বড়দিনে নিউইয়র্ক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

(নিউইয়র্ক থেকে) : সব সময়েই দেখেছি যে বড়দিনের সময় নিউইয়র্ক বড় মায়াময় হয়ে ওঠে।চারদিকে একটা উৎসব উৎসব ভাব, স্ফূর্তি আর আনন্দের স্রোত বয়ে যায়, নানান রংয়ের বাতি, আলোকসজ্জা আর বড়দিনের বৃক্ষ মিলে কেমন যেন একটা স্বর্গীয় আবহের সৃষ্টি করে।পথে-ঘাটে হাসি-হল্লা, লোকের ভীড় দোকানে-রাস্তায়, বেশ একটা চনমনে ভাব আকাশে-বাতাসে। লোকে বলে, বড়দিনের সময়ে নিউইয়র্কের মানুষ ভদ্র আর নম্র হয়ে যায়, কথা-বার্তায় মোলায়েম হয়ে আসে, ব্যবহারে অন্যের প্রতি বিবেচনায় নমনীয়তায় নুয়ে যায়।

তবে বড়দিনের সময়ে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে মানুষদের। যখন দেখি রাস্তা-ঘাটে, দোকানে-পার্কে ছোট-বড় সবাই মিলে আনন্দ করছে, খুনসুটি হচ্ছে একের সঙ্গে অন্যের, হাসি-ঠাট্টায় ভরে যাচ্ছে চারদিক তখন মনটা আর্দ্র হয়ে আসে। শিশুদের আবদার শুনি, কানে ভেসে আসে সাথীর সঙ্গে সাথীর নরম কথা, মাঝে মাঝে টের পাই অভিমানের সুর এবং সে অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য অবিরাম চেষ্টা।

বড়দিনের তো পারিবারিক মিলনের এক সুবর্ন সময়। পথে ঘাটে দেখি পরিবারের সবাই মিলে চলছে। কখনও কখনও সেখানে তিন প্রজন্মের, এমন কি চার প্রজন্মের মানুষ আছে – সেখানে নব্বুই বছর থেকে ন’মাসের মানুষও আছে। বুঝি যে নিউইয়র্কের বাইরে থেকে আত্মীয়-স্বজন এসেছে, অন্য শহরে পঠনরত ছেলেমেয়েরা বাড়ীতে এসেছে ছুটি কাটাতে। বড়দিনের সময়ে নিউইয়র্ক ভরে যায় পর্যটকেও – বিশেষত ইউরোপ ঝেঁটিয়ে। সবাই এখানে নববর্ষ কাটাতে চায় এবং টাইমস্ স্কোয়ারে মতুন বছর ঘোষনার সে বিখ্যাত বল পড়া দেখতে চায়।

ওই তো এক তরুন দম্পতি চলেছে, তাদের মাঝখানে সোনালী চুলের একটি শিশু, যে দু’হাত দিয়ে মা-বাবার আঙ্গুল ধরে লাফিয়ে চলছে। মাঝে মাঝে পিতা-মাতা তাদের হাত একসঙ্গে ওপরে তুলে নিয়ে শিশুটিকে শূন্যে ঝোলাচ্ছেন – আর শিশুটির কি খলখল হাসি। পিতার কাঁধের ওপরে জাঁতিয়ে বসেছে একটি ছোট্ট মেয়ে – দু’জনেই তাকিয়ে তাকিয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছে বিশাল দোকানের জানালায় অপূর্বভাবে সাজানো রূপাঞ্জলের চরিত্রগুলো। হাতে হাত ধরে ছেলেটির দিকে দুষ্টু হাসি হেসে তরুনী মেয়েটি ‘না’ এর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছে।বোঝাই যাচ্ছে, ছেলেটি খুব আবেগের সঙ্গে মেয়েটিকে কিছু বলছে এবং মেয়েটি তা’তে সায় দিচ্ছে না। সুবেশ এক বৃদ্ধ এক সুন্দরী বৃদ্ধার কোমর জড়িয়ে ধরে চারপাশ দেখতে দেখতে অতি ধীরে পথ চলছেন। তাঁদের দিকে তাকিয়ে বড় ভালো লাগে – কি রকম একটা প্রেমময় ভাব তাঁদের প্রতিটি ভঙ্গিতে।

বিরাট যে পরিবারটি চলেছে পথের উল্টোদিকে, তাদের প্রত্যেকে প্রত্যেককে যেন দেখে রাখছে কথা-বার্তার মাধ্যমে, স্পর্শের দ্বারা, ভালোবাসার ওমে।দূরে থেমে থেমে ঘন্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে একটি বিশালকায় বিপনী কেন্দ্রের সামনে থেকে। সন্তক্লজ সেজে স্যালভেশন আর্মির লোকজন অর্থ তুলছেন তাদের কাজের জন্য – যা বহু দু:স্হ পরিবারকে এ সময়ে সাহায্য করবে। মাঝে মাঝে তাদের ‘হো’ ‘হো’ ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তাঁদের চারপাশে উৎসুক চোখ বড় বড় করা বাচ্চাদের ভীড়। ওদের দেখে মনটা ভরে যায়।

বড় ভালো লাগতো যখন দেখতাম যে আমাদের দ্বীপের ছেলে মেয়েরাও বড়দিনের ছুটি কাটাতে বাড়ী ফিরেছে দ্বীপে। কেউ কেউ বাইরে পড়াশোনা করতে, ফিরে আসতো মা-বাবার কাছে। দ্বীপের পথে দেখতাম তারা চলেছে মাতা-পিতার সঙ্গে। তাদের চোখে-মুখে আনন্দ, আর মাতা-পিতার মুখে চাপা তৃপ্তির আভা। মনটা খুব নরম হয়ে আস তো যখন দেখতাম যে বছর পঁচিশ আগে যাদের শিশু হিসেবে দেখেছিলাম, তারা নিজেরাও সংসার পেতেছে, কেউ কেউ নিজেরাও মাতা-পিতা হয়েছে। তারাও ফিরতো মাতৃ-পিতৃ নীড়ে। দ্বীপের পথে তাদের কারো কারো সঙ্গে দেখা হতো – কেউ কেউ শিশু-ঠেলুনীতে তাদের শিশুদের নিয়ে বেরুতো। আমাকে দেখলে কেউ কেউ লাজুক হাসি হাসতো, কেউ কেউ কুশল শুধাতো। বড় ভালো লাগতো।

কিন্তু বড়দিনের সময়ের সবটাই তো এতোটা সুনন্দ নয়। নি:সঙ্গতা এ সময়ের এক বিরাট বোঝা বহু মানুষের জন্য। বহু বৃদ্ধ মানুষ বড় নি:সঙ্গ – একেবারে একা। কারো কাছ থেকে একটি শুভেচ্ছা বানীও তাঁদের ভাগ্যে জোটে না। বহু বয়স্ক মানুষ সামর্থ্যহীন – প্রিয়জনদের জন্য কিছু কিনতেও পারেন না।এদের অনেকেই থাকেন বৃদ্ধাশ্রমে। বড় আস্তে আস্তে ক্লান্ত পায়ে পথ চলেন এঁরা, চারদিকের আনন্দ উৎসবের দিকে ঘোলাটে নয়নে তাকিয়ে থাকেন, দাঁড়ান বড় বড় বিপনী কেন্দ্রের জানালায় উদগ্র চোখে, তারপর এক সময়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে যান।

এ সময়টায় অনেক কম বয়স্ক মানুষকেও দেখেছি উদাস, বিষন্ন এবং একা। এদের অনেককেই এক কাপ কফি নিয়ে কোন এক ক্যাফের কোনায় বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেন।হয়তো চাকুরী হারিয়েছেন, হয়তো বেকার বহুদিন ধরে, হয়তো সম্প্রতি কোন প্রিয়জন হারিয়েছেন, কিংবা ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছে। কারন যাই হোক না এ বিষাদময় – কখনো হতাশ ও আশাহীন – মুখগুলোর বেদনাকে চারপাশের আনন্দ-উৎসব স্পর্শ করতে পারে না।

কষ্ট হয় যখন পথের পাশে যে লোকটি বড়দিনের বৃক্ষ বিক্রি করছে, তার দিকে তাকাই। সবাই তার কাছ থেকে বৃক্ষ কিনে আনন্দ করতে করতে গাছটি টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কারো কি মনে হচ্ছে যে এই ঠান্ডায় কেমন করে ওই লোকটি ঘন্টার পর ঘন্টা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকছে শুধুমাত্র জীবিকার জন্যে? শরীর উত্তপ্ত রাখার জন্যে মাঝে মাঝে পাশের উত্তাপ-প্রদান বৈদ্যুতিক যন্ত্রটির ওপর হাত সেঁকে নিচ্ছে, আবার কখনো সখনো গরম কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে। কিংবা ওই যে দূরে একদল মেক্সিকান মহিলা তাঁর দেশীয় খাবার বিক্রি করছেন, প্রচুর গরম কাপড়ে নিজেকে ঢেকে রাখলেও বোঝা যায় যে তিনি চেষ্টা করছেন নানানভাবে এই শীতল ঠান্ডার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে।

তবে সবচেয়ে বেশী কষ্ট হয় গৃহহীন মানুষদের জন্যে। একটু ঠান্ডাতেই আমরা কাতর হয়ে যাই, দৌড়ে ঢুকে পড়তে চাই ঘরের মধ্যে, তারপর দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠি। অথচ এ মানুষগুলো কেমন করে এই ঠান্ডায় দিন-রাত্তির রাস্তায় থাকেন? ঠান্ডা বাঁচাতে কতভাবে চেষ্টা করেন এ মানুষেরা।চারদিকে কার্ডবোর্ডের বেস্টনী তৈরী করেছেন ঠান্ডা হাওয়া ঠেকানোর জন্যে। তার ভেতরে লোকদের ফেলে দে’য়া তোষক, লেপ,কম্বল দিয়ে তৈরী করেছেন একটু ছোট্ট জায়গা শোয়ার জন্য। মুড়ে নিয়েছেন নিজেকে অন্যদের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে যোগাড় করা নানান গরম কাপড়ে – ওপর কোট, এমনি কোট, স্তরে-স্তরে সোয়েটার, গরম জামা, স্কার্ফ, টুপি, বুটজুতো ও দস্তানায়। তাঁদের দেখলে একটি কাপড়ের পাহাড় বলে মনে হয়। তবু কি শীত ঠেকে? কুকুর-কুন্ডলী পাকিয়ে ওই পাহাড় সমান কাপড় নিয়ে নিশ্চল হয়ে শুয়ে থাকেন তাঁরা। এত সম্পদ চারদিকে, এত বৈভব আশে-পাশে, এত অপচয় ও অপব্যয় সারা পরিবেশ জুড়ে, তবু বহু বঞ্চিত হতদরিদ্র মানুষ ‘একটু উষ্ণতার জন্যে’ মাথা কুটে মরছে এই বড়দিনের সময়েও!

তবে বড়দিনের এ ছুটিতে আমার খুব করে মনে পড়ে আমার কন্যাদ্বয়ের কথা। যখন তারা ছোট ছিলো,তখন তারা খুব ভালোবাসতো বড়দিনের উৎসব। তাদের জন্য ছোট্ট একটা বড়দিনের বৃক্ষ কিনে নিয়ে আসা হতো, ছোট ছোট হাতে তারা সেটা সাজাতো মরিচ বাতি, নানা রংয়ের ফিতা, কাগজের ফুল দিয়ে। তাদের জন্য উপহারের বাক্স সাজিয়ে রাখা হতো। তারাও নিজের হাতে কিছু একটা তৈরী করে উপহার বাক্সের মধ্যে রেখে দিতো মা-বাবার জন্যে। ওদের মা এরা যা যা খেতে ভালবাসতো, তাই বানাতেন।

আমাদের কন্যারা যখন অন্য শহরে পড়াশোনা করছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তখন বড়দিনের ছুটিতে তারাও ফিরে আসতো মা-বাবার কাছে। কখনো কখনো তাদের বন্ধু-বান্ধবেরাও থাকতো তাদের সঙ্গে। মাঝে মাঝে বড়দিনের উৎসবে আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে আসতেন যুক্তরাষ্ট্র ও ক্যানাডার নানান জায়গা থেকে আত্মীয়-স্বজনেরা বড়দিনে আমাদের কাছে এ দ্বীপে।কথা, হাসি-ঠাট্টা, স্মৃতি-চারনে ভরে উঠতো সারা বাড়ী।

সেদিন তাকের একটা বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ করে দু’টো চিরকুট মাটিতে পড়ে গেলো। অনেক দিন আগের – বিবর্ণ হয়ে গেছে কাগজ। কবে তুলে রেখেছিলাম মনে নেই। দু’টোতেই প্রায় পঁচিশ বছর আগে কোন একটি বড়দিনের তারিখ।তার ওপরে অপক্ক হাতে, আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা। একটাতে -‘বাবা, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি’, অন্যটাতে শুধু ‘বাবা – আমার বাবা’। এ’টুকুই মাত্র – আর কিছু নেই।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]