মধ্যরাতের পদ্য

কাজী জহিরুল ইসলাম

কাজী জহিরুল ইসলাম

১৩ জানুয়ারী ২০০৭, শনিবার সকাল। বাইরে ঝকঝকে রোদ। তাপমাত্রা একুশ ডিগ্রী সেলসিয়াস। বেশ আরামদায়ক। ছুটির দিন। বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছি।

জল আমাকে নেশার মতো টানে। মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক, বাসাম সমুদ্র সৈকত। এক’শ কিলোমিটার ড্রাইভ করলেই আশ্বিনি সৈকত। পৃথিবীর এতো দেশ ঘুরেছি, এতো সমুদ্রে সাঁতার কেটেছি আশ্বিনি সৈকতের মতো এতো সুন্দর নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকত আর কোথাও দেখিনি। এক চিলতে সৈকত আটলান্টিকের জল ছুঁয়ে ছুটে গেছে শ’খানেক মাইল। একই সমান্তরাল রেখায় কাকচক্ষু জলের মতো কালো একটি নিস্তরঙ্গ লেক ছুটে গেছে কয়েক মাইল পথ। লেক এবং সমুদ্রের মাঝখানে যে আড়াই’শ গজ চওড়া বালুকারাশি, এটিই আশ্বিনি সৈকত আর এটিই এই সৈকতের প্রধান আকর্ষণ। দু’পাশে দু’ রকমের জল, মাঝখানে সরু এক সৈকত। লেকের ওপারে বেশ ক’টি রিসোর্ট। রিসোর্টগুলোতে রয়েছে ছোট ছোট কটেজ, নোনা জলের সুইমিং পুল, চারপাশ খোলা সুবিশাল রেস্টুরেন্ট, বারবিকিউ করার ব্যবস্থা, ছোট্ট একটি চিড়িয়াখানা, আর খেলাধুলার সুবন্দোবস্ত। ঘাটে বাঁধা দেশি এবং ইঞ্জিনচালিত, দু’ধরনেরই নৌকা। আমরা দেশি নৌকাunnamed-1য় চড়ে লেক পাড়ি দিয়ে চলে আসি এপারে, সৈকতে। এখানে রয়েছে লেকের পাড় ঘেষে সারি সারি নারকেল গাছ। নারকেল গাছের ছায়ায় পাতা আছে সৈকত-চেয়ার, ওপরে বড়সড় রঙিন ছাতা। আটলান্টিক থেকে উঠে আসা ভেজা হাওয়ায় উড়ছে আমার এলোচুল। দৃশ্যটি কল্পনা করার সাথে সাথেই আমি এক লাফে বিছানা থেকে উঠে পড়ি। ঝটপট তৈরী হয়ে নিই। হাউসমেট সঞ্জীব শর্মা, ভারতীয় নাগরিক। ও কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুখটাকে বিদঘুটে রকম বাঁকালো। চোখ দুটো তখন ছোট, কুতকুতে। আমি এর অর্থ জানি। ও যাবে না। সঞ্জীব আজ জলে যাবে না, ঘরে বসেই জলের অতলে ডুব সাঁতার কাটবে। দু/তিন বোতল ওয়াইনতো আজ ওর পেটে যাবেই।

কি করা যায়? একা একা বিচে গিয়ে কোনো লাভ নেই। প্রকৃতির গভীরে নিবিড় অবগাহন আমার ভাল লাগে। সমুদ্রের গর্জনের মধ্যে বেজে ওঠে দূরের কোনো অতীত, আমি বহমান সময়কে স্পর্শ করতে পারি। তবে এর সবই মানুষ পরিবেষ্টিত হওয়া চাই। আমি মানুষ ভালবাসি। মানুষহীন সকল সৌন্দর্যই আমার কাছে অর্থহীন। একে একে বেশ ক’জন বাঙালী মিলিটেরী অফিসারকে ফোন করি। সকলেরই কোনো না কোনো পূর্বপরিকল্পনা আছে। দুপুর গড়িয়ে গেল। আমার সাথে সৈকতে যাওয়ার জন্য তেমন কাউকেই পাওয়া গেল না। শনিবার আমার জন্মবার। সবাই বছরে একদিন জন্মদিন পালন করে। আমি পালন করি ৫২ দিন, প্রতি শনিবারই আমার জন্মদিন। শনিবার আমার খুব প্রিয় দিন। এ দিন ভাগ্যদেবী আমার প্রতি সুপ্রসন্ন হন। আমি ফুরফুরে মেজাজে থাকি। কিন্তু আজ সবকিছু কেমন উল্টো হয়ে যাচ্ছে। সকলেই আমাকে প্রত্যাখ্যান করছে। আমি জলে যাবার জন্যে অস্থির হয়ে উঠি। শেষমেশ আইভরিকোস্টের জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কোম্পানির কমান্ডার কর্নেল খালেক রাজী হলেন। পড়ন্ত বিকেলে তাকে নিয়ে কাছের সৈকত বাসামে যাই। আমরা হাঁটছি বুনো সৈকতের পাড় ধরে। দৈত্যের মতো ভয়ঙ্কর থাবা তুলে আটলান্টিক এসে পায়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। সেই জল ছলকে মাঝে মাঝেই আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে। মিনিট ত্রিশেক সৈকতে কাটিয়ে ফিরে আসি। হোটেল সেব্রোকোতে অবস্থিত সিগন্যাল কোম্পানিতে কর্নেল খালেককে নামিয়ে দিয়ে একা একাই আবিদজান শহরে গাড়ি নিয়ে বেশ ক’বার চক্কর দিই। নীল লেগুনের পেছনে দিনের সূর্য টুপ করে নেমে গেছে অনেক আগেই।unnamed

শহরের সোডিয়াম বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। আমি আলোকোজ্জ্বল শহরের অন্ধকার জীবন দেখি। শহরের আবাসিক হোটেলগুলোর সামনে শিকারী নারীদের দেখি। শিকার ধরার জন্য কি অদ্ভুত সাজে সেজেছে একেকজন। এই অঙ্গসজ্জা প্রেমিকের জন্য পুজোর নৈবেদ্য নয়, এ হলো ফাঁদ। আমার অস্থির লাগে। সবকিছু কেমন অস্বাভাবিক লাগে। আজ আমার জন্মদিন। আজ একটি শুভ দিন। এই শুভ দিনে এমন অস্থির লাগছে কেন? আমি রিভিয়েরাতে আমার এপার্টমেন্টে ফিরে আসি। সঞ্জীব মদ খেয়ে চুর মাতাল। সে চিৎকার করে কি সব বলছে। আমি ঘুমুবার চেষ্টা করি। কিছুতেই ঘুম আসছে না। উঠে আসি লিভিং রুমে। সঞ্জীব আমাকে গ্লাস এগিয়ে দেয়। আমি চিয়ার্স করি। সোফা থেকে উঠে ডায়নিং টেবিলে যাই। দশ হাজার কিলোমিটার দূরে কেউ একজন আমার প্রতীক্ষায় বসে আছে। কাগজ কলম নিয়ে তাকে চিঠি লিখতে বসি। চিঠিটি কখন যে কবিতা হয়ে ওঠে টেরই পাইনি।

মধ্যরাতে সদ্য লেখা পদ্যটাকে উড়িয়ে দিলাম
বন্ধ ঘরের অন্ধকারে ছন্দগুলো মুক্ত স্বাধীন
তোমার কাছে পাঠানো এই পত্রখানি ঠিকানাহীন
কষ্টরাতের অষ্টপ্রহর নষ্টমলিন স্মৃতির খামে
যত্ন করে রত্ন ভেবে পোস্ট করেছি তোমার নামে
অদ্য আমি বিস্মৃত ব্র্যান্ড মদ্যপানে বিভোর ছিলাম
জানলাগুলো দরজাগুলো সমস্ত রাত খোলাই রেখো

সৃষ্টি-প্রহর বৃষ্টি হলে দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখো
দুরন্ত রাত উড়ন্ত এক চিঠির ঝাঁপি দূর আকাশে
অক্ষরেরা দক্ষ নিবিড় সখ্য করে তারার পাশে
বধ্যভূমির গদ্যগুলো দানার মতো কুড়িয়ে নিলাম
ঘণ্টি বাজে মনটি উদাস কয়েদখানার সেলের ভিতর
ভোর হলেও দোর খোলেনা প্রবাসকারা এমনি ইতর
ছত্র কয়েক পত্র আমার তোমার কাছে সঙ্গোপনে
রাত্রি জেগে যাত্রী একা তীর্থবিহীন ইস্টিশনে…