ভালোবাসার দুঃখ…

সুলতানা শিরীন সাজি

সুলতানা শিরীন সাজি

আমাদের এক বয়স ছিল,যখন ভালোবাসায় দুঃখ পেলে মনে হতো ,এই বুঝি জীবন থেমে গেলো।
কষ্ট ছেয়ে যাওয়া বুকের ভিতর দুঃখ বয়ে যেতো নদীর জলের মতন। মনে হতো, এই বুঝি শেষ।
তখন বন্ধুদের অনেকেই ভালোবাসার আনন্দটাকে ছোঁবার চেয়ে দুঃখটাকে ছুঁয়ে ফেলেছি বেশী।
আমি তখন বই এর পাতায় স্বপ্ন দেখি। আমি তখন কল্পনাতেই ঘুরে বেড়াই সেন্ট পিটার্স বার্গের তুষারিত পথে।
ঝুলানো ওভারকোর্টের পকেটে হাত দিয়ে। আমার দুঃখময়তার পরতে পরতে জমা হয় সাদা তুষারের মত ভালোলাগা। আমি আলতো করে ছুঁয়ে রাখি, যেনো গলে না যায়।
আমার ছোটবেলার পোষা বিড়াল মিনির মত ভীষন তুলতুলে সেই তুষারের কাছে জমা থাকে আমার ষোড়শী জীবনের একলাপনা।
আমার খুব প্রিয় এক মানুষ যে তার ভালোবাসার মানুষের জন্য ঘর ছেড়ে চলে গেছে বলে আমার উপর গঞ্জনার সীমা থাকেনা। আমি কিছু জানিনা,এই সত্যটা কেউ মানতে চায়না।
অভিমান এ এক এক সময় মনে হয় সত্যি চলে যাই পিটার্স বার্গ। ওখানে কফির দোকানে কাজ করি আর স্টেশনে দাঁড়িয়ে গীটার বাজিয়ে গান গাই। ইচ্ছা করতো অনেকদুর পথে হেঁটে যাই।যেখানে আমার সাথে থাক প্রিয় কিছু গান।
দুঃখ এভাবে অনেকবার মনকে ভেঙে দিতে চেয়েছে।
‘মন ভালো নেই ‘ কবিতার বইটা হাতে দিয়ে একবন্ধু বলেছে, মনে ভালো হোক। তারপর হেঁটে চলে গেছে। কেউ থাকেনা। শুধু স্মৃতি থাকে।

আমি বলি,ভালো বন্ধু হলো বাতাসের মত। দম আটকে আসলে বাঁচতে শেখায়।
বলে, বাঁচো।পাশে আছি। সেই বন্ধুতাকে দেখা যায়না। ছোঁয়া যায়না ,শুধু অনুভব করা যায়।

মনে ভালো থাকাটা যে যার যার নিজস্বতায় তৈরী হয়,সেকথা বুঝতে বুঝতে আরো অনেকদিন চলে গেছে।
ওয়ার্ল্ড মিউজিক এ গান শুনতাম যখন। হোস্টেলে সব বন্ধুরা গোল হয়ে বসে থাকতাম। ভাইজানের দেয়া ছোট্ট “Sanyo cassette player” টা তখন আমাদের বন্ধুর মতন সুখে দুঃখে সাথে।
বাংলা গানের জন্য ছুটতাম গীতালী। যে যার ভালোলাগার লিস্ট বানিয়ে আনতাম গানের ক্যাসেট। ইংরেজী গানের প্রতি অনুরাগ তৈরী হলো সেই সময়।
সেইসব দিনের শিল্পীরা হলো, Lionel richie , George Michael,Laura Branigan, Phil Collins
জর্জ মাইকেল এর Careless Whisper শুনতে শুনতে বিভোর হতাম। বারবার করে শুনতাম এই গান।
শুধু ভাবতাম এত সুন্দর গানের কথা কি করে লেখে মানুষ। অদ্ভুত লাগতো এই কয়েকটা লাইন…

Time can never mend
The careless whispers of a good friend
To the heart and mindnir_dec_5-2
Ignorance is kind
There’s no comfort in the truth
Pain is all you’ll find
দুই যুগ আগে নর্থ আমেরিকায় এসে প্রথম দিকে শপিং মলের মধ্যে ঘোরার সময় Last Christmas শুনে কেমন এক ঘো্রের মত লাগতো। মনে হতো আমি হোস্টেলের সেই সময়টাতে চলে গেছি, আমার রুমমেটরা, আমার বন্ধুরা মিলে সেই গানশোনা সময়ের কাছ এ পৌছে যেতাম লহমায়।
সেই ক্রেজ।
সেই George Michael !
এবারো যে কয়েকদিন শপিং এ গেছি, এই গান শুনেছি। গুনগুন করে ঘুরেছি। jingle bells গুনগুন করেছি।
ভাবনার অতল থেকে আরো ভাবনায় ভেসে বেড়াতে বেড়াতে মনে হয়েছে ,এই যে সময় চলে যায়, গেছে।
সবটুকু কি আর যাওয়া!
কত কিছু রেখে যায় সময়! কত সুরভীত স্মৃতিময় দিন।
কত ছোট্ট অথচ কত মধুরতম দিন।

Last Christmas, I gave you my heart
But the very next day, you gave it away
This year, to save me from tears
I’ll give it to someone special (special)
এত অভিমান। এমন সুন্দর করে কে বলিতে পারে আর?
গান যে গায় আর গান যে লেখে ,কার দাবী গানের উপর বেশি?
আমার তো মনে হয় শ্রোতাদের। তারা যতবার একটা গান শোনেন। সেই সেই গানের গীতিকার বা শিল্পী ততবার সেই গান শোনেন না।

আজ সকালে চোখ খুলতেই পাশে মানুষ জানালো, George Michael চলে গেছে ।ভীষন মন খারাপ তার।
আমি শুধু ভাবলাম কতদিন তো জানিনি ,তিনি কেমন আছেন ,কোথায় আছেন……
এমন গানের জনক, গায়ক আর কোথায় কতদুরে যাবেন……………!
আছেন তো। অনেকবছর ধরেই। হৃদয়ে আছেন। থাকবেন।
এই ভাবনাটুকু আমার দম আটকে আসা আমাকে স্বস্তি দিল। মানুষের নিজের চেয়ে আপনার কোন বন্ধু কি আর আছে?

ভালো থাকেন George Michael
শান্তিতে ঘুমান।
চোখের কান্না মুছে।
আপনার হৃদয়টাকে তাঁকে দিয়েই( special)
যিঁনি একমাত্র তার যত্ন করেন!

ভালোবাসার দুঃখ এভাবেই পথে পথে জমা হতে থাকে।
মানুষ আমরা প্রকৃতির থেকে এসে আবার প্রকৃতিতেই বিলীন হয়ে যাই। এই পরিক্রমা থেকে কারো পালানোর পথ নেই।
আমরা বাঁচি।যতটুকু সম্ভব ভালোতে পারি যেনো ততটুকুতেই বাঁচি।

ছবি : ইন্টারনেট