ভালোবাসতে বাসতে ফতুর করে দেবো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্বরূপ সোহান (লেখক)

একটু দেখা——
ঝুম বৃষ্টি। ঘড়িতে বেলা দুইটা দশ। কলোনীর গেট দিয়ে হুড তোলা একটা রিক্সা ঢুকলো। বৃষ্টির এই দুপুরে শুনশান পুরো কলোনী। কোথাও কোন শব্দ নেই। শুধু বৃষ্টির একঘেয়ে সুর। ভিজে চুপচুপে রিক্সাওয়ালার কষ্ট হচ্ছে প্যাডেল চাপতে। কলোনীর সব কয়টা বাসার দরজা- জানালা বন্ধ। এতো বৃষ্টিতে কে ঘরের দুয়ার খুলে রাখে ? হঠাৎ একটা লাফ। পর্দাটা সরিয়ে হুড ফেলে চলন্ত রিক্সা থেকে ছেলেটা লাফ দিয়েছে। হতভম্ব রিক্সাওয়ালার কঠিন ব্রেক । চরম বৃষ্টিতে মুহূর্তেই ভিজে শেষ ছেলেটা। একটুও মন নেই তার সেদিকে। তার দৃষ্টি চারনম্বর বিল্ডিংয়ের তিনতলায়। জানালাটা স্বাভাবিক ভাবেই বন্ধ। স্থির চোখে তাকিয়ে আছে সে। ঐ জানালার ওপাশেই আছে তার প্রানভোমরা। কখন খুলবে জানলা? কখন সে দেখতে পাবে তার প্রানপাখিকে ? দেখা কি হবে আদৌ ?মেয়েটা কি জানালা খুলে মিষ্টি হাসিটা ছুড়ে দিবে তার দিকে? এটুকুই তো চায় ছেলেটা। খুব কি বেশী চাওয়া? ভালোবাসার মানুষটাকে একপলক দেখা, একটু চোখের ইশারা। এই তো, ব্যাস। কিন্তু মেয়েটা জানবে কিভাবে যে সে কাকভেজা হয়ে ঠায় দাড়িয়ে আছে মাঠের কোনায়। ল্যান্ডফোনটাও নষ্ট। কথা হয় না তাই গুনে গুনে চারদিন। মনটা আকুপাকু করছিলো অঝোর বর্ষার সকাল থেকে। মনের টেলিফোনে কথা হয়েছে নিশ্চয়ই। সেই আশাতেই তো ছেলেটার অপেক্ষা। এভাবেই কাটতে থাকে ক্ষণ। এক মিনিট, দুই মিনিট করে পাক্কা চল্লিশ মিনিট। দেখা নেই তবুও। মনের টেলিফোনের রিং যে বেজেই চলেছে। ধরছে না তো সে। টানা বৃষ্টিতে খোলা মাঠে দাড়িয়ে জানালায় তাকিয়ে ভিজে যাচ্ছে ছেলেটা। রিক্সাওয়ালা হুড তুলে রিক্সায় বসে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছেলেটার দিকে। ভাবছে, করে কি ছেলেটা? পাগল নাকি ?

 

একটু স্পর্শ—— সালাম সাহেব চরম বিরক্ত। সাত সকালে দোকানটা খুলতেই উপদ্রব। এলাকার রংবাজ রিপন ঢুকেছে তার ফার্মেসীতে। সকালটাই আজ কুফা দিয়ে শুরু। দিনটা যে কেমন যাবে কে জানে? – বড়ভাই, হাতে ব্যান্ডেজ করেন। – তোমার হাতে ব্যান্ডেজ করবো ক্যান, রিপন? কি হইছে হাতে? হাত তো ঠিকই আছে। – আপনারে কইছি ব্যান্ডেজ করতে, করেন। প্যাঁচাল পাড়েন ক্যান? – কিন্ত বলবা তো, ভালো হাতে ব্যান্ডেজ দিয়া কি করবা? রিপন হাসলো। আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে গলার স্বর নামিয়ে সালাম সাহেবের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো – ভাই, রিয়া একটু আগে রিক্সায় উঠার সময় আমার ডাইন হাতটা ধরছে।জীবনে প্রথম। – তাতে কি হইলো। – কি যে কন, সালাম ভাই। রিয়া হাতের স্পর্ষ লাইগা আছে এখনো। টাটকা। সাতদিন গোসল করুম না। আর ডাইন হাতটায় যে জায়গায় রিয়া হাত দিছে, সেখানে ব্যান্ডেজ কইরা রাখুম, কেউ যাতে ধরতে না পারে। দ্যান, হাতটা ভালো কইরা ব্যান্ডেজ কইরা দ্যান। সালাম সাহেবের চোয়াল ঝুলে গেছে। তব্দা খাওয়া মুখ দিয়ে তার একটা লাইনই বের হল – রিপন, তুমি কি পাগল ?

একটু আদর——
কতোদিন? – আমি কিভাবে বলবো, কতোদিন? – সেটাই, তুমি কিভাবে বলবা? – ঐটার হিসাব তো তুমি রাখো। – শান্ত বাড়ী গেছে আজ পনেরো দিন। বুঝো পনেরোটা দিন। ওর ফ্ল্যাটের চাবিটাও দিয়ে যায়নি শয়তানটা। – বলো কী, এতটা দিন হয়ে গেছে! তাই তো বলি ঘুম হয় না কেনো? – হবে কিভাবে, রিলিজ তো হতে হবে। – ছিঃ, অসভ্য, কিসব কথা। – আসো, আদর করি.. – তুমি কি পাগল হয়ে গোছো, এখানে এই পাবলিক প্লেসে? এই রেস্টুরেন্টে? – হুম, এখানেই। কেউ বুঝবে না যে আমি তোমাকে আদর করছি? – কি বলো আবোল-তাবোল। মাথা পুরাই গেছে তোমার – তোমার কাছে কাগজ কলম আছে? – কলম আছে, কাগজ নাই। – কলম থাকলেই হবে। কাগজের বদলে রেষ্টুরেন্টের টিস্যু আছে। – তোমার প্ল্যানটা কি বলো তো? – আমরা টিস্যুতে লাভমেক করবো। – হোয়াট? – ইয়েস। টিস্যুতে লিখে লিখে ভালোবাসা।এই যে আমি লিখলাম, আজ তোমার ব্রার রং গোলাপী। – শুধু তোমার জন্য- আমিও লিখে দিলাম। – এবার আমি লিখলাম, দাঁত দিয়ে ব্রা খোলা আমার পছন্দ। – আর আমার পছন্দ তোমার বুনো গন্ধ। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। দুইজন বসে মুখোমুখি। ক্রমেই শেষ হয়ে আসছে টিস্যু। ঘন হয়ে আসছে নিশ্বাস। এখনই মনে হয় হবে সেই চেনা বিস্ফোরণ। নাগরিক কোলাহলে সেই বিস্ফোরণ কেউ জানবে না। শুধু দুরে রিসিপশনে বসা রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঐ টেবিলটার দিকে। ভাবছে, ছেলেমেয়ে দুইটা কি পাগল?

একটু রাগ——
– যাই বলো, পুতুলটা কিন্তু অনেক সুন্দর। – হুম, তা তো হবেই। দশ হাজার টাকা দিয়ে কেনা দামী জিনিস সুন্দরই হয়। – শান্তার বাচ্চার প্রথম জন্মদিন। আমার কতো কাছের বন্ধু, বলো? ওর জন্মদিনে একটু দামী উপহার দেয়াই যায়। – শান্তা আবার তোমার কাছের বন্ধু নাকি? আমি তো জানতাম সে তোমার এক্স প্রেমিকার ঘনিষ্ট বান্ধবী। তোমার এক্স রীমা। – ফালতু কথা বইলো না। রীমা আমার স্রেফ বন্ধু। আমি, রীমা, শান্তা আমরা অনেক ভালো বন্ধু। আমাদের বন্ধুত্বের কতোটুকু জানো তুমি? – জানি জানি সবই জানি। বাই এনি চান্স, জন্মদিনের প্রোগ্রামে তো রীমা অবশ্যই আসবে। তুমি কেনো এতো এক্সাইটেড এখন বুঝছি। পুরান প্রেম মাথাচাড়া দিছে। – কি বলো তুমি। শান্তা আমাদের সব বন্ধুদের দাওয়াত দিয়েছে ওর বাচ্চার জন্মদিনে। সবাই আসবে। হ্যা, রীমাও আসতে পারে। -তাতে কি হলো। সে আমার শুধুই বন্ধু। – বুঝছি, বুঝছি। ঠিকই তো যাচ্ছো রীমার সংগে লাইন মারতে। – তুমি যে কি অসহ্য, তুমি বুঝো। – সত্যি কথা বলি তো, তাই আমি অসহ্য। – ধুর, যাবোই না তোমার সংগে। এই ড্রাইভার গাড়ী থামাও। বালের পুতুল আমার দরকার নাই। দিলাম ফালায় ময়লার ডাস্টবিনে। – আমার সংগে রাগ করে এতো দামী প্যাকেট করা পুতুলটা ডাস্টবিনে না ফেললেও পারতা? – তোমার ইচ্ছা হলে ময়লা থেকে তুলে বাসায় নিয়ে যাও। তোমার সংগে আমি আর নাই। ইনফ্যাক্ট আমি কোথাও নাই। শান্তার দাওয়াতেও যাবো না। থাকো তুমি। গাড়ী থেকে নেমে জোরে দরজায় লাথি দিয়ে হাঁটা শুরু করলো ছেলেটা। গাড়ীর ড্রাইভার শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ভাবলো, দশ হাজার টাকা দিয়ে কেনা পুতুলটা এভাবে ডাষ্টবিনে ফেলে দেয়া এই ব্যাটা কি পাগল? এসো পাগল, এসো ভালোবাসি
——— গল্পগুলো সত্যি ভাবলে, সত্যি, না ভাবলেও ক্ষতি নেই। তাতে পাগলের কিছু এসে যায় না। তবে ঘটনাগুলোর সময়কাল আশি আর নব্বইয়ের দশক। সময়টা পুরোনো হলেও পাগলের পাগলামি কিন্তু সবসময়ই নিত্য নতুন, অভিনব। সময়, কাল আর স্থান সব বিবেচনাতেই ভালোবাসার পাগলামিটা একই রয়ে যায়। এই অস্থির সময়ে অভাব নেই ভালোবাসা পাল্টানোর আয়োজনের। কিন্তু ভালোবাসার পাগলামিটা সারাতে পারেনি কোনো মনোবিদ। এখনো একটু দেখা, একটু আদরের জন্য কত পাগলামিই না করে মানুষ। ভালোবাসার মানুষ পাল্টে যায়, কিন্তু পাল্টায় না ভালোবাসার পাগলামী।

তাই বলতে ইচেছ করে, বেঁচে থাক ভালোবাসার পাগলামি।

এসো পাগল, এসো ভালোবাসি।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]