ভালো থাকুন ফরীদি ভাই …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাওসার চৌধুরি

ফরীদি ভাইকে নিয়ে লিখতে গেলে মহাকাব্য রচনা সম্ভব।
কিন্তু, সেই যোগ্য লেখকটি আমি নই!
সুতরাং ওপথে যাবোনা!

ফ্যানদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন

উনার সময়ের একজন নাট্যকর্মীও পাওয়া যাবেনা যার সঙ্গে ফরীদি ভাইয়ের সরাসরি যোগাযোগ ছিলোনা! সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যেই হোন না কেন, তিনি বা তারা অবশ্যই ফরীদি ভাইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে!

অদ্ভূত একজন মানুষ ছিলেন ফরীদি ভাই।
কোন বাধা নেই, ‘ফুটানি’ নেই, নাট্যকর্মী হলেই হলো- কাছে টেনে নিয়েছেন পরম আন্তরিকতায়।
উনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা টিএসসিতে ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি।
আমি তখনো নাগরিকে আসিনি। সোলায়মান ভাইয়ের সঙ্গে পদাতিক নাট্য সংসদে ‘তিন রোস্তমের গপপো’তে অভিনয় করছি। নাগরিকে এলাম ১৯৮৫ সালে।

সোলায়মান ভাইয়ের সঙ্গে ফরীদি ভাইয়ের বেশ খাতির ছিল। সেই সুত্রে একদিন বিকেলে ফরীদি ভাই এসে হাজির হলেন টিএসসির রিহার্সাল রুমে, সঙ্গে মিনু আপা। উনারা দু’জনই তখন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। ফরীদি ভাই আর মিনু আপা ঢাকা থিয়েটারের সদস্য সেই সময়ে। ওই সময়ে ফরীদি ভাই শকুন্তলা নাটকে ‘তক্ষকে’র ভূমিকায় অভিনয় করে মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন!

আফজাল ভাই, আসাদ ভাইয়েরা ততোদিনে টিভি-তারকা!
ফরীদি ভাই পর্দা ফাটালেন ‘৮০ কি ‘৮১ সালের দিকে। প্রয়াত নাট্যগুরু সেলিম আল দীনের রচনায় ‘আয়না’ সিরিজের ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ পর্বে। ওই নাটকে সেরাজ তালুকদারের ভূমিকায় ফরীদি ভাইয়ের অভিনয়ের কথা কেউ কোনদিন ভুলতে পারবেন কিনা সন্দেহ (যারা দেখেছেন)! নাটকটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রযোজনা করেছেলেন ঢাকা থিয়েটারের কর্ণধার নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। বাচ্চুভাই তখন অনেক তরুণ। দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছিলেন মঞ্চ আর টিভি দু’টোই!

‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’র পরে ফরীদি ভাইকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি!

সংশপ্তক নাটকের দৃশ্যে

তরতর করে উঠে গিয়েছেন সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে!

অবশ্য এর আগে ‘দূরবীণ দিয়ে দেখুন’ নাটকে উনার অভিনয়ে টনক নড়েছিল পুরো নাট্যাঙ্গনের (আমি যদি ভুল না বলে থাকি)! মঞ্চ নাটক এবং টিভি নাটকে একের পর এক নব-ধারার এবং নিজস্বধারার অভিনয় দিয়ে ফরীদি ভাই তখন সমৃদ্ধ করেছেন দেশের নাট্যাঙ্গন!

মঞ্চে- মুনতাসির ফ্যান্টাসি, শকুন্তলা, কীত্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, ধুর্ত উই, …………আরো অনেক অনেক নাটকে অভিনয় করে তাক লাগিয়েছেন তিনি। টিভিতে সংশপ্তক, কোথাও কেউ নেই, অযাত্রা, দূরবীণ দিয়ে দেখুন, সাত আসমানের সিঁড়ি, বকুলপূর কতদূর, চানমিয়ার নেগেটিভ পজেটিভ, একদিন হঠাৎ, সমুদ্রে গাংচিল, দুই ভূবনের দুই বাসিন্দা’সহ আরো অনেক নাটকের অভিনয় এখনো দর্শকের মনে গেঁথে আছে!

অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
যে ক’টা ছবির নাম আমার মনে আছে তার মধ্যে- স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি হুলিয়া, পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি- দহন, জয়যাত্রা, একাত্তরের যীশু, ব্যাচেলর, শ্যামল ছায়া, আহা, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি ইত্যাদি।

ফরীদি ভাইয়ের চরিত্রে যে ব্যাপারটি আমাকে সবসময়ের জন্য মুগ্ধ করে রেখেছে তা হল ‘মানবিকতা’। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অ-সাধারণ! ‘সাধারণ’ মানুষের তুলনায় তাঁর মানবিক গুণাবলীর পরিমান ছিলো দেখবার মত। তার উপরে ফরীদি ভাই ছিলেন ‘জাত-অভিনেতা’! মানুষ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলেই পৃথিবীর যে কোন কাজে একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত অবশ্যই পৌঁছু্তে পারে। কিন্তু হুমায়ূন ফরীদির মত ‘অভিনেতা’ ‘চেষ্টা করে’ হওয়া যায়না; ‘ফরীদি’ হয়ে জন্মাতে হয়।

আমরা ‘ফরীদি’-মাপের একজন ‘হুমায়ূন ফরীদি’কে অকালে হারালাম।
এটা আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি।

ফরীদি ভাই, আপনি যেখানেই থাকুন যেভাবেই থাকুন- ভালো থাকুন শান্তিতে থাকুন।
আপনার চিরকালের অভ্যাসের মত হা হা, হো হো করতে করতেই মহাকালের ক্ষণ গণনা করতে থাকুন। ভাবনা নেই, আমরা আসবো কিছুকাল পরে। আপনার সাথীদের সবাইকেই সাথে পাবেন।

শুভ জন্মদিন, হে মহান শিল্পী।
শুভেচ্ছা হে মহাত্মন!

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]