাচ্চা ,বাড়ি, গাড়ি।

…তারপর?
তারপর বাকি সময় পেছনে তাকিয়ে থাকা আর ভাবা আহা জীবন কত সুন্দর ছিলো ! যখন আমরা দৌড়াচ্ছিলাম, যখন জীবনের দিকে না তাকিয়ে জীবনের ডেস্টিনেশন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তখন আসলে জীবন উপভোগ করার দরকার ছিলো। আমরা তা কতখানিই বা উপলব্ধি করতে পারি ?

আমি একটা কথা আমার প্রায় বলি তাহলো, লাইফ ইজ বিউটিফুল, জীবন সুন্দর। জীবন আসলে ‘সুন্দর বান্দর’ কিছুই না, যতক্ষণ না সেই সৌন্দর্য আমরা দেখতে পাই। পৃথিবীর সবকিছু কখন সুন্দর হয়ে উঠে জানেন? যখন আমরা বুঝতে পারি আমাদের ঠিকঠাক ভাবে বেঁচে থাকাটাই একটা মিরাকল। বাকিসব বোনাস

আমাদের প্রতিটা জন্মদিন সেই মিরাকল অর্জনের কথা মনে করিয়ে দেয়। জীবন থেকে খুব বেশি কিছু চাইলে,জীবনের বেশিরভাগ সময় শূন্য হাতে ঘোরাঘুরি করতে হয়। বরং সুস্থ্যভাবে বেঁচে আছি শুধু এইজন্যই বার্থডে সেলেব্রেট করা উচিত।

প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে তো আর বলা সম্ভব না ‘ইয়েস, আমি বেঁচে আছি, কি মজা ! তাই অন্তত একটাদিন, জন্মদিনের দিন পুরো বছর বেঁচে থাকাটা সেলেব্রেট করি। একলা করি, ফেইসবুক নিয়ে করি, পরিবার নিয়ে করি… যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে করি, তবুও করি।

ছবি:গুগল ও লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]