ব্যক্তিগত রক্তপাতে

সৃজা ঘোষ

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

প্রায় বছর সাত আটেক আগের একটা ঘটনা- আমার বাড়ির সামনের পুকুরে স্নান করতে নেমে দুটো বাচ্ছা দেড় দু’ঘন্টা নিখোঁজ। ঘাটে রাখা দু’টো চটি দেখে সন্দেহ হয়। জলে নামা হয়। একটা বাচ্চার ডেডবডি উদ্ধার করে আর একটা বাচ্চার জন্য গোটা পুকুর তোলপাড় করছিলো পাড়ার কাকুরা। সেসময় যে বাচ্চাটির খোঁজ তখনও পাওয়া যায়নি, তার মা এসে উপস্থিত৷ গোটা পাড়া জানে বাচ্চাটির বেঁচে থাকা অসম্ভব। সবাই যখন জলের দিকে তাকিয়ে বাচ্চাটার ডেডবডিটার অপেক্ষা করছে, আমি শুধু ওর মাকে দেখছিলাম। অপেক্ষা আর জীবন্ত সন্তানকে ফিরে পাবার আশায় থেমে থাকা দুটো চোখ, যার সামনে মৃত্যুও আসতে ভয় পাবে। মনে মনে চাইলাম, যেন বাচ্চাটাকে খুঁজে না পাওয়া যায় আর। কেননা আমি চাইনি ওই মিথ্যে আশাটুকু চিরতরে ভেঙে যাক। কিন্তু আমার আশা যে পূরণ হয়নি, তা তো বোঝাই যাচ্ছে৷

সম্পর্কও বোধহয় এমনই একটা জিনিস। কাউকে ভালবাসলে তার সঙ্গে বিচ্ছেদ সহ্য হয়না। তার দেওয়া যতো আঘাত, যতো অবহেলার পোস্টমর্টেমই চোখের সামনে হয়ে যাক না কেন। আমরা কোন ভয়ানক আশায় জোর করে চোখ বুঁজে থাকি। স্বপ্ন দেখি ময়নাতদন্তের রিপোর্টে লেখা আছে- সম্পর্ক ভাঙেনি। অসম্ভব কল্পনায় বসতি বানাই। সব সত্যি জানার পরও আমরা ওই সত্যিকারের সত্যটুকুর মুখোমুখি বসতে চাইনা। যেখানেই সত্যির আভাস পাই, সেখান থেকেই পালিয়ে যেতে চাই। পদ্মপাতায় জলের মত আশা ঢিমে আঁচে ক্ষতর সলতেয় জ্বলতে থাকে। হয়তো কেউ ফিরবেনা জেনেও আমরা আসন পেতে রাখি, স্নান সেরে ভাত বেড়ে রাখি, বিছানা গুছিয়ে রাখি, দরজা খুলে রাখি, ঘুম এলেও জেগে থাকি একটা কড়া নাড়ার অপেক্ষায়। শুধু শব্দ হলেই দৌড়ে যাই দরজা খুলবো বলে অথচ খোলার আগে হাত কাঁপে কেননা আমরা আশাটুকু মরে যাওয়ার ভয় পাই। ভাঙনের মধ্যেও তাকে ছাড়া কিছুতেই ভাবতে পারিনা। তার সম্পর্কে একটা মন্দ কথা সহ্য হয়না। অথচ আমাদের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসে, আলো নিভে যায়, পুড়ে যায় সমস্ত সম্বল, স্মৃতি পুড়েনা। তারা আমায় কোন রঙ্গমঞ্চের নিওন আলোয় দাঁড় করিয়ে হা হা করে হাসে। আসর শেষ হলে দেখি এ পৃথিবীর দীর্ঘতম যন্ত্রণা আমারই বাড়ির উঠোনে এসে জড়ো হয়েছে, অথচ তার মুখটুকু মনে পড়লেই সব ফুঃ। শেষ বিন্দু অব্দি রক্তাক্ত হতে হতেও ভালবেসে যাই৷ ফিরে তাকাই। মাথার সঙ্গে মনের যুদ্ধ বাঁধে। স্মৃতির তাড়ায় আমরা বাড়ি থেকে পালিয়ে, গলি টপকে, বড় রাস্তাটা ধরে শুধুই ছুটতে থাকি এমন একটা ঠিকানার খোঁজে যেখানে আমায় দেখে সবাই ভরসা দিয়ে বলবে- ‘সব আবার আগের মতো…’ অথচ সেই ঠিকানা খুঁজে পাই কই? শুধুই ছুটতে থাকি। চান-খাওয়া-ঘুম ফেলে কেবলই ছুটে যাই। এমন দৌড়, যে আমাকে দেখে ক্লান্তিও ভয় পায়। আমি কোত্থাও দাঁড়াইনা আর। আমি জানিনা আমি কাদের থেকে পালিয়ে এসে কার কাছে যাব, তবু আমার ছোটা থামে না। আমাদের কারোর ছোটা থামেনা মৃত্যু পর্যন্ত। আসলে ভালবাসা এমনই এক মায়া, যার জোরে, যার জেরে মানুষ হাসতে হাসতে মরে যেতে পারে। যেকোনো শুদ্ধ আর সত্য ভালবাসার সম্পর্কের ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য, যেটা ভাঙলে বা ভাঙার সম্ভবনা তৈরি হলেই আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে সেদিনের সেই মা বেড়িয়ে পড়ে একটা করে। যার মাথা বলছিলো জল থেকে মৃতদেহ ছাড়া আর কিচ্ছু উঠে আসতে পারেনা আর মন বলছিলো জলের নীচ থেকে উঠে আসলেই আবার সব আগের মত হয়ে যাবে…

কাউকে সত্যিকারের ভালবাসলে আমরা সবাই এক একজন ‘মা’ হয়ে যাই। আর মা হওয়া বড্ড কষ্টের…