ভাস্কর নভেরা আহমেদ : জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবদুল্লাহ আল মোহন

আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ, অগ্রণী বাঙালি নারী ভাস্কর নভেরা আহমেদ। তিনি বাংলাদেশের ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম অগ্রদূত এবং প্রথম বাংলাদেশী আধুনিক ভাস্কর হিসেবে আলোচিত। পঞ্চাশের দশকে ভাস্কর হামিদুর রহমানের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে অংশগ্রহণ করছিলেন।পরে শহীদ মিনারের মূল নকশাকার নভেরা আহমেদ ছবিতে শহীদ মিনার দেখে আহত হয়েছিলেন। নভেরা ও হামিদুর রহমান যে নকশা জমা দিয়েছিলেন, তাতে মিনারে তিনটি স্তম্ভের নিচের দিকেই হওয়ার কথা ছিল স্টেইন গ্লাসের কাজ। সেখানেই থাকার কথা ছিলো হামিদুর রহমানের ফ্রেসকো আর নভেরা আহমেদের করা ছোট ভাস্কর্য। নৈসর্গিক স্থাপত্যের ধারণা দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই আবেদন নিয়ে শহীদ মিনারের কাজটা আর হয়নি।

নভেরা আহমেদের শিল্পকর্ম

 ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ভাস্কর নভেরা আহমেদকে একুশে পদক প্রদান করে। বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে নভেরা আহমেদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অসাধারণ প্রতিভাধর ও ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব বাঙালি শিল্পী নভেরা আহমেদের সঠিক জন্ম সাল নিয়ে বিভ্রান্তি কাটেনি বলেই অধ্যাপক নজরুল ইসলাম যথাযথভাবেই উল্লেখ করছেন, ‘বেশিরভাগ সূত্র তাঁর জন্মসাল উল্লেখ করে ১৯৩০, অন্য সূত্র বলে ১৯৩৫, এমনকি ১৯৩৯ সালও। তবে যেহেতু তিনি ১৯৪৭ সনের দিকে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন, অনুমান করা যায়, তখন তাঁর বয়স পনেরো বা তার বেশি হতেই পারত।’ সুতরাং সালের মতান্তর থাকলেও তারিখটি নিয়ে বিভ্রান্তি দেখি না। আর তাই নভেরা আহমেদ ১৯৩০ সালের ২৯ মার্চ বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বলে ধরে নিতে পারি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৪৫ বছর ধরে প্যারিসে বসবাস করছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল আশির কাছাকাছি বলেই উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, বেশ কয়েক দশক ধরে অন্তরালে থাকা নভেরা আহমেদ প্যারিসে নিজের বাড়িতে ২০১৫ সালের ৬ মে মঙ্গলবার ভোরে মারা যান।
তার অপার ক্ষমতা, শিল্পবোধ, শিল্পের প্রতি একনিষ্ঠ তন্ময়তা ও ভালোবাসা, অনুভূতি ও নান্দনিকতা সব এক হয়ে দৈবের ওপর ভর করেছিল যেন। এতদিন পরও তাই, তার কৃত শিল্পসৃষ্টি দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এখনো তা সাম্প্রতিক ও সময়ের সঙ্গে টিকে থেকে তা হয়ে গেছে ধ্রুপদী গুণবিশিষ্ট। ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে জীবনের অর্থ ও সত্যের অন্তর্দৃষ্টিময় স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন নভেরা।
নভেরার সৃজন শিল্পকে ঘিরে অবতার যে পর্দা উঠেছিল, ১৯৯৪ সালে সে পর্দা তুলে ফেলেন হাসনাত আবদুল হাই সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় ‘নভেরা’ লিখে। নভেরা প্রত্যাবর্তন করেন নতুন প্রজন্মের আইকন হয়ে, পুনর্জন্ম ঘটে তাঁর ভাস্কর্যের। ওই বছরেরই ১০ নভেম্বরে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে মেহবুব আহমেদ লেখেন ‘ভাস্কর নভেরা আহমেদ’। আর রাষ্ট্রযন্ত্রও যেন নিভৃতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠান চেয়েছিল নভেরাকে মৃত বানাতে, কিন্তু তাদের সে আকাঙ্ক্ষারই মৃত্যু ঘটে ১৯৯৭ সালে নভেরা আহমেদকে একুশে পদকে ভূষিত করা হলে।

নিজের গ্যালারীতে কাজ করছেন

সময়ের জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে ওঠা নভেরাকে ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা তাঁর সৃজনশীলতায় কোনো যতি টানতে পারেনি। কিন্তু ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে স্ট্রোকের ফলে তাঁর স্বাস্থ্য নাজুক হয়ে পড়ে। তারপর থেকে আমৃত্যু তিনি হুইল চেয়ারে বসেই চলাফেরা ও তাঁর কাজকর্ম করেন। তবে শরীর দুর্বল হলেও তাঁর প্রবল মনোবল ছিলো অক্ষুণ্ন। আর তাই বই পড়া ও ধ্যান- এসবের মধ্য দিয়ে তাঁর দিনের অনেকটা সময় কাটতো। তিনি আনন্দ খুঁজে পেতেন রবীন্দ্রনাথে, আর বৌদ্ধ দর্শনে পেয়েছেন আত্মার প্রশান্তি।

নভেরা আহমেদের বাবার নাম সৈয়দ আহমেদ। পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আসকারদীঘির উত্তর পাড়া। নভেরা কলকাতার লরেটো স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। পরবর্তী শিক্ষার জন্য তাঁকে বাড়ি থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। পরিবারের ইচ্ছা ছিলো, তিনি আইনে উচ্চতর শিক্ষা নেবেন। তবে শৈশব থেকেই শিল্পানুরাগী নভেরার ইচ্ছা ছিলো ভাস্কর্য করার। তিনি সেখানে সিটি অ্যান্ড গিল্ডস্টোন কার্ভিং ক্লাসে যোগ দেন। পরে ভর্তি হন ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে। সেখান থেকে তিনি পাঁচ বছর মেয়াদের ডিপ্লোমা কোর্স করেন। এরপর তিনি ইতালির ফ্লোরেন্স ও ভেনিসে ভাস্কর্য বিষয়ে শিক্ষা নেন। নভেরা আহমেদ দেশে ফেরেন ১৯৫৬ সালে। সে সময় ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ চলছিলো। ভাস্কর হামিদুর রহমানের সঙ্গে নভেরা আহমেদ শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। পরে অজ্ঞাত কারণে শহীদ মিনারের নির্মাতা হিসেবে তাঁর নামটি সরকারি কাগজে বাদ পড়ে যায়।
নভেরার প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট, কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে। ‘ইনার গেজ’ শিরোনামের ওই প্রদর্শনীটি কেবল নভেরারই নয়, গোটা পাকিস্তানেই ছিলো কোনো ভাস্করের প্রথম একক প্রদর্শনী। তাতে ভাস্কর্য স্থান পেয়েছিল ৭৫টি। সেই প্রদর্শনীর ৩০টি ভাস্কর্য পরে জাতীয় জাদুঘর সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। সেই শিল্পগুলো নিয়ে ১৯৯৮ সালে তারা একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করে। নভেরার সেসব ভাস্কর্যের কয়েকটি এখনো জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণে স্থাপিত রয়েছে। নভেরার দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী হয় ১৯৭০ সালে, ব্যাংককে। এতে তিনি ধাতব মাধ্যমে কিছু ভাস্কর্য করেন। তাঁর তৃতীয় একক প্রদর্শনী হয় প্যারিসে, ১৯৭৩ সালে রিভগেস গ্যালারিতে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে প্যারিসে তাঁর পূর্বাপর কাজের এক শ দিনব্যাপী একটি প্রদর্শনী হয়।

নভেরা আহমেদ কাজ করছেন

এ দেশের সাংস্কৃতিক চিত্রপটে নভেরা আহমেদ আবির্ভূত হয়েছিলেন প্রবলভাবে। মানুষ হিসেবে, শিল্পী হিসেবে, নারী হিসেবে। সংস্কারাচ্ছন্ন সে যুগে তিনি হাত দিয়েছিলেন ভাস্কর্যের মতো অচর্চিত শিল্পমাধ্যমে। সে স্পর্শ ছিলো পরশপাথরের মতো। তাঁর হাত ধরে এ দেশের ভাস্কর্যের শুরুটাই হলো আধুনিক ভাষায়। স্বাতন্ত্র্যে মণ্ডিত তাঁর জীবনও প্রথা মানেনি। প্রবল আবির্ভাবের বিপরীতে নভেরা নিভৃতেও চলে গেলেন নিশ্চুপে। প্রচণ্ড ইগো ছিল নভেরা আহমেদের। হাসপাতালে যদি যেতে হয়েছে কখনো, কাউকে দেখতে যেতে বলেননি।

নভেরার কথা বলা হলে ঘুরেফিরে গ্রেগোয়া দ্য ব্রন্সের কথাও বারবার বলতে হবে। নভেরার স্বামী এই ভদ্রলোক একজন মাটির মানুষ, যেন বাঙালি মানসিকতা নিয়েই জন্মেছেন তিনি। নভেরাকে সমাহিত করার আগে তিনি শুধু বলতে পেরেছিলেন, ‘স্বর্গে আবার দেখা হবে।’ দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘একটাই বিয়ে, একটাই জীবন।’ এ যেন এক বাঙালি স্বামী।

নভেরা পছন্দ করতেন রসমালাই, রসগোল্লা আর বিরিয়ানি। খুব পছন্দ করতেন শাড়ি। মূলত প্যারিসেও শাড়ি পরেই থাকতেন।
প্যারিসে নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হয়েছিলো ১৯৭৩ সালে। এরপর ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি শুরু হয়েছিলো তাঁর শিল্পকর্মের দুই মাসব্যাপী প্রদর্শনী। ৪১ বছর পর শিল্পীর প্রদর্শনী।

 শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত একাধিক রোগে ভুগছিলেন শিল্পী। বিশেষ করে মুখে স্বাদ ছিল না বেশ কিছুদিন ধরে। কিছু গিলতেই অসুবিধা হচ্ছিল তাঁর। তরল খাবার ছাড়া কিছুই খেতে পারতেন না। এভবেই একদিন তিনি পাড়ি জমালেন অসীমে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু ভাস্কর নভেরা আহমেদ আছেন, থাকবেন বহু বহুদিন। শহীদ মিনার তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে।’

(তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, কালি ও কলম, শিল্প ও শিল্পী, সাপ্তাহিক, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট )

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]