হারানো রাজনীতি আর দেশকালের সন্ধানে ক্রাচের কর্ণেল

শবনম ফেরদৌসী (চলচ্চিত্র নির্মাতা)

শবনম ফেরদৌসী
      (চলচ্চিত্র নির্মাতা)

এ সময়ের লেখকদেরমধ্যে শাহাদুজ্জামান আমার পছন্দের, তাঁর ডকু-ফিকশনের জন্য। রাজনৈতিক তথ্যকে এত প্রাঞ্জল ফিকশনেপরিনত করতে এ সময়ে আর কাউকে দেখিনা।তাঁর রচিত ডকু-ফিকশনকে যখন পিওর ফিকশান্–এ রূপান্তরিত করা হয় তখন আমার আগ্রহের সীমা উপচে পরে।আমি ছুটি বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মঞ্চের উদ্দেশ্যে। ‘ক্রাচের কর্ণেলে’র দ্বিতীয় শো’তে।যদিও অন্তত দশটি মঞ্চায়নের আগে নাকি শো দেখতে নেই।তারপরও গেলাম কারন যারা ‘ক্রাচের কর্ণেল’ কে মঞ্চে রুপান্তরিত করেছে তারা আমার বন্ধু-স্বজন “বটতলা”। বর্তমান বাংলাদেশে মঞ্চের সবচেয়ে শক্তিশালী দল বলা যায় নির্দ্বিধায়।আমিও তাই দ্বিধাহীন চিত্তে উপস্থিত হই তাদের আয়োজনে।

ক্রাচের কর্ণেল আমার পড়া। বিশদভাবেই পড়া। ফলে এর ফিকশনাল প্রেজেন্টেশন কেমন হবে তা আমার অ-অনুমেয় নয়। এর কাহিনীর মোক্ষম অংশ ও ক্লাইমেক্স কোথায় কোথায় তা আমার চোখে ভেসে ওঠা।কিন্তু, বটতলার ‘ক্রাচের কর্ণেলে’কাহিনীকে ছেঁকে তোলার ক্ষেত্রে দুর্বল লাগলো।বটতলার কাজের ভক্ত আমি। কারন,তাদের কাজ খুব পরিমিতি বোধে উৎকর্ষ। প্রোপারলি এডিটেড, ঝরঝরে ঋজু তাদের কাহিনী বিন্যাস ও সংলাপ। ‘ক্রাচের কর্ণেলে’ এসে তা যেন প্রথম হোঁচট খেল। ডায়ালগের ভাষা ক্লিশে এবং প্রবলভাবে প্রবন্ধ-গন্ধী। শাহাদুজ্জামানের লেখা ক্রাচের কর্ণেলের বিশাল পরিধির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চেয়ে অনেক অ-গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্ক্রিপ্টে প্রাধান্য পেয়েছে। যেমন কর্ণেল তাহেরের বেড়ে ওঠার পর্যায়।15970540_10154850823224449_251170862_n নাটকের প্রায় অর্ধেক মুখবন্ধেই খেয়ে ফেলেছে।যা মাত্র ৫ মিনিটের ডায়ালগে সেরে ফেলা যেত বলে আমি মনে করি।ফলে, কাহিনীর গভীরে ঢুকতে অনেক কালক্ষেপন হলো এবং নাটকটি মাঝামাঝিতে এসে খানিক ঝুলে গেল যেন।
কর্ণেল তাহেরের রাজনৈতিক মনভঙ্গী, তার পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পশ্চাৎভূমির পরিচয় দর্শকদের কাছে পরিস্কার করতে গিয়ে আগমন ঘটলো মাস্টার দা সূর্যসেনের এক রাজনৈতিক সঙ্গীর। উপন্যাসের প্রলম্বিত দীর্ঘ পটভূমি নাটকে উপস্থাপন করতে গিয়ে বেশ অনেকটাই গতি হারালো পুরো উপস্থাপনা। এভাবে নাটকের অনেক জায়গাতেই তাহেরের জীবনের বেশকিছু অংশ উত্থাপিত হয়েছে যা নাটকের উত্থান-পতন আর স্বাভাবিক গতিকে ব্যহত করেছে বলেই মনে হয়েছে।

colonel-taher

কর্ণেল তাহের

6052881254_efbaeab318_z

প্রেসিডেন্ট জিয়া

এবার আসি ট্রিটমেন্ট ও টেকনিকে। মোহাম্মদ আলী হায়দার আমার প্রিয় মঞ্চ নির্দেশকদের একজন। তিনি খুব কম প্রপস্ এর মধ্য দিয়ে খুব সহজ করে কাহিনীর বয়ান করতে জানেন।যিনি আলোক ও শব্দের ব্যবহারে বহু নতুন যোজনা তৈরী করেছেন। Kracher Kornel - Shahaduzzamanযিনি প্রসেনিয়াম থিয়েটারের চিরাচরিত ফর্মকে ভেঙ্গে নতুন ফর্ম নির্মাণ করতে জানেন অনায়াসে এবং তাঁর এক একটি কাজ এক একটি নতুন কিছু।এবারও তা আছে। ট্রিটমেন্ট হিসেবে তিনি বর্তমান ও অতীত নিয়ে খেলতে চেয়েছেন।চেয়েছেন নিজেদের একটা বিশ্লেষন দিতে।যদিও ইতিহাসভিত্তিক শিল্প সৃষ্টিতে নিজস্ব বিশ্লেষণ আলাদা করে বলবার আর কোনো কারন দেখি না!কারন, যে কাহিনীশিল্পী বয়ান করে যায় তার সৃষ্ট ফর্ম-এ,  সেইফর্ম এর বুননের মধ্যেই নিহিত থাকে শিল্পীর বোধ ও দর্শণ। সে অলক্ষ্যে একটা দিক নিয়ে নেয়।ফলে শিল্পের উপস্থাপন শেষে যা বোঝার, দর্শক তা বুঝে নেয়। যা নেবার, দর্শক তা নিয়ে নেয়।“ক্রাচের কর্ণেল” এর মূল ঘটনা এত বৈচিত্রময় এবং শক্তিশালী যে তার আর আলাদা ব্যখ্যার প্রয়োজন পড়েনা। মোহম্মদ আলী হায়দার ট্রিটমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছেন, বটতলার রিহার্সেল রুমকে। অর্থাৎ, কুশীলবরা যে যায় নাম ভূমিকায় নিজেদের মধ্যে কথা বলার ভঙ্গিতে ডায়ালগ আওড়ে যায়।দেখা যায় তারা “ক্রাচের কর্ণেল” মঞ্চে আনবেন এবং সেজন্য তাদের মহড়া চলছে। ফলে মহড়া কক্ষ থেকে কাহিনী এবং কাহিনী থেকে মহড়ায় গমনাগমনই হচ্ছে এর রস।ইতিহাস চিত্রায়নের পাশাপাশি তারা একটা বিশ্লেষনও খোঁজেন। কিন্তু, বারবার রিয়েলিটি থেকে অতীতে যাওয়া এবং আসার পর্যায়টা এত বেশী মাত্রায় ঘটছিলো যে তা মূল কাহিনীকে ডিসট্র্যাক্ট করে দিচ্ছিলো নাটকের প্রথমার্ধে।কখনও কখনও তা লঘুত্বের পর্যায়ে চলে গেছে বলে মনে হয়েছে। নির্দেশক এবং নাট্যকার বিষয়টি কেন করেছেন তা বোঝা যায়না তা নয়। যেহেতু তারা পুরো প্রেক্ষাপটটি ধারা বর্ণনার মতো করে উপস্থাপন করে গেছেন ফলে তারা হয়তো ভেবেছিলেন, দর্শক বিরক্ত হয়ে পড়বে। এতে করে যা ঘটে গেছে তা হলো, নাটকের দৈর্ঘ্য দীর্ঘায়িত হয়েছে। “ক্রাচের কর্ণেল” যারা দেখতে আসবেন তারা মাথায় এই ভাবনা রেখেই আসবেন যে তারা ইতিহাসের এক কঠিন ও জটিলতম অধ্যায় পার করতে চলেছেন। ফলে যখন পাত্র পাত্রীরা কথকের মতো করে কাহিনী বলে যান, তাতে কোন ক্লান্তি আসেনা। এই পুরো বইটি যদি পাত্র পাত্রীরা শুধু বর্ণনা করেও যেতেন তবুও দর্শক বিরক্ত হতোনা।কেননা এ বড় কঠিন এক ইতিহাস, চাপা পড়া লুকিয়ে রাখা। তার উন্মোচনই বড় এক চ্যালেঞ্জ। বটতলাকে প্রথম ধন্যবাদ জানাতে চাই, তাদের এই সাহসী প্রযোজনার জন্য। শিল্পী যে তল্পিবাহক নয়, এটা তারা বহু বছর পর আবার স্মরন করিয়ে দিলেন।

এক্সপেরিমেন্টের আরো একটি জায়গা হচ্ছে চরিত্রায়নে পাত্রপাত্রীর ভূমিকা।কর্ণেল তাহেরসহ সব চরিত্রেই নিরন্তর ঘটেছে ইম্প্রোভাইজেশন। একই ব্যাক্তি এই সেনা তো এই সামিনা নিত্রা, এই আমজনতা তো এই তাহেরের মা।যে রোকসানা পারভীন রুমা, সেই কর্নেল তাহের, সেই তাহেরের স্ত্রী লুৎফা, আবার সেই জনৈক সেনা। এক কর্নেল তাহেরের চরিত্রেই অভিনয় করেছেন ৬ জন। এও এক ট্রিটমেন্ট। ইতিহাসের বিভ্রম নাটকের চরিত্রায়নকেও প্রভাবিত করেছে। কোনটা কে, কার কোন ভূমিকা সে অন্বেষনে যেমন এদেশ কাটিয়ে দিয়েছে ৪৫ বছর, তেমনি আমরাও দর্শকের আসনে বসে খুজেঁ ফিরেছি কে কোন জন। কত সহজে পাল্টে যায় মানুষের রূপ। নাটকের কাহিনী যতই গভীরে ঢোকে এই বিভ্রম ততই কমতে থাকে। আমরা ক্রমশ: চিনে যেতে থাকি কে কোন ভূমিকায় এবং কেন!

আসা যাক কুশীলবদের প্রসঙ্গে। এদেশের মঞ্চের বড় সৌভাগ্য যে তারা সামিনা লুৎফা নিত্রাকে পেয়েছে। এমন দেহ-ভাষা অপ্রতুল। তার দেহ যেন তার ইচ্ছাধীন। মূহুর্তে ধারন করতে পারে তা নানা আকার, নানা প্রকারের মানুষের অবয়ব। এদেশে পারফেকশনিস্ট খুব কম। নিত্রা সেই কর্মীদের একজন।একে তো তিনি একের পর এক তুখোর সব পান্ডুলিপি রচনা করে চলেছেন, তার উপর মারদাঙ্গা অভিনয়। মঞ্চ যেন তার শোবার ঘর, রান্না ঘর। এত অনায়াস সেখানে তার যাতায়াত যে আমরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি তার চরিত্রায়নের বিশ্বাসযোগ্যতায়।এরপর যে নামটি আসে, তিনি অবশ্যই রোকসানা পারভীন রূমা। ফাঁকে একটা কথা বলে নেয়া ভালো। “বটতলা” এদেশে নারী অভিনয় শিল্পীদের পুরুষ এবং নারী উভয় চরিত্রে উপস্থাপন করছে। এর পূর্ববর্তী প্রযোজনা ‘দ্য ট্রায়াল অব মাল্লামইলিয়া’ তেও আমরা তার অনবদ্য স্বাক্ষর দেখি। ক্রাচের কর্ণেলেও তার পূনরাবৃত্তি ঘটলো। এবং তা ঘটলো সফলভাবেই। কী দোর্দন্ড প্রতাপে দুই নারী কুশীলব নারী-পুরুষ উভয় ভূমিকায় কাজ দেখিয়ে গেলেন! ব্যাপারটা আবিস্কারের আনন্দ মোহাম্মদ আলী হায়দারের প্রাপ্য। তিনি কৌশলটি নিয়েছেন বাংলার আদি থিয়েটার ফর্ম থেকে। যেখানে পুরুষ নারীর চরিত্রে অভিনয় করতো, পাট গাইতো। হায়দার হয়তো সেই তুরুপের তাস উল্টে দিতে চাইছেন এবং অচিরেই ‘বটতলা’ একটি ফেমিনিস্ট ধারার নাট্যদলের রূপে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বিশ্ব নাট্যমঞ্চে।একথা আজ আমি বলে রাখলাম।ক্রাচের কর্ণেল
তরুণ কর্ণেলের চরিত্রে যারা অভিনয় করলেন তাদের গেটআপ হয়তো ঠিকঠাক ছিলো কিন্তু সেই কর্ণেল যখন ক্রাচের কর্ণেল হয়ে উঠল তখন ইমরান খান মুন্না সেই ইমেজ ধারন করতে সক্রিয় হলেন। ইমরান খান মুন্না ভাগ্যবান, কারন কর্ণেল তাহেরের সঙ্গে তার অবয়বের মিল আছে। তার ভরাট কণ্ঠস্বর ও ধীরগতি এবং বিমর্ষ অভিব্যাক্তি একটি ট্র্যাজিক চরিত্রকে উপস্থাপনে সক্ষম হয়। এবং দর্শকের সারিতে বসে আমরা বেদনার্ত হয়েছি।মেজর জিয়া চরিত্রে নবাগত এম. আই. রনি বেশভালো মানিয়ে গেছেন। একটি ক্যাপ ও সানগ্লাস তাকে বেশ বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছিলো বারবার। মোশতাকের চরিত্রে পঙ্কজ মজুমদারবেশ ক্রিয়াশীল। অনেকদিন পর হূমায়ূন ফরিদীর একটি প্রভাব এবং আভাষের দেখা মিললো যেন। দম বন্ধ করা মুহুর্তে তা রিলিফের কাজ করে গেছে স্বচ্ছন্দ্যে। ঠিক এই জায়গাটায় আবার মনে করিয়ে দিতে চাই, রিলিফের কথা ভেবে যে সব ট্রিটমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে তা কি খানিক কাটছাঁট করা যায় নির্দেশক ও নাট্যরূপদাতা? চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে এক এক পর্যায়ে আমার এডিট করতে মন চাইছিলো। মনে হচ্ছিলো পুরো নাটকটির টুকরো টুকরো কিছু অংশ ফেলে দিলেই ক্রাচের কর্ণেল অধিক শ্বাস গ্রহণ করবে।
কর্ণেল তাহেরের স্ত্রীর নৌকায় পালিয়ে যাওয়ার অংশ অথবা তাহেরের শৈশবের কিছু দৃশ্য তো অনাযেশে ছেঁটে ফেলা যায় নাটকের মূল শরীর থেকে।

ক্রাচের কর্ণেল অনেক পরিশ্রমী প্রযোজনা। শুধু মেধার পরিশ্রম নয়। আছে শিল্পীদের কায়িক পরিশ্রমও। কুশীলবদের এনার্জি লেভেল দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। দর্শক হিসেবে আমরা মাঝে হাফিয়ে উঠেছি কিন্তু, সে ক্লান্তির লেশমাত্র দেখা যায়নি শিল্পীদের চলাচলে। এই পরিশ্রম কি বেদনার বহি:প্রকাশ? অনেক বেদনা যখন আমাদের খুবলে খায় তখন মানুষ তার রিলিফ খোজেঁ কায়িক পরিশ্রমে, ঘাম ঝরিয়ে, কখনও বা দেহকে কষ্ট দিয়ে। নিত্রা, মুন্না,রূমারা কি তাই করে দেখালেন?যাকে বলা হয় Agony কে Purgation-এ রূপান্তরিত করবার চেষ্টা! এমন একটা বোধ দিচ্ছিলো দর্শকদের। মঞ্চের ওপর ঘটে চলা বেদনাভার আমাদের বুকের খাজেঁ চেপে বসা ভার প্রসারিত করছিলো। যে অধ্যায় এর ভার আজো এ দেশ বহন করে চলেছে। যাহোক, বেশ চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে ‘ক্রাচের কর্ণেল’ ক্রমশ: সরল রৈখিক হয়। ক্রমশ: কাহিনী তার জটিলতা ভেদ করে এগিয়ে চলে। এবং ক্রমশ ইতিহাসের ক্লেদ প্রকাশ হয়ে পড়তে থাকে। সেই সঙ্গে জমাট বাধা ক্রোধ ও বেদনা বোধ। এ নাটকের সকল দূর্বলতা ছাপিয়ে ওঠে শেষতক ক্রাচের কর্ণেলের প্রয়াস সার্থক হয়।দর্শক আপ্লুত, ক্ষুদ্ধ, যন্ত্রনাক্লিষ্ট ও নূহ্য হয়ে পড়ে। ধমনী শিউরে ওঠে বারবার। আশাকরি, নাটকের বয়ানে ফর্ম এবং ট্রিটমেন্ট আরো স্বতস্ফুর্ত হয়ে উঠবে খানিক পরিমার্জনে। হয়তো নাটকের ফর্ম এবং টেকনিক ছাপিয়ে কাহিনীই মুখ্য হয়ে উঠবে।

ছবি: ইরাজ আহমেদ ও গুগল