ভবিষ্যতে প্রত্যাবর্তন

সাগর চৌধুরী
লেখক, সাংবাদিক

বিশিষ্ট সাংবাদিক সাগর চৌধুরী। একদা কর্মরত ছিলেন বিবিসি’র বাংলা বিভাগে। তারও আগে কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকা এবং বার্তা সংস্থায়। একদা নানান কাজের ভিড়ে বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ইংরেজি সাবটাইটেল রচনার কাজও করেছেন। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালকদের সিনেমায় তিনি ছিলেন সাবটাইটেল লেখক। এখন এক ধরণের অবসর জীবন যাপন করছেন। বসবাস করেন কলকাতা শহরে। সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্ক বেশ কিছুটা মেরুদূর হলেও কলম থেমে যায়নি। বই লিখছেন, অনুবাদ করছেন। সাগর চৌধুরী জীবনকে দেখেছেন নানান কৌণিকে আলো ফেলে। দীর্ঘদিন বিলেতে ছিলেন। ঘুরেও বেড়িয়েছেন নানান দেশে। জীবনও তাকে দেখেছে খুব কাছে থেকে। সেই জীবনপ্রবাহের গল্প শোনাতেই প্রাণের বাংলার জন্য কলম ধরলেন সাগর চৌধুরী। প্রাণের বাংলার পাতায় এখন থেকে জীবনের গল্প বলবেন তিনি।

পাঁচ

১৯৯৪ সাল। লন্ডন।
গৌরীপুরের ‘ছোট রাজকুমার’ প্রকৃতীশচন্দ্র বরুয়া, আমার ‘লালজীমামা’, এবং তাঁর প্রিয় হাতি প্রতাপের সঙ্গে আমার শৈশবের ঘনিষ্ঠতার পর কেটে গেছে প্রায় পাঁচ দশক। অনেক বছর ধরেই আমি গৌরীপুর থেকে অনেক দূরে, আর এখন তো কম করে দশ হাজার মাইল দূরে, বিলেতে।
আমার বিলেতযাত্রার উপলক্ষ বা কারণ ছিলো ‘বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস্’ নামক বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বেতারানুষ্ঠান সম্প্রচার সংস্থাটির একজন প্রযোজক-পরিবেশক হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পাওয়া। বিবিসি-তে যোগ দেওয়ার পর এত দিনে লন্ডনে আমার কেটে গেছে বছর সাত-আট তো বটেই। গৌরীপুরে আমার ছেলেবেলার দিনগুলির কথা এখন আর মনেই পড়ে না, পড়লেও কদাচিৎ, ভাসা ভাসা। বিবিসি’র মতো নামী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে ব্রিটেন ছাড়াও অন্যান্য দেশের একাধিক সাংবাদিক ও সমশ্রেণীর পেশার কিছু লোকজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, বন্ধুত্বও হয়েছে কারো কারো সঙ্গে। এছাড়াও আমার জীবনযাত্রায় আরো দু’একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে, যেমন সংসারী হয়ে বেশ গুছিয়ে বসেছি। এই সব কিছুর মধ্যে গৌরীপুরের আর জায়গা কোথায়?

মার্ক শ্যান্ড

তবে গৌরীপুর যে আমার জীবন থেকে একেবারে হারিয়ে যায়নি তা বুঝতে পারলাম হঠাৎই একদিন, বলা যায় কাকতালীয়ভাবেই। সাপ্তাহান্তিক একটা ছুটির দিনে সন্ধ্যার একটু পরে বাড়ির টেলিফোন বেজে উঠলো। রিসিভার তুলে সাড়া দিতে লাইনের অন্য প্রান্ত থেকে একটি গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, পরিশীলিত উচ্চারণে ইংরেজিতে কেউ একজন প্রশ্ন করলেন, ‘উইল ইট বি পসিবল্ টু স্পীক উইথ মিস্টার সাগর চৌধুরী? Ñ সাগর চৌধুরী মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলা কি সম্ভব হবে?’ উত্তরে বললাম, ‘ইউ আর স্পীকিং উইথ হিম Ñ আপনি তার সঙ্গেই কথা বলছেন।’ প্রশ্নকর্তা এবার বললেন, ‘শুভসন্ধ্যা। নিজের পরিচয় জানাই প্রথমে। আমার নাম মার্ক শ্যান্ড। আমি একজন লেখক এবং বিভিন্ন দেশের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ-সংক্রান্ত কিছু উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। আপনার নাম ও টেলিফোন নম্বর আমি সংগ্রহ করেছি বুশ হাউজ থেকে।’ (প্রসঙ্গত, বুশ হাউজ সে সময়ে ছিলো বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সদর দফ্তর, আমার কর্মস্থলও সেখানেই।) প্রত্যুত্তরে ‘শুভসন্ধ্যা’ জানিয়ে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বলুন, কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি ভারতের অসম রাজ্যের একটি বিশেষ এলাকার দু-একজন ব্যক্তির সম্পর্কে গবেষণা করছি, তাঁদের নিয়ে একটা বই লেখার পরিকল্পনাও রয়েছে আমার। এই কাজে আমাকে সাহায্য করতে পারবেন এমন একজন উপযুক্ত ব্যক্তির সন্ধান করছি আমি।

মূলতঃ প্রয়োজনীয় তথ্য সংকলন করার এবং যেমন দরকার ঐসব তথ্য বাংলা বা ঐ অঞ্চলের ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেওয়ার কাজ। পাশাপাশি বইটির সম্পাদনায় সহায়তা করার কাজও। তাই আমি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগাযোগ করেছিলাম এটা জানার জন্য যে এই কাজ করায় আগ্রহী হবেন এমন কোন ব্যক্তির হদিশ তাঁরা দিতে পারেন কিনা। যাঁদের সঙ্গে আমার কথা হলো, তাঁরা সবাই আপনার নাম উল্লেখ করে বললেন যে এই ধরনের কাজের জন্য আপনিই সবচেয়ে উপযুক্ত। অতএব আপনি রাজি থাকলে আমরা বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারি।’
মার্ক শ্যান্ড-এর প্রস্তাব আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয়ই মনে হলো। কাজটা করতে ভালোই লাগবে মনে হয়, লেখালিখির সঙ্গে জড়িত কাজ বরাবরই আমার পছন্দের। তবুও এক কথায় সম্মত না হয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে, বিশদে কথাবার্তা হোক আপনার সঙ্গে, তারপর স্থির করবো কাজটা করতে পারবো কিনা। তবে একটা কথা Ñ আমার নিয়মিত কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকেই আপনার কাজে সাহায্য করা সম্ভব হবে, বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই।’ মার্ক শ্যান্ড বললেন, ‘তাতে কোন সমস্যা হবে না। আমার সুনির্দিষ্ট কোন ডেডলাইন নেই এই গবেষণা এবং বইয়ের কাজ শেষ করার জন্য। আমার নিজেরও অন্যান্য কাজ আছে, তাই আমাদের কারোরই তাড়াহুড়ো করার কোন দরকার নেই।’ এরপর তিনি বললেন, ‘দু-এক দিনের মধ্যে যদি আমার অ্যাপার্টমেন্টে আসতে পারেন তাহলে সেখানে বসে আমরা সব কিছু নিয়ে আলোচনা করতে পারি।’ তাঁর ঠিকানা আমাকে দিয়ে দিলেন তিনি, দিন তিনেক পরের এক সন্ধ্যায় আমাদের সাক্ষাতের সময় স্থির হলো।

নির্ধারিত সন্ধ্যায় ও সময়ে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার এলাকায় মার্ক শ্যান্ড-এর অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংএ পৌঁছলাম। এলাকার পরিবেশ ও ঘরবাড়ির চেহারা থেকে বোঝা যাচ্ছিলো এটা প্রধানত উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজনের পাড়া। এই ধরনের এলাকার বর্ণনা দেওয়ার জন্য ইংরেজি ভাষার যে শব্দটি সাধারণত ব্যবহার করা হয় তা হলো ‘এক্সক্ল্যুসিভ’ (ঊীপষঁংরাব)। আমার উদ্দিষ্ট অ্যাপার্টমেন্টের দরজার ঘন্টি বাজাতে দরজা খুললেন মার্ক শ্যান্ড নিজেই। মজবুত গড়নের মধ্যবয়সী সম্ভ্রান্ত চেহারার একজন ইংরেজ ভদ্রলোক। আমার পরিচয় দেওয়ার পর তিনি সহাস্য সম্ভাষণের সঙ্গে আমাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে একটা সোফায় বসিয়ে প্রথম যে বাক্যটি বললেন তা হলো: ‘হাউ অ্যাবাউট আ ড্রিংক বিফোর উই বিগিন? Ñ আমরা কথাবার্তা শুরু করার আগে একপাত্র পানীয় কেমন হবে?’ এটা এমন একটা প্রশ্ন যার উত্তরে সচরাচর আমি ‘না’ বলি না। অতএব দু’জনেই পানপাত্র হাতে নিয়ে কাজের কথায় এলাম। এবং গোড়াতেই আমার জন্য অপেক্ষা করে ছিলো অপ্রত্যাশিত একটা চমক।
আমি বললাম, ‘মিস্টার শ্যান্ড, যে ব্যক্তিদের নিয়ে আপনি বই লেখার পরিকল্পনা করছেন, প্রথমে তাঁদের সম্পর্কে আমাকে কিছু বলবেন কি?’
‘বলছি। তার আগে আমার প্রস্তাব, আমরা পরস্পরকে সম্বোধন করার সময় ‘মিস্টার’ শব্দটা বাদ দিয়ে কেবল আমাদের প্রথম নাম ব্যবহার করি না কেন? এক সাথে মিলে কাজ করতে চলেছি আমরা, তাই ফর্মালিটী বাদ দেওয়াই যায়। কী বলো তুমি?’

তাঁর প্রস্তাবে সায় দেওয়ার পর মার্ক বললেন, ‘আমার দুই সাবজেক্টের একজনের নাম তুমি শুনে থাকতেও পারো Ñ তিনি হলেন অসমের গৌরীপুর এস্টেটের প্রিন্স প্রকৃতীশ চন্দ্র বরুয়া, অন্যজন তাঁর কন্যা পার্বতী বরুয়া।’
আমার প্রশ্নের এমন একটা উত্তর শোনার প্রত্যাশা আমার একেবারেই ছিলো না! বলাই বাহুল্য, আমি যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ফ্ল্যাবারগাস্টেড’! এ তো যেন সুদূর অতীতের একটা বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায় এক লহমায় চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার মতো। পার্বতী বরুয়াকে অবশ্য আমি দেখিনি কখনো, যদিও জানি তার কথা, কারণ তার জন্ম আমি গৌরীপুর ত্যাগ করার বেশ কয়েক বছর পরে। কিন্তু প্রকৃতীশ চন্দ্র বরুয়া Ñ লালজীমামা! তাঁর কথা এতগুলো বছরে সেভাবে মনে পড়েনি কখনো ঠিকই, কিন্তু তাঁকে ভুলবো কী করে? আমার মনের বিস্ময়বিমূঢ় ভাব নিশ্চয়ই আমার চোখেমুখে ফুটে উঠেছিলো, কারণ আমার দিকে তাকিয়ে মার্ক বিস্মিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হলো? হোয়াই ডু ইউ লুক সো শকড্ Ñ তোমাকে এমন বিহ্বল দেখাচ্ছে কেন? চোখের সামনে ভূত দেখলে নাকি Ñ আ গোস্ট?’
লম্বা একটা দম নিয়ে আমি কোনমতে বললাম, ‘হ্যাঁ, তাই দেখলাম বটে। ইংরেজি গোস্ট শব্দটাকে আমার মাতৃভাষায় যা বলে তার অর্থ অতীত। অতীতকেই চোখের সামনে দেখতে পেলাম।’

‘বলছি। শোনো ,
গৌরীপুরে শৈশবের কয়েকটা বছর কাটানোর, লালজীমামার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং আমার প্রতি তাঁর অভিভাবকতুল্য স¯েœহ ব্যবহারের বিস্তারিত বিবরণ দিলাম মার্ক শ্যান্ডকে। বললাম, ‘তুমিই বলো, কয়েক যুগ পরে এমন আকস্মিকভাবে সুদূর অতীতে ফেলে আসা ঐ দিনগুলিতে ফিরে যাওয়া, তাও আবার এমন একজন ব্যক্তির মাধ্যমে যার সঙ্গে আমার পরিচয় মাত্র কয়েক মিনিটের Ñ এটা কী কাউকে বিহ্বল করে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়? আমার ঐ বিস্মৃতপ্রায় অতীত জীবন আর এই মূহুর্তের বাস্তব জীবনের মধ্যে তুমিই সেতু হয়ে দাঁড়ালে, এই আশ্চর্য যোগাযোগকে কী বলবে?’
মার্ক গম্ভীরভাবে কেবল বললেন, ‘অ্যান ইনক্রেডিবল্ কোইনসিডেন্স Ñ একটি অবিশ্বাস্য সমাপতন। আসলে বাস্তব জীবনেই এমনটা ঘটতে পারে, কল্পকাহিনীতে নয়।’ (চলবে)


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box