বড় শূন্য শূন্য লাগে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কনকচাঁপা

আমাদের দেশে কণ্ঠশিল্পী আছেন কতজন আর ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা’র এযাবৎকালের ইতিহাসে রেগুলোর প্লেব্যাক সিঙ্গার আছেন কজন?এর উত্তর কারো জানা আছে? এই প্রশ্ন কারো মাথায় এসেছে? মঞ্চ মাতানো আর প্লেব্যাকে ফারাক অনেক।

প্লেব্যাক সিঙ্গার আছেন হাতে গোনা ক’জন; কারণ অন্যান্য গান গাওয়া যায়, কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র ৩৫ মিলিমিটারের জন্য গান গাওয়া খুব কঠিন।

হলে স্ক্রিন ভরে পুরো গান ছড়িয়ে গেলে সে গান হলের ভেতর সর্বজনীন হয়ে ওঠে।গানের ওয়েভ মাপারও যন্ত্র আছে।আছে কোয়ার্টার থ্রোট হাফ থ্রোট ফুল থ্রোটের গ্রামার। একমাত্র যাদের ফুল থ্রোট ওয়ালা কন্ঠ আছে তাদের কন্ঠই ফিল্মে কাজে লাগে।কিন্তু সেই কণ্ঠকে পানির মতো বইয়ে দিতে হয়।সেটা বড় কঠিন কাজ আর এই কঠিন কাজ পানির মতো সহজ করে সফলতার সঙ্গে উপস্থাপন করে নিজেকে বাঘের মতো শক্তিশালী হিসেবে যিনি পরিচিত করতে পেরেছেন, তিনি আমাদের কণ্ঠরাজ এন্ড্রু কিশোর।

আমি তাঁর কণ্ঠকে বলি গলিত সোনা। সোনার চলমান ধারা। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের আগেই আমি তাঁর গান শুনি। ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে এএএএ। হেসে-খেলে, তাচ্ছিল্য ভরে কেউ দুঃখ কইতে পারে- এ কথা আমি আগে জানতামই না। দয়াল ডাকছে, আমি মরে যাবো- এ গানতো আমাদের দেশের শিল্পীরা ফিচফিচ করে কেঁদে কেঁদে গায়!অথচ এতো দুঃখের অনুভূতি এমন হেসে-খেলে আসল ভাব বজায় রেখে গাইলেন আমাদের কিশোর’দা। সেই থেকে শুরু। আমি আব্দুল আলীম থেকে একেবারে কিশোর’দাতে স্থানান্তরিত হলাম। সে হয়তো ’৮০/’৮১-এর কথা।

 ৮৬ সাল। আমার জীবনসঙ্গী সুরকার সংগীত পরিচালক মইনুল ইসলাম খান সাহেবের ছবি ” নাফরমান ” এর গানের রেকর্ডের দিন আমি সামনে থেকে দেখলাম দাদাকে,অথচ মনে হলো কতদিনের চেনা…। হাতে একটা অফিসিয়াল ব্যাগ। সেখান থেকে কাগজ-কলম বের করে গান লিখে নিলেন! গান তোলার সময় কলমের হেড ঠোঁটের সঙ্গে ক্লিপ করার মতো একটা ভঙ্গি করে গান তুলে নিলেন এক মুহূর্তেই।এমনটাই দেখে এসেছি সব সময়।

তারপর তো ইতিহাস!তাঁর প্রতিটি গানই ইতিহাস। অথচ দাদা বলতেন আমি তো আমজনতার শিল্পী। ভদ্রলোকরা কি আমার গান শোনেন?প্রথম আলো মেরিল পুরস্কার প্রথমবার পাওয়ার পর বারবার বলছিলেন কি আশ্চর্য, আমার গান ভদ্রলোকের বেডরুমে যায়! অথচ সারাবাংলা, সারা পৃথিবী গানের জন্য প্রদক্ষিণ করার সময় একবার নিউইয়র্কে ডাক্তার দের জন্য গান গেয়ে ইন্টারভেলে ব্যাকস্টেইজে একদল ডাক্তার এসে যখন বললেন কিশোর’দা, আপনার গান শুনে শুনে আমরা ডাক্তার হয়েছি।কিশোর’দা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে চোখ সরু করে শুধান “সে কেমন? ” তাঁদের উত্তর ছিলো যখন মানবদেহের হাড্ডি গুড্ডি আমাদের আঁকড়ে ধরতো, মাথা কাজ করতো না তখন “এন্ড্রু কিশোর” ছেড়ে মাথা ঠান্ডা করতাম।তারপর সেটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেলো। কিশোর’দার হাতের সিগারেট পুড়ে ছাই।আমি বললাম “এবার বুঝলেন তো!” তিনি শিশুর সরলতায় ফ্যাঁকফ্যাঁক হাসেন। বাঘের মুখে শিশুর হাসি বড়ই সুন্দর!

কত গান যে গাইলাম তার সঙ্গে! পৃথিবীর সব কিছুই যেন তার নখদর্পণে; কিন্তু কোনো কিছুতেই তাঁর কিছু আসে যায় না। জীবনে কোনো সমস্যাই তাঁর কাছে সমস্যা নয়। এক মুহূর্তেই সমাধানও দিয়ে দেন চোখ বুঁজে!

খেতে ভালোবাসতেন কিশোর’দা! একাই তিনজনের খাবার সাবাড় করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতেই আবারও খিদা লাগাতে পারতেন! বলতেন জানো কনক আমার হলো ইচ্ছেখিদে।ইচ্ছে হলেই খেতে পারি। খুব আমুদে মানুষ কিন্তু ভীষণপ্রফেশনাল কিশোর’দা।মীরপুর থেকে প্রায় রোজ শ্রুতি স্টুডিওতে সময়মত পৌঁছে যাওয়া চাট্টিখানি কথা না!

আমার প্রতি তাঁর অপত্য স্নেহ ছিলো এ আমি দাবি করতেই পারি।আমার প্রথম বই ‘স্থবির যাযাবর’ এর মোড়ক উন্মোচন। কিশোর’দার জন্য বইমেলার মতো জনসমক্ষে যাওয়া সত্যিই কঠিন। উনি ঠিকঠাক উপস্থিত হলেন।আমি সৌভাগ্য সে মেলায় আমার চার ভাই এন্ড্রু কিশোর, তপন চৌধুরী, শুভ্র দেব ও মনির খান কে সেদিন পাশে পেয়েছিলাম।মেলায় জটলা লেগে গেলো। কিসের বই কিসের কি! কিশোর’দাকে দেখতেই সব হুমড়ি খেয়ে পড়লো। পরে পুলিশ টুলিশ করে তবে নিস্তার। এই ভয় থাকা সত্বেও আবার আমার চিত্র প্রদর্শনীতে ঠিকঠাক গিয়ে উপস্থিত। তখন সেলফির যুগ।মেলফি কিশোর’দা একদম সহ্য করতে পারতেন না! আমার ছেলেমেয়ের বিয়েতেও উনি সময়মত এসেছেন। এছাড়াও পারিবারিক দাওয়াতে অংশগ্রহণ করেছেন খুব আগ্রহ নিয়ে।

এই শক্তিশালী মানুষটিকে আমি কাঁদতেও দেখেছি জনসমক্ষে। রাজশাহীতে তার ওস্তাদজির অসুস্থতায় আমরা ক’জন যখন বিনাপারিশ্রমিকে গাইতে গেছি, তখন তিনি মঞ্চে কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন! সে কান্না মঞ্চের পেছনেও শেষ হয় না। নীরবে নীরবে অনেক দান-ধ্যান করতেন কিশোরদা; কিন্তু কাউকে টের পেতে দেননি কখনও। আমাদের মিলু ভাই চলে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন আসিফ এবং কিশোর’দা মিলে মিলু ভাইয়ের পরিবারের পাশে নীরবে দাঁড়িয়েছিলেন যা আমাদের কাউকে জানতে দেননি।

নিজের রাজশাহীর মানুষের প্রতি অসম্ভব পক্ষপাত ছিলো, তাদের সুখ দুঃখ আর্থিক অভাব অনটন সব জানতেন খোঁজ নিতেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা করতেন নিরবে।

খেতে তিনি খুব ভালোবাসতেন আগেই বলেছি,আর আমার রান্না তাঁর খুব পছন্দ। আমার স্বামী তার বয়সে কিছু ছোট; কিন্তু এমন স্নেহভরা কণ্ঠে তিনি ‘ও মইনুল’ বলে ডাক দেন যে, আমার বুকটা ভরে ওঠে অসম্ভব ভালোলাগায়। সুরকার মইনুল ইসলাম খান সাহেব সাউন্ডটেকের একটি ক্যাসেট করেছিলেন ” দুখের সানাই ” তখন কিশোর’দা ক্যাসেটের একটা গানে লাখের উপর সম্মানী নেন।তো গাওয়ার আগে বললেন মইনুল তোমার গান যে কঠিন, আমি পারবো? এমন উদ্ভট কথা বলে তিনি কিনা অপূর্ব গেয়ে দিলেন। সম্মানীর কথায় বললেন ” মইনুল, সাউন্ডটেকের কাজ না কিসের কাজ আমি জানিনা, আমি তোমার গান গেয়েছি। আমাকে দিয়ে কেউ তেমন অন্য ধারায় এক্সপেরিমেন্ট করেনি।তুমি করলে এতেই আমি খুশি। আমিও নিজেকে ঝালিয়ে দেখলাম যে আমি পারি কিনা! আমি কোন পয়সা নেবোনা।”” এই নিয়ে দুজনের ধস্তাধস্তি পর্যন্ত হলো, খান সাহেব সেই সম্মানী নেওয়াতেই পারলেন না!

কিশোর’দার সঙ্গে ছবিতে যেমন হাজার হাজার গান গেয়েছি তেমন শতশত মঞ্চেও গেয়েছি একসঙ্গে। খুবই মজার বিষয়- কিশোর’দা ভাবেন উনি মঞ্চের শিল্পী নন। একটু অস্বস্তিও তাঁর টের পেয়েছি; কিন্তু ঘটনা হলো- তাঁর সুন্দর মার্জিত ড্রেসআপে তিনি যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘আমার সারা দেহ খেও গো মাটি ওওওওওও’ বলে টান দিতেন, তখন মনে হতো লম্বা একটা লোক অসম্ভব জাদুশক্তি-বলে একটানে লম্বা একটা তালগাছকে টেনে মট করে গোড়া উপড়ে ধরায় নামিয়ে আনলেন! এটা লিখতে গিয়েও আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল।

আমি প্রতিটি মঞ্চের পেছনে হা করে বসে তাঁর গান শুনতাম। মঞ্চের হাজার পাওয়ারের আলো ম্লান হয়ে যেতো তাঁর উপস্থিতির কাছে। ” ওরে এই না ভুবন ছাড়তে হবে দুদিন আগে পরে ” গাইতেন যখন তখন আমি অঝোরে কাঁদতাম।এটা আমার রেগুলার রুটিন ছিলো! এছাড়া আমি পারতামই না!

আমি আর কিশোর’দা যখন একই বুথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্লেব্যাক করতাম, তখন আমাদের ভীষণ হেলদি একটা প্রতিযোগিতা চলতো- কে কতটা ভালো গাইতে পারি। ফার্স্ট হওয়ার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও একজন আরেকজনকে খাতা দেখানোর মতো কান্ড করতাম। আমি হয়তো জিজ্ঞেস করলাম- কিশোর’দা এই জায়গাটা কেমনে কী? উনি হেসে দিয়ে বলতেন- তুমিই দেখাও। যেন আমি তার খাতা দেখে নিচ্ছি। অনেক সময় দেখা গেল গলা বসা। ঢকঢক গরম পানি চলছে, আমি তাঁর জন্য চিন্তা করছি; কিন্তু গাইতে গিয়ে সেই গলিত সোনার প্রবাহ। আহা! আমি আর লিখতে পারছিনা।

গত সেপ্টেম্বর এগারো তারিখ। আমার পঞ্চাশতম জন্মদিন! অথচ আমি পরিবার ছেড়ে নিউইয়র্কে ভাগ্নীর বাসায়। জাহাঙ্গীর ভাই জানালেন দাদা অসুস্থ। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া টাকা নিয়ে নিন্দুকেরা ঝড় তুলেছে। আমি ভাইবারে কিশোর’দার শারীরিক অবস্থা জেনে তারপর বললাম,‘কিশোর’দা এই অবস্থা, আমি প্রতিবাদ করতে চাই, কি বলেন।’ উনি বরাবরের মতো ঠান্ডা মাথায় বললেন শোন, ‘আমি তো আর অভদ্র বেয়াদব না! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডেকেছেন, আমাকে তো যেতেই হবে।আগ বাড়িয়ে কিছু বলার দরকার নেই।কেউ বেশি আজেবাজে কথা বললে তখন তুমি তোমার মতো করে উত্তর দিও।’ নয়মাস চিকিৎসা করার পরে যখন বিফল হয়ে ফেরত আসছেন সেই সময় ও তাঁর সঙ্গে কথা হলো। বৌদি ফোন ধরিয়ে দিলেন। তখন দাদার কেঁপে কেঁপে জ্বর।ফোনে খালি বললেন কনক, বাঁচি মরি, যাইহোক খালি দোয়া কইরো যেন কষ্ট বেশি না পাই! আমাদের কথা আর আগায়নি ।আমার এতো কথা মনে থাকে অথচ একদমই মনে পড়ছেনা শেষ কবে উনার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো, এই ছোট দুঃখটি এখনউনাকে হারানোর চেয়ে বড় হয়ে উঠবে ভাবতে পারিনি। হায়রে মানুষের মন।

কিশোর‘দা আর বৌদির সঙ্গে আমরা

কিশোর’দা খুব রংচঙয়ে কাপড় পরতেন।পরতেন আধুনিক ডিজাইনের নিত্যনতুন পাঞ্জাবী। কিন্তু আমার ধারণা সাদা পাঞ্জাবীতে ওনাকে দারুণ লাগতো। ঘাড়ের হাঁড়ের সমস্যায় উনি ঝুঁকে হাঁটতেন বলে তাকাতে গিয়ে সবসময়ই চোখ উঁচু করতে হতো। মনে হতো ঘুমে ঢুলুঢুলু।ফেসবুকে একজন মহিলা এনিয়ে বাজে মন্তব্য করায় আমার সঙ্গে ঝগড়াই লেগে গেলো।তখনও শুনে বলেছিলেন,‘থায়ায়ায়াক,বলুক। লোকের কথায় কি আসে যায়!’ জীবনে কখনো কিশোর’দাকে কখনো মানুষের বদনাম গসিপিং করতে শুনিনি।কেউ বললে বলতেন,‘আরে বাদ দাও, কে কি করলো তাতে কি আসে যায়!’

আমি কিশোর’দারসঙ্গে যতো প্লেব্যাক করেছি তার সমান না হলেও মঞ্চানুষ্ঠান কম করিনি।কি দেশে কি বিদেশে। অনেক বড় বড় অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম তাঁর সঙ্গে এই অনুভবটা আমাকে বারবার আবেগাপ্লুত করছে।

বেশীরভাগ অনুষ্ঠানে আমি আগে গাইতাম তারপর কিশোর’দা।স্বাভাবিক, জুনিয়র আগে গাইবে এটাই নিয়ম। তারপর উনার গান গাওয়া শেষ হলে উনি মঞ্চ থেকে আমাকে ডাকতেন। বলতেন কনককে মঞ্চে আমার সঙ্গে ডুয়েট গাইবার অনুরোধ জানাচ্ছি।কনক,আসো! আমি সবসময়ই বলতাম কিশোর’দা অনুরোধ শব্দটা বইলেন না প্লিজ! কিন্তু উনি কখনো তা শোনেননি।এভাবেই ডেকে গেছেন।

মঞ্চে আমাদের দুজনেরই নিজস্ব সোজাসাপটা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়েই গাইতাম। কিন্তু আজকালকার চল(!) অনুযায়ী কিশোর’দা ভাবতেন যে আরেকটু অভিনয় দরকার! সেই ভাবনাতেই “তোমায় দেখলে মনে হয়” বলতে গিয়ে আমার দিকে তাকাতেন আমি লজ্জায় মরে যেতাম। মঞ্চে ডুয়েট গানে একটু প্রেমিক প্রেমিকার অভিনয় দর্শক পছন্দ করে কিন্তু সেই অভিনয়ে আমি, কিশোর’দা দুজনই ভীষণ আনাড়ি! সব শেষে মঞ্চ জমানোর জন্য ‘সব সখীরে পার করিতে নেবো আনা আনা’ গাইতে গিয়ে তোমার কানের সোনা গাইতে গাইতে দুরত্ব বজায় রেখেই আমার কানের দুলে ইঙ্গিত করতেন আঙুল উঁচিয়ে। আমি মঞ্চে লজ্জায় হাসতে থাকতাম।

একবার যেই তোমার কানের সোনা বলে আঙুল উঁচিয়েছেন ঠিক তখনই কাকতালীয় ভাবে পুশ খুলে কানের একটা দুল খুলে পড়ে গেলো! পেছনে এলইডি স্ক্রিনে দর্শক সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।সবাই হেঁসে উঠলো,পেছনে বাজনা বাজছে, কিশোর’দা বলছেন “আমি কিন্তু ওর কানের দুল খুলিনি,চেয়েছি মাত্র” আবার দর্শকদের হাসি।

আমেরিকায় আমাদের কমন প্রমোটর আলমগীর খান আলম ভাই কতবার যে আমাদের একসঙ্গে নিয়ে গেছেন! অলি আংকেল এর খালি বাসায় আমরা অনেক শিল্পী একসঙ্গে থাকতাম মাস ধরে। আমি, রিজিয়া আপা, বিপাশা হায়াত, সুমনা হক আমরা পালাক্রমে রান্না করতাম। কিশোর’দা বলতেন গরুর গোস্তো কনক রান্ধো।আর কেউ না, আররেএএএ! সেইরকম ঝাল দিবা যেন খেতে খেতে কাঁদতে হয়!

কতরকম গল্প যে উনি করতেন! চিটাগং এর প্রত্যন্ত অঞ্চলে উনি নাকি একটা বিশেষ ভাবে মাছ রান্না খেয়েছেন। ষোল মাছ প্রসেস করে কলাপাতায় পেঁচিয়ে মাটির প্রলেপ দিয়ে জলন্ত উনুনে পুঁতে রান্না হয়।তারপর খুললে যে সুবাস বের হয় সেটা এমনভাবে বলতেন যে প্রতিবারই জিভে পানি আসতো।

উনি বলতেন কনক জানো অজু কি? আমি ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তার কথা বলতাম। কিশোর’দা বলতেন, তুমি তো এটা বলবেই কিন্তু তুমি কি জানো এটা কত সায়েন্টিফিক? আমি বাধ্য ছাত্রীর মতো বলতাম ” না”। কিশোর’দার ব্যাখ্যা “অজু করার সময় আমাদের হাত ঘাড় ও পায়ের পালস পয়েন্ট গুলো ভিজে।তাতে দেহ ঠান্ডা হয়।সঙ্গে পবিত্রতাও আসে।” তাই উনি নিয়মিতই অজু করতেন!

আবার জিজ্ঞেস করতেন বলো তো হিন্দু বাড়িতে তুলসীগাছ কোথায় থাকে? আমি জানিনা বলে মাথা নাড়তেই উনি ব্যাখ্যা দিতেন। বলতেন তুলসীগাছ হলো হার্বের রানী।আমাদের লাংস এর জন্য তুলসীপাতার রস তো বটেই তুলসীগাছের উপস্থিতিও খুবই উপকারী।তাই সব হিন্দু বাড়িতে তুলসীগাছ ব্রিদিং লেভেল বা বুক বরাবর উঁচু বেদিতে লাগানো হয়।উনার একবার সর্দি কাশী সারছিলো না।ডাক্তার বলেছেন সকালে কিশোর’দা যেখানে বসে পেপার পড়েন সেখানে একটা তুলসীগাছ রাখতে।এমন ছোট ছোট কিন্তু খুব সুন্দর ব্যাপার উনি খুব সহজে ছড়িয়ে দিতেন। স্টুডিওর সাহায্যকারী, ম্যানেজার সবাইকে এমন আদর করতেন তা বলার বাইরে। এক কাপ চা চাইতেও খুব আপন করে বলতেন,‘আইয়ুব এক কাপ চা দে তো বাবা!’

আমাদের সুরসম্রাট আলাউদ্দিন আলী ভাই এর চেয়ে বুলবুল ভাই বয়সে ছোট অথচ আলী ভাই কিশোর’দাকে আপনি করে বলতেন আর বুলবুল ভাই তুই করে বলতেন। আমি হা করে এর রহস্য উদঘাটন এর অপচেষ্টা করতাম।

কত কিছু যে মনে পড়ছে।তিনচার বছর আগে অনেকগুলো স্কুলের এক’শো বছর পূর্তির হিড়িক লাগলো। আমি আর কিশোর’দা একচেটিয়া সেই অনুষ্ঠানগুলো করতে করতে সারা বাংলাদেশ ঘুরতে লাগলাম। কিশোর’দা মজা করে বলতেন,‘আহা, সেই সময় মানে এক’শো বছর আগে প্রতি পাড়ায় পাড়ায় স্কুল হলো না কেনোরেএএএএ! তাহলে তো জীবন পার হয়ে যেতো অনুষ্ঠান করে করে!’

গানের তৃষ্ণা তাঁর কখনওই মিটতো না।কত যে হাবিজাবি গান গেয়েছি, নকল গানও গেয়েছি।দুইজন চোখ চাওয়া চাওয়ি করলে রেকর্ডিং-এর সময় চুপিচুপি বলতেন একদিন না গাইলে দম আটকে আসে রে! গাই, হয়তো এই গানটাও ভালো গান হয়ে উঠবে।

রাজশাহী গেলে যাদেরই অনুষ্ঠান হোক কিশোর’দা হোস্ট হয়ে যেতেন। কি আদর যত্ন, রাজশাহী সিল্ক গিফট করা, কলাইরুটি খাওয়ানো, পদ্মার পাড়ে বেড়ানো, এই স্পেশাল চা, ওই গরম মিষ্টি এগুলো করতেন। ফেরার পথে একগাঁদা ডালের বড়ি, ডুমুর, আম এগুলো দিয়ে দিতেন, আহা!

একবার পদ্মার পাড়ে আমরা ব্যাটারি চালিত রিকশায় চড়লাম।কিশোর’দা সামনে ড্রাইভার এর সঙ্গে বসলেন।আমি পেছন থেকে সামনের লুকিং গ্লাসে কিশোরদার ছবি তুললাম। সে এক ঐতিহাসিক ছবি!

একবার জামালপুর গেলাম দেওয়ানগঞ্জ একটা স্কুলের এক’শো বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে। ট্রেনে সে কি খাওয়ার বহর! কি নাই সেখানে, আল্লাহ! কিশোর’দা একলাই নানা খাবারের সঙ্গে বারোটা ডিম সিদ্ধ খেলেন! আমরা হা!

কোলকাতায় কোলকাতার ছবিতে গাইতে গিয়ে একসঙ্গে ছিলাম কয়েকদিন।কিশোর’দার মজা করে খাওয়া তখন আমি প্রথম দেখি।বিস্ময় আমার কাটেনা।পরে আমার হা করে থাকা দেখে বলতেন শোনো আমি শুধু খাইনা, ব্যায়াম ও করি নিয়মিত এবং প্রানায়াম আর রেয়াজও।এই খাবার এমনিতেই হজম হয়ে যায়।আমার বিস্ময় কাটে।

এতো হাসিখুশি মানুষটা, আমার কন্যা ফারিয়ার গায়ে হলুদে যখন লীনু ভাই,খুরশিদ আলম ভাই, রিজিয়া আপা আবিদা আপা, দিনাত মুন্নি, সুবীর’দা, বৌদি সবাই নাচছিলো তখন কিশোর’দা খুবই লজ্জা পেলেন। তাকে কেউ নাচের ভেতর নিতেই পারলো না!

আমার বাসায় এক রেকর্ডিং থেকে আরেক রেকর্ডিং-এর ফাঁকে একদিন এসেছিলেন আধাঘন্টা রেস্ট নিতে।আমি চট করে ফ্রেস মিক্সড ফ্রুটস চাট মসলা আর দই মিলিয়ে খেতে দেয়ায় খুব অবাক হলেন, বললেন আরেএএএএ এই ফলার তুমি কই থেকে শিখলে! এটা আমার মায়ের হাতের ফলার।তুমি জানো এটা কত উপকারী!

আমাদের কথা ছিলো বাচ্চাদের জন্য গান গাইবো।আমি বাচ্চার কন্ঠে।উনি বাবার কন্ঠে।পালটাপালটি ছড়া আরকি।

তা আর হলো কই!

আমাদের একজনই কিশোর’দা, আমরা তার সুস্থতার আশায় পথ চেয়ে বসেছিলাম চাতকের মতো। কিন্তু আমাদের ছেড়ে তিনি চলে গেলেন। আমি খুব চাইতাম তাকে আর আলাউদ্দিন আলী ভাইকে রান্না করে খাওয়াব! হলো না।কিছু কিছু ইচ্ছে এভাবে বাকি রয়ে যায়।

কতো কথা রয়ে যায় বাকি!তাকে নিয়ে লেখার কতকিছু আমার ভান্ডারে আছে কিন্তু আর পারছিনা। এই স্মৃতিকাতরতা থেকে বেরুতে হবে নাইলে আমি অসুস্থ হয়ে যাবো!

ছবি:লেখকের ফেইসবুক ও গুগল থেকে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]