ভালোবাসার মানুষরা সব দ্রুত চলে যাচ্ছে..

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

স্বরূপ সোহান (লেখক)

-আরে তোমরা?

-কেমন আছেন মিতা ভাবী? এতক্ষন মঞ্চের সামনে দাড়িয়ে আমরা আপনার গান শুনছিলাম। কি যে ভালো লাগছিলো!

– তাই ? এবার কিন্তু অনেক মানুষ। দেখো তাকিয়ে, চারদিকে কতো মানুষ।

– সেটাই ভাবী। আমি আর টিনা তো সেই ভোর থেকেই আছি। যতো বেলা হচ্ছে ততো মানুষ বাড়ছে।

– রমনা বটমূলে ছায়ানটের এই অনুষ্ঠানের জন্যে তো সারা বছর মানুষ অপেক্ষা করে। পহেলা বৈশাখের আনন্দের শুরুটাই তো এখানে।

কথাটা শেষও হয়নি। খুব সাধারন একটা শব্দ হলো। মনে হলো যেনো ট্রান্সফরমার বার্স্ট হলো। তেমন কিছুই বোধহয় না। আমরা তখনো স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়িয়ে।রমনা বটমূলের মঞ্চের ঠিক পিছনে সব শিল্পীদের সংগে আমি, টিনা আর বরেন্য শিল্পী মিতা হক। শব্দটা হওয়ার পরও আমরা তিনজন স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়ানো। তবে হালকা একটা হুড়োহুড়ি মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করলাম। সেটা মনে হলো সেকেন্ডেরও কম সময়। এর মধ্যেই একইরকম আরো একটা শব্দ হলো। আমি টিনার হাত ধরলাম। মিতা ভাবীর সঙ্গের ছায়ানটের সব শিল্পীরা ততোক্ষনে মঞ্চের পেছনে আমাদের ঘিরে ফেলেছে। মিতা ভাবী আমাকে আর টিনাকে শুধু বললেন,

– স্বরূপ, টিনা তোমরা ঐদিকের গেট দিয়ে বেড়িয়ে যাও, কিছু একটা মনে হয় হয়েছে। বুঝতে পারছি না। আমাকে নিয়ে ভেবো না, দৌড়াও।

এটাই ছিলো সেদিন মিতা হকের সংগে শেষ কথা। আমি শুধু দেখলাম আমার সামনে দাঁড়ানো দুইটা ছেলের সাদা পান্জাবী লাল রক্তে ভিজে গেছে। মানুষ শুধু দৌড়াচ্ছে। ছায়ানটের মঞ্চের পেছনে যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে, মানুষ পাগলের মতো সেদিকেই ছুটে আসছে। মানুষের স্রোত দেখে আমার প্রচন্ড ভয় লাগলো। কি করবো, কই যাবো কিছু না বুঝেই টিনার হাত ধরে নি:শ্বাস বন্ধ করে দৌড়ানো শুরু করলাম। আমি আমার জীবনে কোনোদিন এতো জোড়ে দৌড়াইনি। আমি নিজেও জানি না টিনা আমার সংগে দৌড়াতে পারছে কিনা। নিশ্চয়ই পারছে। কারন আমি ওর হাতটা ছাড়িনি। কতক্ষন দৌড়েছি মনে নেই। যখন হুঁশ ফিরলো তখন দেখলাম আমরা রমনার গেটের বাইরে। আমার পাঞ্জাবী ঘামে ভেজা, আর টিনা ক্লান্ত হয়ে রাস্তাতেই বসে পড়েছে। মৎস্য ভবনের সামনের রাস্তায় তখনো মানুষ দৌড়াচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে, ‘রমনা বটমূলে বোমা মারছে, বোমা।’

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল সেই বিভীষিকাময় পহেলা বৈশাখ আমি আজো ভুলিনি। চোখের সামনে এখনো ভেসে ওঠে সেই রক্তাক্ত সাদা রংয়ের দুই পাঞ্জাবী। সেটাই আমার শেষ রমনায় যাওয়া। এরপর গত ২০ বছরে আমি একদিনও যাইনি বটমূলে। মানসিক আঘাত থেকেই হয়তোবা।

আজ সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর খুব মনে পড়ছে সেই সকালটার কথা। এতদিন মনে পড়লেও এতটা কাতর বোধহয় হইনি গত বিশটা বছর। তিনদিন হলো মিতা হক নেই। তাঁর নিস্প্রান মুখটা যখন দেখছিলাম, তখনই মনে পড়ছিলো তার সেদিনের সেই উদ্বেগমিশ্রিত ভালোবাসায় মেশানো সেই শব্দ,’ স্বরূপ, দৌড়াও।’

ভালোবাসা আর মমতা দেয়ার মানুষরা খুব দ্রুত আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box