বয়স যখন ষোল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

আবুল হাসনাৎ মিল্টন

স্মৃতির ব্যাপারে আমার নিজস্ব একটা সুত্র আছে। সব স্মৃতি আমি মনে রাখি না। অধিকাংশ স্মৃতি আমি স্বেচ্ছায় ভুলে গেছি। কিছু স্মৃতির ব্যাপারে আবার ব্যাপারটা ঠিক উল্টো, প্রবল অধিকারে রয়ে গেছে মনে। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে মনে হলো, আমার কি কখনো ষোল বছর বয়স ছিলো? নাকি এখনো আমি ষোল’র কোটায়ই আটকে আছি?

ষোল বছর বয়সে আবুল হাসনাৎ মিল্টন

সে বছর আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। পরীক্ষা শেষে দীর্ঘ ছুটিতে খুলনায় বাবা-মা’র সঙ্গে। অখণ্ড অবসর, কোন কাজ নেই। সারাদিন শুধু বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর আড্ডা। ততদিনে সহজ কিছু তাসের খেলা শিখে নিয়েছি, একেকদিন একেক বন্ধুর বাসায় আসর বসে। সন্ধ্যায় শহরময় ঘোরাঘুরি, এক ফাঁকে সোসাইটি সিনেমা হলের পাশে উমেশচন্দ্র লাইব্রেরীতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিন দু’টো করে বই নিয়ে আসি। রাত জেগে জেগে সেইসব বই পড়ি। এমনও হয়েছে আমি একরাতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দুটো উপন্যাস পড়ে ফেলেছি। ছুটির সময়ে দুই বাংলার কবি-লেখকদের প্রচুর বই পড়ে ফেললাম, সঙ্গে ছিলো মাঝেমধ্যে মাসুদ রানা আর কুয়াশা সিরিজের বই। বাবা-মা হঠাৎ করে যেন ‘শাসন করা’র ব্যাপারটা ভুলে গেছেন!

একই বছর জুন মাসে শুরু হলো ফুটবল বিশ্বকাপ, বাংলাদেশ টেলিভিশনের কল্যাণে রাত জেগে খেলা দেখি। এদিকে এসএসসির রেজাল্ট দেবার সময় হয়ে এলো। রেজাল্ট নিয়ে আমার চেয়ে আব্বার টেনশন বেশী। এই ভদ্রলোকের জন্যই সারাজীবন আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যত পড়াশুনা করা। সবসময় আব্বার একটাই কথা, ‘স্ট্যান্ড করতে পারবি তো?’ আমার মেঝো চাচাতো ভাই যশোর বোর্ডে কর্মরত তার এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে আমার প্রাপ্ত মার্কের খবর আনলেন, সেই সঙ্গে দিলেন ভয়াবহ এক দু:সংবাদ। ছয়টা লেটারসহ স্টার মার্কস পেলেও আমি স্ট্যান্ড করিনি। আব্বার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। সহজ-সরল নিরীহ এই মানুষটার মুখ জুড়ে রাজ্যের কালো মেঘ। রেজাল্ট নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই, শুধু আব্বার জন্য মনটা খারাপ হয়ে থাকলো।

সেদিন ছিল এগারোই জুলাই, রাতে বিশ্বকাপের ফাইনাল। সন্ধ্যায় সব বোর্ডের ফলাফল একযোগে প্রকাশিত হলো। রেজাল্ট জানতে ইকবালনগরে দৈনিক পূর্বাচল অফিসে গেলাম, অফিসের সামনে অনেক মানুষের ভীড়। ভীড় ঠেলে মূল ভবনের দরজায় গিয়ে শুনলাম, তাদের কাছে শুধু মেধা তালিকার নামগুলো আছে, পুরো রেজাল্ট নেই। আমি তো স্ট্যান্ড করিনি, তাহলে রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, পরেরদিন যদি পাই। বাসায় ফিরে আসবো, তবু কী মনে করে যেন এক টুকরো কাগজে কলেজের আর নিজের নাম, রোল লিখে একটা লোককে দিয়ে বললাম, ভাই একটু দেখেন তো। লোকটা ভিতরে গিয়ে কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বললেন, ‘আপনি সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বাদশ আর বিজ্ঞান বিভাগে দশম স্থান অধিকার করেছেন’ এবং মোট এত মার্ক পেয়েছেন। মার্ক আগে যা শুনেছিলাম তাই আছে, তবে স্ট্যান্ডের ব্যাপারে আগের খবরটা সঠিক ছিলো না। বাসায় ফিরে আব্বাকে রেজাল্টের কথা বললাম, আব্বা খুশী হয়ে মিষ্টি কিনতে গেলেন। আমার কেন জানি খুব মন খারাপ হয়েছিলো, বারবার কান্না পাচ্ছিলো। পরেরদিন বাসায় সাংবাদিক, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব আর অপরিচিত মানুষের ভীড়, আব্বা ক্লান্তিহীনভাবে সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন।

পারুর রেজাল্ট কী? আমি জানি না। অনেক বছর হয়ে গেলো ওরা চট্টগ্রাম চলে গেছে। ক্লাস থ্রিতে যখন আগাখান স্কুলে ভর্তি হই, তখন পারু ছিল ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল। পরের পরীক্ষাগুলোয় আমি প্রথম হওয়া শুরু করলাম, পারু দ্বিতীয়। রেজাল্টের দিনে আমি মনে মনে চাইতাম ও-ই ফার্স্ট হোক। রেজাল্ট পেয়ে পারুর মন খারাপ হতো।। এসএসসির রেজাল্টের পাঁচদিন পরে আমার ষোলতম জন্মদিন।আব্বা জানতে চাইলেন কী উপহার চাই। বললাম, সমুদ্র দেখতে কক্সবাজার যাবো। আব্বা রাজী হলেন, ডিসেম্বরের ছুটিতে তিনি যেতে দেবেন। আমার উদ্দেশ্য ছিলো চিটাগাং হয়ে কক্সবাজার যাওয়া। বন্ধু আমান আর ফিরোজকে নিয়ে ডিসেম্বরে কক্সবাজার গিয়েছিলাম, যাবার পথে চট্টগ্রামে আরেক বন্ধু সারোয়ারের বাসায় ছিলাম। পারু তখন চট্টগ্রামে থাকে। ওর বাসার ঠিকানা জানি না, শুধু জানি হালিশহরের কোথাও থাকে। একদিন সারা দুপুর আমি একা একা হালিশহরের অলিগলি হাঁটি। পারুর সঙ্গে আমার দেখা হয় না।

আমার কৈশোর কেটেছে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে। এসএসসির ছুটি শেষে কলেজে ফিরে গেছি, আমার তখন লম্বা চুল। আমার তখন উড়নচণ্ডি মন। যাবার পরের দিনই প্রিয় চুলগুলো কেটে ফেলা হলো। শুরু হলো ফের প্রাক-সামরিক জীবন। নিয়ম মেনে চলা, ভাল ছেলের তকমা লাগানো আমার ক্যাডেট জীবন। কেন জানি সিনিয়ররা খুব বেশী নির্যাতন করতেন না। দেখা গেলো হাউজের পুরো ক্লাসকেই শাস্তি দিচ্ছে, কোন এক অজ্ঞাত কারণে প্রায়ই আমার ভাগে শাস্তি একটু কমই পড়তো।

ততদিনে আমি কবিতা লেখা শুরু করেছি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাস,  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যয়, শামসুর রহমান, পাবলো নেরুদা, রবার্ট ফ্রস্ট, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুন, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদসহ আরো অনেক কবিদের কবিতা পড়ি। কলেজের লাইব্রেরীতে অসংখ্য বই, আমরা দল বেধে পড়ি, বই নিয়ে আলোচনা করি।আমাদের বাংলার শিক্ষক কবি রফিক নওশাদের প্রশ্রয়ে কবিতা তখন আমাদের কয়েকজনকে আপাদমস্তক পেয়ে বসেছে। সুনিলের কবিতার অনুকরণে বন্ধু মাহবুব আমাকে ডাকে ‘নিখিলেশ’ বলে, আমি ওকে ডাকি ‘মহিম’।

ছুটির দিনে বৃষ্টি হলে আমি হাউজের পেছনের বাগানে লুকিয়ে একাকী বৃষ্টিতে ভিজি। খুলনার বন্ধুদের মারফত খবর পাই পারু ঢাকার বদরুন্নেসা কলেজে ভর্তি হয়েছে, হোস্টেলে থাকে। ঢাকার বকশিবাজারে বন্ধু আশরাফদের বাসা। পারুর কাছে আমি চিঠি লিখি, আশরাফের বন্ধু শিবলি সেই চিঠি পারুর কাছে পৌছে দেয়। একদিন চিঠির জবাব আসে, সঙ্গে একটা ভিউকার্ড। কার্ডে একটা ঘোড়ার গাড়িতে পাশাপাশি বসে থাকা দুই কিশোর-কিশোরীর ছবি। সেই কার্ড নিয়ে বন্ধুরা গবেষণায় বসে, এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, ‘এ নির্ঘাত প্রেম’। আমার পারুর কথা খুব মনে পড়ে। বৃষ্টির পরে মাটির সোদা গন্ধে ওর জন্য বুকের ভেতরে তুমুল আলোড়ন জাগে।

একটা ঘোরের মধ্যে আমার জীবন কাটে। আমার ভেতরে আমি স্পষ্ট দুটো সত্ত্বার উপস্থিতি টের পাই। একটা সত্ত্বা ক্যাডেট কলেজে পিটি-প্যারেড করে, খাকি পোশাক পড়ে একাডেমিক ব্লকে পড়তে যায়, বিকেল হলে খেলে, সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসে হাই তোলে। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কোন কোন রাতে কলেজের পাচিল টপকায়। একদিন রাতে কলেজের সবাই যখন কলেজ অডিটোরিয়ামে সিনেমা দেখছিলো, আমি আর বন্ধু হাসান মিলে ঝিনেদায় বন্ধু মোস্তাফিজের বাসায় হাজির। আমাদের দেখে চাচা-চাচী আঁতকে উঠলেন, ভাবলেন টার্ণ আউট হলাম কি না। তাদের আশ্বস্ত করলাম, একগাদা নাস্তা এসে হাজির। শেষে মুড়ি-চানাচুর কেনার নাম করে চাচীর কাছ থেকে পঁচিশ টাকা নিয়ে বন্ধুদের জন্য কয়েক প্যাকেট কে-টু সিগ্রেট কিনলাম। ফেরার পথে কলেজের মেইন গেটের সামনে আসতেই দেখি, উল্টো দিক দিয়ে কলেজ বাসে পরের ব্যাচের ক্যাডেটরা ডে-ট্যুর শেষে ফিরছে। আমরা দ্রুত রিক্সার হুডের আড়ালে মুখ লুকোলাম। ধরা পড়লে সে রাতই হয়তো ক্যাডেট কলেজের শেষ রাত হতো।

আমার আরেক সত্ত্বা কবিতা লেখে, আপাদমস্তক সে কবি হতে চায়। পারু নামের এক কিশোরীকে সে ভালবাসে। শামুকের মত বাইরের শক্ত আবরণের ভেতরে লুকোনো কোমল এক জীবন তার। কোন এক পূর্ণিমার রাতে, ভরা জোছনায় তার আত্মহত্যার সাধ জাগে। পর্যাপ্ত সাহসের অভাব কিংবা মা-বাবার মুখ তাকে আত্মঘাতী হতে দেয় না। পারুর কথা ভেবে সে মাঝেমধ্যে কাঁদে। ষোল বছরের সেই অবুঝ কিশোর তখন জানতো না, ভালবাসা নয়, এ ছিল পারুর প্রতি তার অনির্ণীত এক পক্ষপাত।

সেই যে ষোলোর ঘোর, উত্তর পঞ্চাশে এসে আজো সেই ঘোর কাটেনি আমার!

ছবি: গুগল ও লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]