ভূতেরা ফিরে আসে যে রাতে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শান্তা মারিয়া

হ্যাপি হ্যালুইন। প্রথমেই স্বীকার করে নিচ্ছি হ্যালুইন বাংলাদেশের উৎসব নয়। চীনেরও উৎসব নয়। এটিকে বিজাতীয় সংস্কৃতি বলতে আমার কোন আপত্তি নেই। বাংলাদেশে এর পালনকে আমি বিন্দুমাত্র উৎসাহ দিচ্ছি না। এর সঙ্গে আমার ধর্মীয়, অধর্মীয়, বাস্তব, পরাবাস্তব, আদর্শ, আপোষ কোনো কিছুর সম্পর্ক নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই উৎসবে মজা করতে ভালোবাসি। এই উৎসবটির সঙ্গে শৈশব থেকে আমার কিছু বিশেষ ভালোলাগা রয়েছে। বিভিন্ন টিভি সিরিজে এই উৎসব দেখে দেখে ছোটবেলায় খুব ইচ্ছা করতো হ্যালুইন পালন করি। বিশেষ করে জ্যাক ও ল্যান্টার্ন এবং ট্রিক অ্যান্ড ট্রিট করার ইচ্ছা জাগতো। আমি নিজে নিজেই জ্যাক ও ল্যান্টার্নের ছবি আঁকতাম। নিজে উইচ সাজতাম। মা বলতেন, ‘এসব কি বদখেয়াল? মুখের মধ্যে রংচং মাখা? যাও মুখ ধুয়ে আসো।’

বড় হওয়ার পর আমি স্বাধীন। আমি নিজে নিজে এ উৎসব পালন করি ঢাকায় হোক বা চীনে। আমার আসলে উৎসবপ্রীতি আছে। আমি সব উৎসব পালন করতে খুব আনন্দ পাই। বিশেষ করে যে উৎসবে খেলনা, কেক, চকলেটের ব্যাপার স্যাপার আছে। হ্যালুইন উৎসব মূলত অটাম উৎসব। প্রাচীন কৃষিজীবী সমাজে ফসল তোলার পর উৎসব হতো। বজ্র, বৃষ্টি, বিদ্যুৎ আগুনের মতো নতুন এক শক্তির অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে থাকে আদিম মানবগোষ্ঠি। এই শক্তি ফসলের নবজন্ম। প্রথমে উদ্যান চাষ তারপর বৃহত্তর কৃষিক্ষেত্র। নীরস, নির্জীব মৃত মাটি ফুঁড়ে জন্ম নেওয়া সজীব অংকুর মানুষকে বিস্মিত করে। সবুজ পাতায় কিভাবে জীবনের স্পন্দন ফুটে ওঠে তা দেখে বিস্মিত হয় মানুষ। বীজ থেকে উদ্ভিদের জন্ম মানুষের কল্পনাশক্তিকেও জারিত করে। বজ্র, বৃষ্টি, আগুনের মতো কৃষি বা উদ্ভিদের জন্মকেও মানুষের কাছে বিস্ময়কর বলেই মনে হয়েছে। বজ্র, বৃষ্টির মতো তাই কৃষিকেও দৈবশক্তির প্রকাশ বলে ধরে নিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছে নানা কাহিনী। বজ্রদেব, অগ্নিদেব, পবনদেব, সাগর-মহাসাগরদেবের পাশাপাশি ধরিত্রীদেব বা কৃষিদেবও পূজিত হওয়া শুরু হয়। কৃষির উদ্ভাবন ঘটেছে নারীর হাত ধরে। তাই অধিকাংশ প্রাচীন পুরাণ কাহিনীতে ফসলের দেবশক্তিকে নারীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। ফসল ওঠার পর তাই আদিম সমাজগুলোতে নানা রকম আচার অনুষ্ঠান পালনের রীতি গড়ে ওঠে অথবা দেবীপূজার আয়োজন চলে। কখনও সর্বজনীন পূজা হিসেবে আবার কখনও গোপন কাল্ট হিসেবে ফসলের দৈবশক্তিকে আরাধনা করা হয়। শীতে উদ্ভিদের মৃত্যু আবার বসন্তে বীজ থেকে তার জেগে ওঠা এবং শরতে ফসল ঘরে তোলার মধ্য দিয়ে মানবসমাজ জীবনের বৃত্তকেই যেন আবিষ্কার করেছে। আদিম মাতৃতান্ত্রিক সমাজের অবশেষ হিসেবে তখনও প্রধান দৈবশক্তিকে নারীরূপেই ধরা হতো। মাতৃদেবী, উর্বরতার দেবীরাই কৃষিযুগে কৃষির দেবী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।প্রাচীন গ্রিক পুরাণে দিমিতির ছিলেন শস্য ও ফসলের, কৃষির ও উর্বরতার দেবী। ফসল তোলার উৎসব, দিমিতিরের কাল্ট এবং দিমিতিরের উপাখ্যান খুবই মনোগ্রাহী।খ্রিস্টধর্ম প্রসারের আগে আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডের আদি অধিবাসী, কর্নিশ ও কেলটিকদের মধ্যে প্যাগান ধর্ম বা প্রকৃতির পূজা প্রচলিত ছিলো। ফসল তোলার পর শরতে বা শেষ হেমন্তে অনুষ্ঠিত হতো কেলটিক ফসল তোলার উৎসব। সামহাইন ফেস্টিভ্যাল হলো গ্রীষ্মের শেষ দিন এবং শীতের আগমন সূচনাকারী উৎসব। তখন নতুন বছর শুরু হতো শীত থেকে। এই নতুন বছরের আগেই শরতের শেষে সকল মৃত আত্মা জীবিতদের জগতে এক রাত্রির জন্য ফিরে আসতে পারে বলে বিশ্বাস করা হতো। জীবিতদের উৎপন্ন ফসলে মৃতদেরও অধিকার রয়েছে বা মৃতদের আত্মার সদগতির জন্য ফসলের কিয়দংশ উৎসর্গ করার রীতি থেকেই এই রীতির উদ্ভব। রোমান অধিকৃত ব্রিটেনের অথবা তারও আগের প্রাচীন কৃষিদেবতা ছিলেন ভিরিডিওস। যিনি কেলটিকদের প্রাচীন কৃষি ও ফসলের দেব হিসেবে পূজিত হতেন। ব্র্যাসিয়াকা ছিলেন আরেকজন কেলটিক দেবী যিনি ফসলের বা হারভেসটিংয়ের দেবী হিসেবে পূজিত হতেন।কেলটিকদের ফসলকাটার উৎসবের এই রীতিনীতি ও অনেক কাল্ট পরবর্তিকালে হ্যালুইন উৎসবের রীতিতে পরিণত হয় যা কিছু রূপান্তরের মাধ্যমে আজও পাশ্চাত্য বিশ্বে প্রচলিত রয়েছে। আইরিশ হ্যালুইন উৎসবে এখনও টারনিপ বা মূলা-গাজরকে কার্ভ করে ভুতুড়ে চেহারা দেয়া হয়। পরে অবশ্য হ্যালুইন আর প্যাগান উৎসব থাকে না। এটি ক্রিশ্চিয়ানিটির সঙ্গে মিলে যায়। তখন এই উৎসবে সেইন্ট, শহীদ এবং সব মৃতদের স্মরণে মোমবাতি জ্বালানো, প্রার্থনা করার রীতি প্রচলন হয়। আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড থেকে এই প্রথা পুরো ইউরোপেই ছড়িয়ে পড়ে।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে আমেরিকার উপনিবেশে ক্যাথলিক চাচর্রে মাধ্যমে হ্যালুইন উৎসব নতুনভাবে বড় উৎসব হয়ে উঠতে থাকে ধীরে ধীরে। ৩১ অক্টোবর রাতে উইচ এবং অরলকদের(পুরুষ ডাইন)সম্মেলন ঘটে এটা মনে করা হয়। সেই সঙ্গে বুগিম্যানদের দৌরাত্ম্য বাড়ে এদিনে। কখনও কখনও কাকতাড়ুয়াকে ভুতুড়ে বুগিম্যান হিসেবে কল্পনা করা হয়। অটামে ফলানো বড় কুমড়োর মধ্যে আলো জ্বালিয়ে জ্যাক ও ল্যান্টার্ন বানানো হয়। আমার নিজের ব্যাখ্যা হলো, অনেক সময় বেশি ফলন হলে কিছু কুমড়া অথবা কোন পচা কুমড়া ক্ষেতেই ফেলে রাখা হতো। সেই পচা কুমড়ার মধ্যে সৃষ্টি হতো মিথেন গ্যাস যা থেকে আলেয়ার আলো জ্বলে। মনে করা হতো বুঝি ভুতুড়ে আলো জ্বলছে। এ সময় নানা রকম কস্টিউমে সজ্জিত শিশুরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে নানা রকম চকলেট, ক্যান্ডি পায়। ট্রিক অর ট্রিটের রীতি আমার ভীষণ মজা লাগে। আর হ্যালুইনে কস্টিউম পার্টিও মজার। গত বছর আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে হ্যালুইনে অনেক মজা করেছি। ঘর সাজিয়েছিলাম অনেক ডেকোরেশন পিস দিয়ে। এর আগে ঢাকাতেও হ্যালুইন করেছি। মজা হয়েছে অনেক। প্রতিবছরই আমি হ্যালুইন পালন করি। হ্যালুইন উৎসবের মধ্যে আমি প্রাচীন কেলটিক সংস্কৃতির মানুষ ড্রুইড, পরী, উইচ এদের স্পর্শ পাই। বাড়িতে একটা ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি করে খুব মজা পাই। বছরে একটা দিন যদি প্রেতাত্মারা ফিরে আসে তো আসুক না। নাহয় মৃতদের, অশরীরিদের জন্য একটা পার্টি অ্যারেঞ্জ করাই হলো। গতবার আমি এই পার্টিতে উইচ সেজেছিলাম। অর্ণ আমার হ্যালুইন উদযাপন দেখে খুব মজা পায়। তার কাছে মনে হয় ‘মামণি একজন ছোট মেয়ে যে এসব অদ্ভুত উৎসব পালন করতে উৎসাহী।’ সে আমার এই খেয়ালগুলোকে খুব প্রশ্রয় দেয়।

এ বছর আমার আয়োজন খুবই সামান্য। কারণ কোভিড মহামারী। তবু অল্প কিছু ঘর সাজানো। হ্যালুইন উৎসব নিয়ে অনেক নেগেটিভ কথা নিশ্চয়ই বলার থাকতে পারে। আমি এসব পাত্তা দেই না। তার চেয়ে বরং বলি হ্যাপি হ্যালুইন।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box