ভালো থেকো,সিঊড়ী

দেবপ্রিয়া রায়

দেবপ্রিয়া রায়

আশ্চর্য ভাবে পৃথিবীর সমস্ত বড়ো-ছোটো-মেজ শহরেরই একটা একেবারে নিজস্ব ঘ্রাণ থাকে,যা অনেকখানি আমাদের মায়ের গায়ের ‘মা মা’ গন্ধের মতোই…বাকী সব কিছুর থেকে আলাদা! যারা দূরে চলে যা্য নিজের শহর ছেড়ে,তারা বাড়ী ফিরলে বুকের ট্রাঙ্কে ভরে নেয় সেই ঘ্রাণ…এক্কেবারে অজানা নতুন একটা শহরের ধোঁয়াশায় টিকে থাকার অক্সিজেন! আমার শহরের নাম অমুক,একবাক্যে বলে উঠতে আমার জিভ হোঁচট খায়…! যে শহরে পা মেপে নিজেদের ভালোবাসার বৃত্তচাপ এঁকেছিল আমার বাবা-মা,সে শহর সবসময় আলগোছে ছুঁয়ে থাকে আমার সমগ্র আমিটাকে।

শরতের মেঘেরা যখন হানা দেয় সিঊড়ীর রাস্তায়

শরতের মেঘেরা যখন হানা দেয় সিঊড়ীর রাস্তায়

বাদ দিতে পারিনা আমি ‘আমার শহর’এর তালিকা থেকে সেই শহরটাকে,যেখানে কোনো এক খুব বর্ষার দিনে স্যাঁৎসেঁতে,ঠান্ডা একটা ঘরে তোয়ালে মোড়া অবস্থায় আমি প্রথম শিখেছিলাম ঊষ্ণতার পাঠ , আমার বাবার কোলে।কিন্তু তালিকায় সব থেকে উপরের দিকে থাকে তার নাম,যে তার ধূলোমাখা রাস্তায় বা নিয়নের আধা-অন্ধকার গলিতে একটু একটু করে আমার ভিতর ভরে দিয়েছে বীরভুমি সুর!যার গলিঘুঁজিমাঠে কেটে গেছে আমার ছোটোবেলা আর আধা বড়োবেলাও! ছোটবেলার আঙ্গু্ল ছুঁয়ে যেত ম্যাপের ছাতি…খুদে চোখ খুঁজে পেত না নিজের শহরের নাম, বন্ধ ম্যাপ বইয়ে বন্দী হত অভিমান।

পিছুডাকা আমার সিলেবাসে নাই

পিছুডাকা আমার সিলেবাসে নাই

সমস্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত মফঃস্বল-শহরের যাবতীয় দোষগুন পাওয়া যাবে এমন একটা জায়গা…যা তখনও ‘আধুনিকা’ হবার গ্রুমিং ক্লাসের দিকে পা বাড়ায়নি…!তাই হয়তো এ’বাড়ীর শুক্তোর বাটি পাঁচিল টপকে পাশের বাড়ীর শুক্তো খেতে ভালোবাসা মেয়েটির পাতে পড়তো। ও’বাড়ীর কাকু নির্দ্বিধায় বকুনি দিতেন দুষ্টু ছেলেমেয়েদের ,গলির মধ্যে ক্রিকেট খেলতে এসে জানলার কাঁচভাঙ্গার গুরুতর অপরাধে।আর এইসব হাফ প্যান্ট আর ফ্রকরা মেতে থাকতো স্বাধীনতা দিবস আর রবীন্দ্রজয়ন্তীর বিকেলে কাঁচা অপটু গলার গানে আর আবৃত্তিতে।

বিকেলের লাল গির্জা

বিকেলের লাল গির্জা

সে শহরের একপাশে রয়েছে একটা লাল-গির্জা। তার ভালোবাসার মানুষদের জাহাজ ঘাঁটি গেঁড়েছে অনেক দূরের কোনো বন্দরে,তাই হয়তো শ্যাওলা রঙা চোখের জল ঝরে পড়তো তার থামের গাল বেয়ে।আর যখনও আমাদের বড়োদিনগুলো ‘ক্রিসমাস’ হয়নি,তখন বাবার সঙ্গে যেতে হতো সেখানে…!গির্জার সামনে যখন রঙ্গীন লজেন্সের খোলার সঙ্গে ভাগ হতো ভালোবাসা,তখনই শহরের আরেকপ্রান্তে একটা খানা-খন্দে ভরা মাঠে পায়ে ফুটবল বা হাতে টেবিলটেনিসের র্যা কেট তুলে নিত ছেলেমেয়েরা!পরিকাঠামো নাই, নাই স্বপ্নপূরনের জন্য পকেট…নিখাদ স্বপ্নের হাত ধরে পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে চলতো ওরা…স্বপ্নের দিকে!ঘামে ভিজতো ডি.এস.এ আর ইন্ডোর স্টেডিয়াম! নাটকের দল, নাচের দল বা গানের স্কুলের প্রোগ্রামে যেকোনো শহরেরই গব্বো ভরা ধুকপুকানি টের পাওয়া যায়.। যেকোনো শীতকাল এখনো সিঊড়ীর স্মৃতিতে এনেদেয় রবীন্দ্র সদন, ডি.আর.ডি.সির সামনে হল বুকিং-এর ভিড়।

মাদলের তালে পা!

মাদলের তালে পা!

নিজের শহরের বা অন্য কোনো প্রখ্যাত শিল্পীর হাত ধরে ঠোঙ্গার বাদামের মতো ফুরিয়ে যেত শীতের সন্ধ্যেগুলো! কৌশিকি দেশিকান বা মান্নাদের কন্ঠে রঙ্গীন হতো রবীন্দ্র সদন!বড়ো হওয়ার মাঝে আমাদের বড়ো বেশী বীরভূমি করে দিত স্বপ্না চক্রবর্ত্তীর “বড়োলোকের বিটিলো” বা “বলি ও ননদি আর দু’মুঠো চাল ফেলেদি হাঁড়িতে”। চিনে যেতাম ‘রবীন্দ্রনাথের বীরভূম’ অতিক্রম করা রাঙ্গামাটিকে, তার আখরকে!তিলপাড়া ব্যারেজের সূয্যি ডোবা আর পরিযায়ী পাখির দল দেখতে দেখতে পিকনিক করায় অভ্যস্ত শহরটা আরেকটু নিজের হতো গান মেলা আর বইমেলার মাঠে। তারপর ‘এখানে কিচ্ছু নেই’ এর খোঁটা আর সহ্য করতে না পেরে নিজেকে বদলালো শহরটা। এদিক সেদিক দামী দামী ক্যাফে-রেঁস্তোরা খুললো,খুললো কাঁচে মোড়া দামের গন্ধ ওঠা জামা-কাপড় বা গয়নার দোকান। বাংলা মিডিয়ামে আস্থা হারিয়েও যারা ছেলেমেয়েদের ভর্ত্তি করাতে বাধ্য হচ্ছিলেন কালীগতী গার্লস বা জেলাস্কুলে; তারা পেলেন খান কয়েক ঝাঁ চকচকে স্কুল, এক্কেবারে ইংরিজি।

রোদের পুরুষালি নিষ্পেষনে রক্তিম হওয়া তিলপাড়া ব্যারেজ আর মাঝির দল

রোদের পুরুষালি নিষ্পেষনে রক্তিম হওয়া তিলপাড়া ব্যারেজ আর মাঝির দল

সে এক বাতিল হওয়া মন্দিরের গপ্পো,যার ঝুলিতে সবই অতীত!

সে এক বাতিল হওয়া মন্দিরের গপ্পো,যার ঝুলিতে সবই অতীত!

বিকেলের লিজ ক্লাবের ছোট্ট পার্ক ফাঁকা হলো। ফেসবুক আরেকটু খালি করলো খানতিনেক লাইব্রেরী আর লিজ ক্লাবের টেনিস কোর্ট!নিত্য নতুন পার্ক হলো! এইসব থ্রি স্টার আর ঝকঝকের সঙ্গে যুঝেঊঠতে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়লো পুরোনো সিঊড়ী! প্রিয় চাঁদমাড়ি মাঠ লাজ ঢাকলো পাঁচিলে। সার্কাস যে বসে না আর ওখানে! ১০০’র গন্ডী পেরোনো আর.টি স্কুল আর চন্দ্রগতি স্কুল এর মুখ ভার হলো,ছাপ পড়লো বয়সের। অবহেলারা জমা পড়লো বাস স্ট্যান্ডের নেতাজী মূ্র্তিটার পায়ের কাছে।হাইরোডের ওপাশে যেসব ধানক্ষেত আর সর্ষেক্ষেত রঙ্ চিনতো ঊঠতি ছেলেপিলের ক্যামেরা খিচাৎ-এ,তা একপলকে বেরং করে দিল “ধর্ষিতা” নামের একটা ঠান্ডা শরীর!রবীন্দ্র সদনও ঝাঁপ ফেললো একদিন! এতসব কালোর মাঝেও ছাদে ঊঠে চুল শুকানোর ফাঁকে আড্ডা বা আচার চুরির সংস্কৃতি বহাল রয়েছে! আমার শহর এখনো প্রেম করছে,গান বাঁধছে আর নিত্যি নতুন গানের দল খুলছে!লিটল ম্যাগে ভরে যাচ্ছে বইমেলা! আমার শহর এখনো আগলে রেখেছে বিকেলদের কলোনির মাঠে ফুটবল বা ক্রিকেট দিয়ে বা নেহাতই ঘাসে মোড়া সবুজ দিয়ে। আমার শহর এখনও মাতছে বড়োবাগান মেলায় আসা ছৌ-এ আর প্রজাতন্ত্র দিবসের দিনে কুচকাওয়াজে। হাসছে, খেলছে আর বাড়ছে!নিজের শহরের কথা বলতে গেলেই আমরা সব্বাই ভালো দিকটাতেই আলো দিই! হাজার হোক নিজের তো!এটা হয়তো সিঊড়ীর গল্প, তবে এ’গল্প এক্কেবারে এক প্রায় সমস্ত ম্যাপে হারিয়ে যাওয়া মফঃস্বলগুলো গল্পগুলোর সঙ্গে। তারপর আমরা বড়ো হই, আমাদের ঠিকানা বদলায়। তবুও প্রতি ডিসেম্বর,প্রতি এপ্রিল আর প্রতি ২৫শে বৈশাখে আমাদের মনে এখনো শুধু সেই সিঊড়ীই আসে, সিঊড়ীই ভাসে। আর প্রত্যেকবার যখন ময়ূরাক্ষী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ছেড়ে আসে সিঊড়ী স্টেশনের দু’নাম্বার প্লার্টফর্ম; আমাদের আঙ্গুলে নিজের ঠান্ডা হাত ছোঁয়ায় আমাদের শহর…!জানে সে ফিরে আসা আমাদের অভ্যাসে নাই,তবুও! আর আমরাও বলে ঊঠি; “ভালো থেকো,সিঊড়ী!”.

ছবি: লেখক