মঞ্চে গ্যালেলিও আবার

বিকেল থেকে মহিলা সমিতি মঞ্চের সামনে ছিলো দুই ধরণের লাইন। একটি লাইনে দাঁড়ানো মানুষ আগেই বুকিং দিয়ে রাখা টিকেট সংগ্রহ করছিলেন। আর অন্য লাইনটিতে ছিলেন টিকেটের অপেক্ষায় থাকা মানুষ। তাদের জানানো হয়েছিলো কেউ যদি নাটক দেখতে না-আসে তবেই সেই টিকেটটি তাদের ভাগ্যে থাকতে পারে। সম্ভাবনায় থাকা দর্শকরা ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন লাইনে একটা টিকেটের আশায়। ৩০ বছর পর মঞ্চে ফিরে এলো নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের নাটক ‘গ্যালেলিও’। সেই নাটকের প্রথম শো‘তে গত শুক্রবার এরকমই ছিলো পরিস্থিতি।

বহু বছর পর মঞ্চে আবার আলী যাকের ও আসাদুজ্জামান নূর অভিনয় করলেন। দেশের এই দুই গুনি অভিনেতার অভিনয় দেখার সুযোগ পেলেন দর্শকরা।প্রায় ২০ বছর পর মঞ্চে অভিনয় করলেন আসাদুজ্জামান নূর। আলী যাকের ভীষণ জটিল এক অসুখ নিয়েও অভিনয়ে ছিলেন অনবদ্য। গ্যালেলিও চরিত্রের গাম্ভী‌র্য্, বিদ্রুপমাখা সংলাপ আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছ্বাচারিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ সবটুকুই যেন ভর করেছিলো তাঁর মধ্যে।নাটক শেষে সারিবদ্ধ অভিনেতারা যখন দর্শকদের উদ্দেশ্যে মাথা নামিয়ে অভিবাদন করছিলেন তখন হল ভর্তি দর্শক উঠে দাঁড়ায় করতালি দিয়ে। আলী যাকেরের চোখে তখন চিকচিক করছিলো অশ্রুবিন্দু।

আসাদুজ্জামান নূর। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী তিনি। নাটকে তিনি তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বিশেষভাবে পোপের চরিত্রে তিনি আবার ঝলক দেখালেন শক্তিশালী অভিনয়ের। তাঁকে একের পর এক পোপের পূর্ণাঙ্গ পোশাক পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে আর একজন নরম মানুষ থেকে তাঁর রূপান্তর ঘটছে স্বৈরাচারী চরিত্রে।

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের কয়েকজন পুরনো অভিনেতার পাশাপাশি নবীন অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও এই নাটকে অভিনয় করেন। বহু অভিনয় শিল্পী প্রথম দিন নাটকটি দেখতে উপস্থিত হন মহিলা সমিতি মঞ্চে।

বের্টোল্ড ব্রেশ্টের লেখা ‘দ্য লাইফ অব গ্যালিলিও গ্যালিলি’ নাটকটির অনুবাদ করেছেন আব্দুস সেলিম। বিজ্ঞানের নানা ধরনের আবিষ্কারে নিমজ্জিত মানুষ গ্যালিলিও। রাষ্ট্র আর চার্চ তাঁর কাজের অনুমোদন দিতে চায় চাপিয়ে দেয়া নিয়ম মেনে। তাদের স্বার্থে ও প্রচলিত বিশ্বাসে আঘাত লাগলেই ক্ষিপ্ত চার্চ। যখন প্রচলিত বিশ্বাস—সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে—এই কথার বিপরীতে গ্যালেলিও বলেন, সূর্য নয়, পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখনই চার্চ রুষ্ট হয়। ভয়ভীতি দেখানোর মধ্য দিয়ে তাঁকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেওয়া হয়, এত দিন তিনি যা বলেছেন, তা সত্য নয়। এরপর চার্চের আনুকূল্যেই বেঁচে থাকেন তিনি। কিন্তু ওই বন্দিদশাতেই রাত জেগে গ্যালেলিও লিখে ফেলেন ‘ডিসকোর্সি’ নামে তার বিখ্যাত বয়ান। পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে রাখেন গ্লোবের ভেতরে। শেষে প্রিয় ছাত্র আন্দ্রিয়া সার্তির হাতে তা পাচার করে দেন দেশের বাইরে।

বেশ কিছুদিন ধরে গণমাধ্যমে ‘গ্যালেলিও’ নাটকটি ছিলো আলোচনায়। ১৯৮৮ সালে প্রথম নাটকটি মঞ্চায়িত হয়। নির্দেশনা দিয়েছিলেন মঞ্চনাটকের খ্যাতিমান নির্দেশক ও অভিনেতা আতাউর রহমান। সে সময় নাটকটি ছিল আড়াই ঘণ্টার। দীর্ঘদিন পর ফিরে আসা ‘গ্যালিলিও’র নবীন নির্দেশক পান্থ শাহরিয়ার নাটকটিকে নিয়ে আসেন দেড় ঘন্টা সময়কালের মধ্যে।

বিনোদন ডেস্ক

ছবিঃ প্রথম আলো