ভবিষ্যতে প্রত্যাবর্তন

সাগর চৌধুরী
লেখক, সাংবাদিক

বিশিষ্ট সাংবাদিক সাগর চৌধুরী। একদা কর্মরত ছিলেন বিবিসি’র বাংলা বিভাগে। তারও আগে কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকা এবং বার্তা সংস্থায়। একদা নানান কাজের ভিড়ে বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ইংরেজি সাবটাইটেল রচনার কাজও করেছেন। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালকদের সিনেমায় তিনি ছিলেন সাবটাইটেল লেখক। এখন এক ধরণের অবসর জীবন যাপন করছেন। বসবাস করেন কলকাতা শহরে। সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্ক বেশ কিছুটা মেরুদূর হলেও কলম থেমে যায়নি। বই লিখছেন, অনুবাদ করছেন। সাগর চৌধুরী জীবনকে দেখেছেন নানান কৌণিকে আলো ফেলে। দীর্ঘদিন বিলেতে ছিলেন। ঘুরেওবেড়িয়েছেন নানান দেশে। জীবনও তাকে দেখেছে খুব কাছে থেকে। সেই জীবনপ্রবাহের গল্প শোনাতেই প্রাণের বাংলার জন্য কলম ধরলেন সাগর চৌধুরী। প্রাণের বাংলার পাতায় এখন থেকে জীবনের গল্প বলবেন তিনি।

অতীতে, অর্থাৎ বিশ-পঁচিশ বছর আগেও, কলকাতায় যাঁরা নিয়মিত নাটক দেখতেন তাঁরা, এমনকি যাঁরা দেখতেন না তাঁদেরও অনেকে, জানেন যে ঐ সময়ে এই শহরে একাধিক পেশাদার নাট্যমঞ্চ ছিলো, যেমন স্টার থিয়েটার, রঙমহল, বিশ্বরূপা, রঙ্গনা, মিনার্ভা এবং আরো দু-একটা। এই মঞ্চগুলো সবই ছিলো উত্তর কলকাতায়, এক সময়ের কর্নওয়ালিস্ স্ট্রীট বা এখনকার বিধান সরণির ওপরে বা আশেপাশে। ঐ সময়ে দক্ষিণ কলকাতায় এই জাতীয় কোন পেশাদার মঞ্চ ছিলো না সম্ভবত। এখন অবশ্য হয়েছে কয়েকটা, তবে চরিত্রগতভাবে বহুলাংশে অন্য ধরনের। উত্তর কলকাতার মঞ্চগুলোর মধ্যে স্টার থিয়েটার এখনও আছে, তবে আগেকার চেহারায় নয়, খোলনলচে বদলে আধা-সিনেমাহল আধা-নাট্যমঞ্চের আদলে। সরকারী তত্বাবধানে পরিচালিত মিনার্ভাও আছে, অন্যগুলো আর নেই। প্রসঙ্গত, কিংবদন্তীপ্রতিম উৎপল দত্তের ‘লিটল্ থিয়েটার গ্রুপ’এর অধিকাংশ নাটক এক কালে পরিবেশিত হয়েছে এই মিনার্ভা মঞ্চে। এই পেশাদার মঞ্চগুলো আসলে ছিলো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, কোন ব্যক্তি বা সংস্থার মালিকানাধীন, পরিচালিত হতো আর পাঁচটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরই মতো লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে। প্রত্যেকটা মঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সকলেই হতেন পেশাদার, অর্থাৎ নাটক প্রযোজনা, পরিবেশনা, পরিচালনা ও অভিনয় করাই ছিলো এঁদের মুখ্য পেশা। অভিনয় করতেন জনপ্রিয় ও বিখ্যাত নটনটীরা, যাঁদের অনেকেই ছিলেন আবার চলচ্চিত্র জগতের উজ্জ্বল তারকা। দর্শকসাধারণের দ্বারা সমাদৃত সফল এক-একটা নাটক চলতো দীর্ঘদিন ধরে, অনেক সময় একাদিক্রমে দুই বা তিন বছরও। আজকাল কিন্তু কোনও নাটকই একটানা এত দিন ধরে চলে না, তবে কিছু নাটক অবশ্য প্রায়ই মঞ্চস্থ হয়।

পেশাদার তথা বাণিজ্যিক মঞ্চগুলোর পাশাপাশি ছিলো , ছিলো কেন বলছি, এখনও আছে , বেশ কিছু অ-পেশাদার, অ-বাণিজ্যিক নাট্যদল, যাদের চলতি নাম ‘গ্রুপ থিয়েটার’। নাটকে নিবেদিতপ্রাণ এইসব দল এক সময়ে টিঁকে থাকতো বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী অফিসের বা কোন ক্লাবের অনুষ্ঠানে ভাড়া খেটে, কদাচিৎ কখনো নাটক-পাগল সদস্যদের চাঁদায় কোন ছোটখাটো মঞ্চ ভাড়া করে যৎসামান্য দক্ষিণার বিনিময়ে দর্শকদের সামনে নাটক পরিবেশন করে। বাণিজ্যিক মঞ্চগুলোতে অভিনয় হতো সপ্তাহে তিন দিন, বৃহস্পতি, শনি ও রবিবার, অন্য দিনগুলোতে এইসব মঞ্চ অন্যরা ভাড়া করতে পারতো, তবে এদের ভাড়া গ্রুপ থিয়েটার করা দলগুলোর নাগালের বাইরেই থাকতো। আজকাল অবশ্য অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তার কারণ হলো পেশাদার বাণিজ্যিক নাট্যমঞ্চগুলোর অন্তর্ধান, ক্ষেত্রবিশেষে সরকারী দাক্ষিণ্যলাভের সুযোগ এবং নাট্যামোদী দর্শকসাধারণের সংখ্যার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি। নাটক দেখার দক্ষিণা আগের চেয়ে বেশ খানিকটা বাড়লেও বাজারে দ্রব্যমূল্যমান বৃদ্ধির তুলনায় তেমন কিছু নয়, অনেক ক্ষেত্রেই হালফ্যাশানের ক্যাফে-তে এক কাপ কফীর দামের চেয়ে কম। তবে এখন ছোট ও মাঝারি আকারের বেশ কিছু নাট্যমঞ্চ তৈরি হয়েছে, যার ফলে এইসব নাটকের দলের সুবিধা হয়েছে নিশ্চয়ই। পুরনো দু-তিনটি দল তো মঞ্চের মালিকও হতে পেরেছে, যেখানে তারা নিজেদের নাটক পরিবশেন করা ছাড়াও অন্য দলকেও সুযোগ দেয়।

একটা সময়ে, তা কম করেও তিন যুগেরও বেশি আগে তো বটেই, আমি নিজেও তখনকার একটা সুপরিচিত গ্রুপ থিয়েটার দলের সদস্য ছিলাম, দলের হয়ে অভিনয় করেছি বেশ কয়েকটা নাটকে। দর্শকদের অল্পবিস্তর প্রশংসাও পেয়েছি। গ্রুপ থিয়েটারে অভিনয়ই, সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে, আমাকে পৌঁছে দিয়েছিলো বাণিজ্যিক নাট্যমঞ্চের দোরগোড়ায়। একবার আমাদের দল এক অফিস ক্লাবের তরফে নাটক পরিবেশন করছিলো একটা নামকরা বাণিজ্যিক নাট্যমঞ্চে, সেই নাটকে আমিও ছিলাম। নাটক শেষ হওয়ার পর যখন আমরা সবাই তল্পিতল্পা গোছানোয় ব্যস্ত, তখন ঐ মঞ্চের একজন কর্মী এসে আমাকে বললেন যে তাঁদের কর্তা একবার আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। একটু অবাক হয়েই তাঁর সঙ্গে কর্তার ঘরে গেলাম। সে সময়ে কলকাতার নাট্যজগতে এই প্রবীণ মানুষটি ছিলেন এক সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আমাকে তাঁর সামনের চেয়ারে বসিয়ে তিনি বললেন, ‘শোনো, আমার স্টেজে এখন যে নাটকটা চলছে তাতে যে ছেলেটি নায়কের রোল করছে সে তো আবার সিনেমাও করে। তাকে বেশ কিছুদিনের জন্য কলকাতার বাইরে যেতে হবে আউটডোর শূটিং করতে। এদিকে আমার তো খুবই চালু নাটক, অতদিনের জন্য বন্ধ রাখা সম্ভব নয়, তাই একজন বদলি দরকার। আজ তোমার অভিনয় দেখলাম, মনে হচ্ছে তোমাকে দিয়ে হবে। রোলটা তুমি করে দাও, অন্তত সে ফিরে না আসা পর্যন্ত।’ ভেবে দেখলাম এই প্রস্তাবে আমার রাজি না হওয়ার কোন কারণ নেই, যদি আমার অন্যান্য নিয়মিত কাজকর্মে ব্যাঘাত না ঘটে। তাছাড়া ওঁর মতো একজন অভিজ্ঞ লোকের যখন মনে হয়েছে আমাকে দিয়ে হবে, তখন নিশ্চয়ই আমি পারবো। আমি সম্মতি জানাতে তিনি বললেন, ‘তাহলে কয়েকটা শো মন দিয়ে দেখো, তারপর রিহার্সালের ব্যবস্থা হবে।’ এভাবেই বাণিজ্যিক নাট্যমঞ্চের জগতে আমার প্রবেশ। ঐ নাটকটা চলেছিলো আরো বছর দেড়েক, সাবেক নায়ক কোন কারণে আবার যোগ দেয়নি, তাই আমিই অভিনয় করলাম অন্তিম রজনী পর্যন্ত। এর পরে ঐ মঞ্চের আরো দুটো নাটকে আমি নিয়মিত অভিনয় করেছিলাম দুই-আড়াই বছর ধরে, একাধিক বিখ্যাত ও জনপ্রিয় অভিনেতার পাশাপাশি।

এত বছর পরে এইসব অতীত স্মৃতি রোমন্থনের কারণ এবার খুলে বলি। দক্ষিণ কলকাতায় অনেক দিনের পুরনো একটা নাট্যমঞ্চ আছে, ‘মুক্ত অঙ্গন রঙ্গালয়’। প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে এটা তৈরি হয়েছিলো কয়েকজন নাট্যপ্রেমীর উদ্যোগেই, উদ্দেশ্য ছিলো আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল অ-বাণিজ্যিক দলগুলোকে নাটক পরিবেশনের সুযোগ করে দেওয়া। অত্যন্ত সাদামাটাভাবে তৈরি, সম্পূর্ণ বাহুল্যবর্জিত, চাকচিক্যবিহীন মঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহ, মাথার ওপর ছাদ ছাড়া চারদিক খোলা, অনেকটা যেন যাত্রার আসরের মতো পরিবেশ। ‘মুক্ত অঙ্গন’ নামটিও এই জন্যই। এই মঞ্চেই পরিবেশিত আমার গ্রুপ থিয়েটার দলের একটা নাটকে আমিও অভিনয় করেছিলাম, উত্তর কলকাতার ঐ বাণিজ্যিক মঞ্চে অভিনয়ের ফাঁকে। যতদূর মনে পড়ে, সেটা ছিলো কলকাতার কোন মঞ্চে আমার শেষ কয়েকটি অভিনয়ের মধ্যে একটি, কারণ কিছু দিন পরেই আমি বিদেশে চলে গিয়েছিলাম কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক তখনকার মতো ছেদ করে। কলকাতায় ফিরে আসার কয়েক বছর পরে, অতিমারীর প্রকোপে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত, প্রায় অচল হয়ে যাওয়ার আগে, এক সন্ধ্যায় আমি মুক্ত অঙ্গন রঙ্গালয়ে গিয়েছিলাম প্রায় সাড়ে-তিন দশকের মধ্যে প্রথমবার, অবশ্যই নাটক দেখতে। হাওড়ার এক নাট্যদলের পরিবেশিত, প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস থেকে চয়িত রূপকাশ্রিত কাহিনীনির্ভর নাটক। না, নাটকের বিবরণ দেওয়া বা পর্যালোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, আমি কেবল প্রকাশ করতে চাইছি রঙ্গমঞ্চের সামনে উপস্থিত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমার মানসিক প্রতিক্রিয়া। যে রাস্তায় এই রঙ্গমঞ্চ অবস্থিত তার ওপর দিয়ে আমি মাঝে মাঝেই যাতায়াত করি, তবে তেমন মন দিয়ে কিছু লক্ষ্য করি না। সেদিন চোখে পড়লো, অনেক কিছুই যেন পালটে গেছে, ঘরবাড়ি, দোকানপাট সবই নতুন, অচেনা, যেন এটা আমার পরিচিত রাস্তাটাই নয়। কিন্তু এই সমস্ত অপরিচিতের ভীড়ের মাঝে মুক্ত অঙ্গন রঙ্গালয় দাঁড়িয়ে আছে অবিকল তার সাবেক চেহারা নিয়ে। তার সামনের ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে এক অদ্ভূত স্মৃতিমেদুরতায় আমার মন আচ্ছন্ন হয়ে উঠলো। কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি সেই চল্লিশ বছর আগেকার অপ্রশস্ত মঞ্চ, তার পেছনে আর দু-পাশে ঝোলানো একই রকম কালো পর্দাঐ সন্ধ্যায় অবশ্য নাটকের দৃশ্যপট রচনার প্রয়োজনে অন্যান্য রঙের পর্দাও ঝোলানো আর মঞ্চের সামনের পর্দাটা এখনও আগের মতোই হাত দিয়ে দড়ি টেনে খোলার আর গোটানোর ব্যবস্থা। দর্শকদের বসার আসনগুলোও লোহা আর কাঠের তৈরি সাবেক ডিজাইনের ফোল্ডিং চেয়ার, আগের মতোই সামান্য নড়বড়ে। মাথার ওপর ঝুলছে কয়েকটা আদ্যিকালের সীলিং ফ্যান, যেগুলো ঘুরছে চল্লিশ বছর আগে যখন আমরা নাটক করতে বা দেখতে এখানে আসতাম তখনকার মতোই অনিচ্ছার সঙ্গে। আজকের নাটক শুরু হতে তখনও কয়েক মিনিট বাকি, দুজন-চারজন করে দর্শকের আগমন ঘটছে। সামনের সারির একটা চেয়ারে বসে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। এই মঞ্চেই তো কত নাটক দেখেছি এক কালে, তার ওপরে দাঁড়িয়ে এক সন্ধ্যায় অভিনয় করেছি আমি নিজেও। না, কোন তফাৎ নেই, সব কিছু আগে যেমন ছিলো তেমনি আছে। সময়ের সতত প্রবহমান ধারা মুক্ত অঙ্গন রঙ্গালয়ে ঢুকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box