ভালোবাসার সে দ্বীপ …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

১৯৯২ সালের প্রথম দিকের কথা। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়াচ্ছি তখন। থাকি ওয়াশিংটনে। প্রধান অতিথি হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসছি। ট্যাক্সি করে পূর্বী নদীর পাড় ধরে বিমান বন্দর থেকে শহরের দিকে আসতে আসতে তাকালাম বাঁ দিকে। আর তখনই চোখ গেল পূর্বী নদীর মাঝে ছোট দ্বীপটির দিকে। সবুজ গাছ-পালা ঘেরা নানান ঘর-বাড়ীর মায়াময় এ দ্বীপটি দেখে বড় ভালো লাগলো। ট্যাক্সিচালক জানালেন, দ্বীপটির নাম রুজভেল্ট দ্বীপ।

সে ঘটনার মাস ছ’য়েক পরেই ঐ দ্বীপের বাসিন্দা হলাম আমরা। জাতিসংঘের চাকুরী নিয়ে নিউইয়র্কে এলাম। ছেড়ে এলাম আমাদের স্বপ্নের শহর ঢাকা আর আমার অতি প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা ছাড়ার আগেই খোঁজ-খবর শুরু করেছিলাম কন্যাদ্বয়ের বিদ্যালয় আর আমাদের আবাসন বিষয়ে। আগে থেকেই জানতাম যে, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তরে আমার সহকর্মী হবেন ড: সরস্বতী মেনন ( তুখোড় ভারতীয় কূটনীতিক ও পরবর্তী সময়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রী শিবশঙ্কর মেননের ভগ্নী)। সারাসকে (সরস্বতী মেননকে) বন্ধুরা তাই বলে ডাকতো) লেখা হলো। সারাস লিখে পাঠালেন জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক স্কুলের কথা (যেখানে তাঁদের পুত্রকন্যা উদেয় ও অরুণাও যায়)। আবাসন প্রসঙ্গে তিনি জানালেন রুজভেল্ট দ্বীপের কথা – ম্যানহ্যাটেন আর কুইন্সের মধ্যে ছোট্ট একটি দ্বীপ।

সারাস বললেন যে, তাঁরাও ঐ দ্বীপে আছেন ৩ বছর ধরে এবং জাতিসংঘের বহু কর্মকর্তা ওখানে থাকেন – আসলে দ্বীপটি অনেকটা কূটনৈতিক পল্লীর মতোই। ঐ দ্বীপে পাতাল রেলের স্টেশন আছে, বাস যায় কুইন্সের দিক থেকে, গাড়ীও ঐ দ্বীপে ঢোকে। এবং রুজভেল্ট দ্বীপে যাওয়ার একটি অনন্য বাহন হচ্ছে আকাশ পথের দুলুনী বাহন (অনেকটা স্কি কেন্দ্রের উচ্চতর পাটাতনে ওঠার দুলুনী বাহনের মতো)। মিনিট তিনেক লাগে পূর্বী নদী পার হয়ে ম্যানহ্যাটনে নামতে।পুরো যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক ভাবে এমন দুলুনী বাহন এই একটিই।

এ সব প্রয়োজনীয় সংবাদ জোগাড় করে, বাঁধা-ছাঁদা শেষ করে, সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকা ছাড়লাম।এক শেষ বিকেলের আলোয় পৌঁছুনো গেলো নিউইয়র্কে। আগেই নির্ধারিত ছিলো যে আমরা এসেই জাতিসংঘের কাছে মাসুদ আর সোমার ওখানে উঠবো।মাসুদ (বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ-বিন-মোমেন) ও সোমা দু’জনেই আমার খুব প্রিয় আর আপনজন -আশির দশকে তাঁরা দু’জনেই আমার শিক্ষার্থী ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে।

মাসুদের বাবা প্রফেসর এম.এ. মোমেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যান ও গবেষণা ইনস্টিউটে অধ্যাপনা করতেন। তাঁর সঙ্গে ভালো পরিচয় ছিলো আমার। পরিচয় ছিলো তাঁর পিতৃব্য হাসনাত আবদুল হাইয়ের সঙ্গেও। সোমার বাবা লুৎফুল মতিন সাহেবকেও আমি চিনতাম। তাঁদের সাত মসজিদ রোডের বাড়ীতে আমি কয়েকবার গিয়েছি।

বেনুও খুব স্নেহ করতো মাসুদ এবং সোমাকে। সোমা বেনুকে খুব পছন্দ করতো – ‘বেনু আপা’ বলে ডাকতো ওকে। আমার কন্যাদ্বয় ‘অপু’ (মাসুদের ডাক নাম) ভাই বলতে পাগল ছিলো। বহুদিন আমার কাজের ব্যস্ততা থাকলে মাসুদ তাদের দু’জনকে উদয়ন বিদ্যালয় থেকে তুলে আমাদের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে। ওরা থাকতো আমাদের বাসার কাছাকাছি।

সুতরাং মাসুদ-সোমার ওখানে ক’দিনের জন্যে ওঠার ব্যাপারে আমাদের কোন দ্বিধা ছিলো না। ওরাও উদগ্রীব ছিলো অনেকদিন পরে আমাদের দেখার জন্যে। মাসুদ তখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্হায়ী মিশনে কর্মরত। আর সোমা তাঁদের দুই শিশুসন্তানকে – ফাহরীন আর আবীর – সামলাচ্ছে।

সেই শেষ বিকেলে আমাদের দু’টো ট্যাক্সি যখন সোমা-মাসুদের বাড়ীর সামনে থামলো, তখনো আমরা কিন্তু জানি না যে মাসুদের মা-বাবা ওদের ওখানে বেড়াতে এসেছেন। মাসুদ আমাদের কিছুই জানায় নি, যদি আমরা ওখানে উঠতে দ্বিধা করি। বাড়ীতে ঢুকে আমরা অবাক ও বিব্রত হলাম। কিন্তু সব কিছু ভেসে গেল ওদের আন্তরিকতা আর সহাস্য স্বাগতে। মাসুদের মা-বাবা একটি শয়ন কক্ষে থাকলেন, অন্য শয়নকক্ষটি ছেড়ে দেয়া হলো দু’বাচ্চা নিয়ে আমাদের জন্যে। বসার ঘরে মেঝেতে ঢালা বিছানা পেতে জায়গা হলো সোমাদের চারজনার।

পরের ক’দিন যে কি মজা করে সবার হাসি-ঠাট্টা আর গল্প-গুজবে কেটে গেলো, টেরই পেলাম না। ঐ ক’দিনের কথা কখনও ভুলবো না, ভুলি নি আজো মাসুদ-সোমার সেই আন্তরিক আতিথেয়তার। সেই সঙ্গে পরম মমতায় স্মরণ করি মাসুদের প্রয়াত মা-বাবাকে।

ঐ বাড়ীতে থাকতে থাকতেই বেনু আমাদের কন্যাদের নিয়ে রুজভেল্ট দ্বীপ ঘুরে এলো এবং একটা বাড়ীও পছন্দ করে এলো। দু’দিন পরে সবাই মিলে যাওয়া হলো সেখানে। সেই প্রথম আমার দুলুনী বাহনে ওঠা। বাড়ীটি দেখে খুব পছন্দ হলো। পূর্বী নদীর পাড় ঘেঁসে বিশ তলার ওপরে চার দিক খোলা বাড়ী। নদীর বহুদূর এবং ম্যানহ্যাটেনের হর্ম্যরাজির আকাশ রেখা থেকে শুরু করে, একাধিক সেতু, কুইন্সের বাড়ী-ঘর সবই দেখা যায়। তিনটি শয়নকক্ষ, খাবার ঘর, বসার ঘর নিয়ে বড় সুন্দর আবাস। আমাদের আগে ঐ বাড়ীতে ছিলেন দক্ষিন আফ্রিকায় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি ডেভিড ওয়ালী।

তারপর কোন এক সন্ধ্যায় মাসুদ-সোমার বাড়ীর সবার কাছে বিদায় নিয়ে যাত্রা করলাম আমাদের নতুন বাড়ীর পথে। আমাদের আসবাব-পত্র তখনও এসে পৌঁছুয় নি ঢাকা থেকে। সোমা তোষক-বালিশ থেকে শুরু করে কিছু বাসন পত্র দিয়ে দিলে সাময়িকভাবে কাজ চালানোর জন্যে। মাসুদ নিজে এসে সব গোছাতে সাহায্য করলো। ক’দিন পরেই ঢাকা থেকে এসে গেলো বেতের তৈরী আমাদের সব আসবাবপত্র – খাট, সোফা, টেবিল থেকে শুরু করে টেবিল বাতি আর দুলুনী চেয়ার পর্যন্ত। একটি বেতের কক্ষ-বিভাজকও ছিলো। ফলে ঘরে বেতের জিনিসপত্র ভিন্ন আর কিছুই ছিলো না। মনে আছে গ্রীন রোডের জালালাবাদ কেইন থেকে নমুনা দেখে সব বানানো হয়েছিলো।

রুজভেল্ট দ্বীপের প্রথম রাতে আমরা কেউ ঘুমাতে পারলাম না – শুধু নতুন জায়গা বলে নয়, চারদিকে যখন বাতি জ্বলে উঠলো, তখন মনে হলো, এক স্বর্গরাজ্যে আছি। যাঁরাই আমাদের এ বাড়ীতে রাতে থেকেছেন – অধ্যাপক অমর্ত্য সেন থেকে অধ্যাপক মুশাররফ হোসেন, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী থেকে রামেন্দু মজুমদার – সবাইকে রাতের আলো মোহিত করেছে।

আসার পরের দিন দ্বীপ ভ্রমনে বেরুনো গেলো – এক মাথা থেকে অন্য মাথায়। দ্বীপের উত্তর মাথায় দেখা মিললো ভারী সুন্দর কিন্তু বর্তমানে অব্যবহার্য পুরোনো ষোড়শ শতাব্দীর এক বাতিঘরের – পূর্বীনদীর বাতিঘর। সেদিন থেকে পূর্বীনদীর বাতিঘরের সেই দ্বীপে শুরু হয়ে গেলো আমাদের নতুন জীবন – আমাদের আগামী ২৬ বছরের জীবন।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box