ভুলে যাওয়া নিয়ে কষ্টে আছি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আফরোজা পারভীন

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

আমি খুব ভুলে যাই। দিন- রাতের অনেকটা সময় আমার কাটে কাগজ খুঁজতে। আমার ৬২ বছরের জীবনের অর্ধেক কাটিয়েছি কাগজ খুঁজে। আর তার অর্ধেক কলম চশমা ভ্যানিটিব্যাগ চাবি চিরুনি সেফটিপিন খুঁজে। জিনিস রেখেই যে ভুলে যাই তা নয় কিন্তু শুধু। মানুষকেও ভুলে যাই। এ নিয়ে খুব লজ্জায়ও পড়ি। বেশ কয়েক বছর আগে আমার একজন খুব প্রিয় সিনিয়র সহকর্মি মোস্তাফিজ স্যারের হোম মিনিস্ট্রির অফিসরুমে বসে গল্প করছিলাম। সেখানে এক ভদ্রলোক এসে সরাসরি টয়লেটে ‍ঢুকে গেলেন। আমার তাকে কেমন যেন চেনা মনে হলো। কিন্তু কে তিনি তা মনে করতে পারলাম না। উনি টয়লেট থেকে বের হয়ে চেয়ারে বসছিলেন। মোস্তাফিজ স্যার উনাকে দেখিয়ে নাম করে বললেন, ‘পরিচয় আছে তো?’ আমি কিছু বলার আগেই আগন্তুক বললেন, ‘পরিচয় থাকবে না মানে, আফরোজ তো আমার সঙ্গে হেলথে কাজ করেছে।’ বুঝুন অবস্থা ! ওই স্যার পরে সচিব হয়েছিলেন। এটা তো কম। অফিসার্স ক্লাবে মেজবানে গিয়েছি। ঢৃকতেই মনে হলো, সামনের টেবিলে বসে যে ভদ্রলোক খাচ্ছেন উনি আমার খুবই চেনা। কিন্তু মনে করতে পারলাম না, ব্যাচমেট নাকি সিনিয়র। সালাম দেব না হাত ধরে ‘হ্যালো’ বলবো স্থির করতে পারলাম না। তাই তৃতীয় পন্থা অবলম্বন করে চোখ নাচিয়ে হাসলাম। ভদ্রলোক অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি খুবই অস্বস্তি নিয়ে পুরোটা সময় কাটালাম। পরদিন অফিসে যাবার পর চেয়ারম্যানের রুমে ডাক পড়লো । ঢুকে দেখি, কাল যাকে দেখে চোখ নাচিয়ে হাসলাম, তিনি আমার চেয়ারম্যান। আমি তার সঙ্গে চাকরি করছি, সকাল বিকাল দেখা হয় । তারপরও তাকে মনে রাখতে পারি না। 
সম্প্রতি ঘটেছে একটা দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনাই বলবো। লেখক রিজিয়া রহমান আমার বিশেষ প্রিয়। একুশে পদক পেয়েছেন এবার । যদিও পাবার কথা ছিলো আড়াই দশক আগে। উনি উত্তরা থেকে লোক দিয়ে আমার বাসায় কার্ড পাঠালেন যেনো আমি অনুষ্ঠানে যেতে পারি। ফোনে বার বার বললেন। আমার সেদিন জাহাঙ্গীরনগরে একটা অত্যন্ত জরুরি কাজ। আমি কোন রকমে একটার মধ্যে কাজ সেরে গাড়িতে উঠলাম। সময় নষ্ট হবে বলে দুপুরে খেলাম না। ভুলে যাই বলে প্রতি সকালে নোট বুকে কাজের তালিকা করি আর কাজ শেষে একটা একটা করে কাটি। সেদিনও তাই করেছি। নোট বুকে চোখ বুলালাম, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র। ড্রাইভারকে বললাম, ‘ওসমানীতে চলো যত তাড়াতড়ি সম্ভব ।’ তিনটা সাইত্রিশে পৌঁছালাম ওসমানীর গেটে । কেমন যেন অদ্ভূত লাগলো ওসমানীকে । প্রাণস্পন্দনহীন নিথর। আমি একটার পর একটা গেট হাঁটতে হাঁটতে সব কটা গেট পার হলাম। সব গেট বন্ধ। গেটে কোন মানুষও নেই। সব শেষে পেছনের গেটা খোলা পেলাম। আমি গেটের দারোয়ানকে কার্ডটা দেখিয়ে বললাম , ‘ আমার বড়বোন একুশে পদক পেয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর থেকে এসেছি , একটু দেরি হয়ে গেছে । ঢুকতে দিন প্লিজ । এদিক দিয়ে তো সামনে যাওযা যায়।’ দারোয়ান বললো, ‘ম্যাডাম এখন তো এখানে অনুষ্ঠান হয়না , বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিকে হয়।’ আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। ড্রাইভার আমার দিকে তাকিয়ে করুণ চোখে বললো, ‘তবে কী বঙ্গবন্ধুতে যাবো?’ ‘না, এখন আর গিয়ে অনুষ্ঠানে ঢুকতে পারবো না।’ চোখের পানি ফেলতে ফেলতে আপাকে একটা মেসেজ লিখলাম। সচিবালয়ের জীবনের দীর্ঘসময় ওসমানীতেই জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো হতে দেখেছি, সচিবালয় থেকেই গিয়েছি। এর নাম মাইন্ডসেট। চোখে পড়েও মাথায় ঢোকেনি।
ভুলে যাওয়া নিয়ে ভীষণ চিন্তিত আমি । আমার ছেলে মেয়ে বলে, ‘তুমি সবসময় অস্বাভাবিক ব্রেনওয়ার্ক করো, কাজের চাপে থাকো তাই এসব হয়।’ হতে পারে।
তবে দিন তিনেক আগে বেশ স্তস্তি পেলাম। গণহত্যার ওপর একটা কাজ করছি। ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলাম একজন ডাক্তারের কাছে। উনাকে ফোনে বলেছিলাম সঙ্গে এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি রাখতে। ইন্টারভিউ শেষ করে ছবিটা চাইলাম। উনি মানিব্যাগে তন্ন তন্ন করে খুঁজে ছবিটা পেলেন না। বার বার বললেন , ‘এখানেই তো রেখেছিলাম, এখানেই তো।’ কার্ড দিয়ে বললাম, ‘অসুবিধা নেই এই মেইল অ্যাড্রেসে পাঠিয়ে দেবেন ।’ উনি কার্ড হাতে নিয়ে টেবিলের এদিক ওদিক হাতড়ে বললেন, ‘তাইতো চশমা আনতে ভুলে গেছি।’ আমি হাসলাম। বললাম, ঠিক আছে বাসায় গিয়ে মেয়েকে দিয়ে মেইল করে দেবেন।’ আসার সময় উনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তাইতো কোটের পকেটে থাকতে পারে। দেখি কোটের পকেটে আছে কিনা।’ বলে কোটের পকেটে হাত ঢোকাতে গিয়ে হতাশ হয়ে বললেন, ‘যাহ্ কোটই তো পরিনি।’ তিন দিন চলে গেছে, বলাবাহুল্য সে মেইল আসেনি। আসবে বলেও মনে করি না।

ছবি : গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]