বড়ো ইচ্ছে করে নক্ষত্রের কাছে যেতে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. এম আল মামুন

(তাবুক, সৌদি আরব থেকে): দেয়াল ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ঘন্টা আর মিনিটের কাঁটা ‘একটা উনত্রিশ’ মিনিটে এসে থেমে গেছে। রোজই ভাবি ব্যাটারিটা বদলাতে হবে। সুপার শপে যাই, নিত্য ব্যবহার্য অনেক কিছুই কেনা হয়। অথচ ঘড়ির ব্যাটারি কেনার কথা বেমালুম ভুলে যাই। হয়তো বয়সের লক্ষণ। ঘড়িটা শোবার ঘরে এমন জায়গায় সেট করা যেন ঘুম ভাঙা মাত্রই দেখতে পারি ক’টা বাজে। এই আরব্য মরুশহরে এখন কনকনে ঠাণ্ডা। গত ক’দিন ধরে তুষারপাতে শহরের বাইরের মরুপাহাড়গুলো ঢেকে যাচ্ছে শ্বেত-শুভ্র তুষারকণায়।

অফিস থেকে ফিরে খুব শীত শীত লাগছিলো। একটু বিশ্রামের আশায় বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তা নিজেও জানি না। ঘুমের মধ্যেই স্বপ্নে দেখি, আমি তাবুক প্রদেশের উত্তরপ্রান্তে ‘লুজ পর্বতমালা’র পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছি। চারিদিকে ধবধবে সাদা তুষারকণা। মরুপ্রান্তর আর মরুপর্বতমালা জুড়ে শুধু তুষার আর তুষার। তুলতুলে তুষারকনায় আমার জুতাসহ পা তলিয়ে যাচ্ছে। প্রচন্ড শীতে আমার শরীর কাঁপছে। শীতের কাঁপুনি খেতে খেতে আমার ঘুম ভেঙে যায়।

দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি যথারীতি একটা উনত্রিশ বাজে। বালিশের পাশে রাখা অ্যাপল-ওয়াচের গোলাকার বাটনে চাপ দেই। ওখানেও দেখাচ্ছে একটা উনত্রিশ বাজে। বিষয়টা কি কাকতলীয়? রুমের সব ক’টা টিউব লাইট জ্বলছে। জানালায় ভারি পর্দা টানানো। দিন না রাত বুঝতে পারছি না। কখন ঘুমিয়েছি তাও মনে করতে পারি না। এতো শীত লাগছে কেন? আমি তো এখন আর ‘লুজ পর্বতমালা’র পাদদেশে নাই। এই মুহূর্তে আমি আমার বিছানায়, ভারি কম্বলের নীচে। রুম হিটারও ঠিকঠাক চলছে। তবুও ভীষণ শীত করছে। শরীরে কাঁপুনি দিচ্ছে। উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখা দরকার এখন দিন না রাত। কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। গলা শুকিয়ে গেছে। বুঝতে পারছি আমার তেষ্টা পেয়েছে। উঠে গিয়ে পানি খেতেও ইচ্ছে করছে না। তার মানে নিশ্চিত আমি জ্বর বাঁধিয়েছি। এইচ ওয়ান এন ওয়ান, মার্স করোনা, নাকি সিজোনাল ফ্লু ভাইরাস? বাসায় কি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট আছে? নিজের কপালে নিজে হাত ছোঁয়াই। বুঝতে পারি না, আমার কি সত্যিই জ্বর, নাকি মনের বিভ্রম।

হুমায়ূন আহমেদের ‘নক্ষত্রের রাত’ উপন্যাসের নায়িকা রেবেকাও জ্বর বাঁধিয়েছিল। বিদেশ বিভুঁইয়ে গিয়ে প্রবল জ্বর। উপন্যাসের নায়ক পাশা রেবেকাকে দেখতে গিয়েছিল। পাশা এক শেকড়বিহীন পিছুটানহীন নিঃসঙ্গ মানুষ। রেবেকার বিছানার পাশে চেয়ার টেনে বসতে বসতে পাশা জিজ্ঞেস করেছিল, বেশি জ্বর? উত্তরে রেবেকা বলেছিল, বেশি জ্বর কি কম জ্বর সেটা আপনি আমার কপালে হাত দিয়ে দেখতে পারেন না? নাকি সেটা করলে আপনার পাপ হবে?

এই বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে [দু’দিন আগেই দেশ থেকে ফিরেছি] আমিও জ্বর বাঁধালাম। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানা থেকে উঠি। জানালার পর্দা সরিয়ে আকাশের দিকে তাকাই। কী সুন্দর নক্ষত্রভরা আকাশ। সুনশান আরব্য রজনী। নির্ঘাত আজ রাতেও ‘লুজ পর্বতমালা’র ওপর তুষার ঝরছে। প্রবল জ্বর নিয়ে নক্ষত্রের মায়াবী আলোয় তুষারকণায় আবৃত মরুপ্রান্তর দেখতে বেরিয়ে পড়লে কেমন হয়?

এ রকম নক্ষত্রের রাতে বড্ড ইচ্ছে করে কারো কাছে যেতে…।

ছবি: গুগল

 

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]