ভুলি কেমনে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

খুকু

একটু অন্যমনস্কভাবেই পথ চলছিলাম। বিকেল – ফুরফুরে হাওয়া, ঈদের দিন, রাস্তায় রঙীন কাপড় পরিহিত শিশুদের কলকলানি। ফিরছিলাম এক বন্ধুর বাড়ী থেকে মধ্যাহ্নের গুরুভোজের পরে। বকশীবাজারের পরিচ্ছন্ন সফেদ সাদা একতলা বাড়ীগুলো ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিলো বিকেলের নরম রোদে। পারিপার্শ্বিকতা আর অন্য সবকিছু মিলিয়েই আমাকে আনমনা করে দিয়েছিলো ১৯৭৪ এর সেই বিকেল।

হঠাৎ শুনি নীচু এক পাঁচিলের ওপার থেকে মেয়েলি গলার ডাক, ‘এই যে ফার্স্ট বয়, কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি’? তাকিয়ে দেখি আমার সতীর্থ সমাজ বিজ্ঞানের সুলতানা আহমেদ খুকু। অনেকে খুকি বলে ডাকলেও আমি ওকে খুকুই ডাকতাম। ‘ফার্স্টবয়’ ডাকটির মাহাত্ম্য হচ্ছে কিছুদিন আগে স্নাতক সন্মান পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হওয়ার সুবাদে আমার কপালে ঐ ডাকটি সেঁটে দিয়েছিলো খুকুই – ফাজলামো, ঠাট্টা এবং সেই সঙ্গে মমতার সংমিশ্রন ছিলো তা’তে।

হেসে বললাম, ‘বন্ধুর বাড়ী থেকে ফিরছি’। ‘বন্ধুর বাড়ীতে গেলে কি আর বান্ধবীর বাড়ীতে আসা যায় না’? অনুযোগ করেই বললো খুকু। ‘বারে, আপনাদের বাসা যে এখানে তা তো জানতাম না’, বললাম আমি। ‘বেশ, এখন তো জানলেন, এবার আসুন তো গেট খুলে’, ডাকলো ও। আমি একটু ইতস্তত করছি দেখে অনেকটা লোভ দেখানোর মতো করেই খুকু বললো, ‘এলে একটা মজার জিনিস খাওয়াবো’। আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই মাথা দুলিয়ে চোখ নাচিয়ে বললো, ‘হাঁসের মাংস – আমি নিজে রেঁধেছি’।

শেখ কামাল

এইবার পালা বদল। আমার চিরায়ত জোর হাসি ছড়িয়ে পড়লো সারা বকশীবাজারে। ‘ঈদের দিনে হাঁসের মাংস – ভাবা যায় না’। ‘কি, কামালের পছন্দের?’, দুষ্টু হাসি আমার। ‘কিন্তু কামালের জন্যে রাঁধা হাঁসের মাংস আমার কি খেয়ে ফেলা ঠিক হবে?’, চিন্তিত দেখায় আমাকে। আহা,’ ভ্রুভঙ্গি করে খুকুর জবাব, ‘ঢং না করে ভেতরে আসুন তো’।পরে এই হাঁসের মাংস নিয়ে কত না ঠাট্টা করেছে কামাল! কৃত্রিম উষ্মাময় যাত্রার ঢংয়ে বলতো, ‘পাষন্ড, মম হংসমাংস গ্রাসিয়াছ তুমি, এত বড় স্পর্ধা তোমার’। আমাদের মিলিত উচ্চকিত হাসিতে ভরে যেতো চারপাশ।

খুকুর সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় ছিলো, কিন্তু তা ওই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই সীমাবদ্ধ। ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিলো না। আমাদের আলাপ-পরিচয় ক্বচিৎ কখনো কথাবার্তা কিংবা হাল্কা হাসি-ঠাট্টার বৃত্তের বাইরে কখনো যায় নি। কিন্তু চুয়াত্তরের সেই ঈদের বিকেলে ও বড় যত্ন করে আমার সামনে তুলে ধরেছিল হাঁসের মাংস আর চালের গুঁড়োর রুটি – বোন যেমন ভাইকে খাওয়ায়, বন্ধু যেমন বন্ধুকে আপ্যায়ন করে।

এলোমেলো অনেক গল্প করেছিলাম আমরা, হেসেছিলাম প্রচুর। সন্ধ্যের দিকে যখন বেরিয়ে আসি, তখন খুকু বলেছিলো,’ বাড়ী তো চিনে গেলেন, আবার আসবেন’। না, আর যাওয়া হয়নি ওদের বাসায়। আসলে ওই দিকটাতেই যাই নি আর। ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট খুকু হারিয়ে গেলো।

তারপর কতদিন কেটে গেছে – মাস পেরিয়ে বছর, বছর পেরিয়ে যুগ। বছর পাঁচেক আগে এক ঈদে আমার এক খালাতো বোনের সদ্য বিবাহিত মেয়ের বাড়ীতে বেড়াতে গেছি। প্রচুর আড্ডা হলো আমার ভাগ্নি দীঘি আর তার বর গহীনের সঙ্গে। তারপর আমি উঠতে চাইলে দীঘি বললো, ‘পাগল নাকি? না খেয়ে যাবে কোথায়’? আমার কাজ ছিলো – সে কথা বলতেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলো ওরা দু’জন।

চোখ বড় বড় করে দীঘি বললে, ‘মামা, খেয়ে যাও। একটা মজার জিনিষ খাওয়াবো’। চমকে উঠলাম আমি – কোথায় শুনেছি এ কথা! আমি কোনো প্রশ্ন করি নি। আমি ততক্ষনে স্থির জানি প্রশ্ন করলে কি জবাব আমি পাবো। সে জবাব আমি জানি। এ জায়গায় আমি আগেও দাঁডিয়ে গেছি, এ মুখও আমি আগে দেখেছি। পূর্ন দৃষ্টিতে দীঘির মুখের দিকে চাইবার আগেও আমি জেনে গেছি যে তাকালে সেখানে আমি খুকুর মুখটিই দেখতে পাবো।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]