মনখারাপের সঙ্গে আড়ি…

 

আবিদা নাসরীন কলি: শীতের বুড়ি গা’ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। চারদিকে কনকনে শীত।ঘড়িতে রাত ১২.২০। ২৪ ডিসেম্বর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে ২৫ শে’র কাছে।আজ বড়দিন।আজ আপনার জন্মদিন। তাই আকাশটা বড়ো বেশি আদুরে। দূরের ওই উজ্জ্বল তারাটাই আপনি। আমি ঠিকই ধরতে পেরেছি।কী উজ্জ্বল ! আমার মতো আজ আরও অনেকেই জানি তারাদের ভিড়ে আপনাকে খুঁজছে। আপনি কি আমাদের দহন দেখতে পান দাদা…?

ভোরের কাগজ। চারতলা। ফিচার বিভাগ।দুরন্ত দুপুর। অলস বিকেল। আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া।…কাজ কিন্তু থেমে নেই।পরদিন সেরা বিভাগগুলোই বের হতো।এখনও  বাংলামটর চত্বরে গেলে খুঁজে বেড়াই। অফিসটাই ঠাহর করতে পারিনা।বদলে গেছে গোটা চত্বর।হাইরাইজ আর চাকচিক্যে ঢাকা পড়ে গেছে আমাদের সব স্মৃতি।

মেলার মিটিং।  টেবিল বাজিয়ে আপনার গান।মনে পড়ে। খুব মনে পড়ে।  সেদিন সবার লেখাই প্রশংসিত হতো। কে ভালো লিখলো, কে খারাপ লিখলো বোঝার উপায় নেই।যেমন আমি।প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। আপনি পাঠালেন এক গায়কের ইন্টারভিউ করতে।গেলাম,করলাম।মেলা বেরুলো। পাতাটা ধরে আমার প্রায় অক্কাপাওয়ার অবস্থা। এটা কার লেখা…? নামটা তো আমারই । কিন্তু লেখাটা কার? এদিকে মিটিং-এ আপনি আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।মিটিং শেষে আপনার পাশে যাই। কিছু বলার আগেই আস্তে করে বলে দিলেন, লেখাটা আমি কিভাবে ঠিক করে দিয়েছি সেটুকু ভালো করে দেখে নিও। আর কিছু লাগবেনা। সে লেখাটা আমি যে কতোবার পড়েছিলাম বলতে পারবোনা। আজকের দিনে এমন প্রশংসা করারও কেউ নেই।

সম্ববত ‘দলছুট’এর তৃতীয় অ্যালবামের রেকডিং চলছে। আমি একদিন রেকডিং ষ্টুডিওতে গেলাম।ঠাণ্ডায় আপনার গলা বসে গেছে।কথা বলতে পারছেন না আপনি। ফিসফিস আওয়াজ বের হচ্ছে গলা দিয়ে। আপনি সমানে গার্গেল করে যাচ্ছেন।আমি ভাবছি গান করবেন কিভাবে? বললেন, দেখি কি হয়…। তারপর ভয়েস দিতে ঢুকলেন।তৈরী হয়ে গেলো ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো চাঁদ’।কেউ বোঝে কিনা জানিনা তবে এখনও গানটা শুনলে আমি আপনার বসে যাওয়া গলার স্পর্শ দিব্যি টের পেয়ে যাই।আমাকে ছুঁয়ে যায়।

বাপ্পার সঙ্গে

তখন ১০ নাম্বার পরীবাগ দিদির বাসায় থাকেন।জামাইবাবুর মা তখনও বেঁচে আছেন।মাঝে মধ্যেই আপনি বলতেন, ‘ চলো বাসায় গিয়ে দুপুরের আহারাদি সেরে আসি।’ আমি বলতাম, ‘আমি তো সেরেই এসেছি।আপনি যান।’ আপনি বলতেন, ‘আমার তো ভয় করছে’। জানতে চাইতাম, ‘কেন দাদা?’ এবার হেসে, ‘আজ যে আমি গিনিপিগ হবো।মাওইমা আজ বিশেষ পদ রান্না করবেন বলেছেন।আমার উপর দিয়েই এক্সপেরিমেন্ট হবে।তুমি থাকলে ভাগে কম পেতাম।উনি প্রায়ই এমন বিশেষ পদ রান্না করেন।আর আমিই গিনিপিগ হই।’ জীবনে এ বিষয়েই আপনাকে ভয় পেতে দেখেছি।কারণ আমার চোখে আপনি তো অকুতোভয়।

এই যান্ত্রিক শহরে,অস্থির সময়ে আপনাকে সর্বক্ষণ মনে ধরে রেখেছি বললে মিথ্যে বলা হবে।তবে আমাদের সব আড্ডাতেই আপনি থাকেন আমাদের সঙ্গে।কারণ সেই চৌহদ্দিও যে আপনার নিকটজনেই ভরপুর। ক্ষুদ্র এ জীবনে মানুষ তো আর কম জমাননি।সবাই বড়ো বেশী মিস করে আপনাকে।

আপনার সৈনিকেরা সবাই আজ নিজ পরিচয়েই পরিচিত।তবে ভেতরে কতোটা আপনি আছেন আমার জানা নেই। মুখোবইয়ের আঙ্গিনাতেই সবার সঙ্গে যোগাযোগ হয়।ঢাকা যে আর আগের ঢাকা নেই দাদা্।আমার উত্তরাবাস থেকে শাহবাগ আসতে লাগে আড়াই ঘন্টা।আপনি শুনে ভয় পেলেন না তো…? তাই মাধ্যম ওই মুখোবই-ই।কত বছর দেখা হয়না শিল্পী আর আপনার কিংবদন্তি’র সঙ্গে।ওরা রাগ করে না।ওদেরও যে একই দশা।সবার মুখেই এখন জ্যামবন্দনা। এই জ্যামের শহরে আপনি কি করতেন? আমার যে খুব জানতে ইচ্ছে করে…।আমাদের ছেড়ে কতোটা ভালো আছেন  বড়ো জানতে ইচ্ছে করে।

শীতের রোদ্দুর খুব তাড়াতাড়ি ক্ষয় করে ফেলে তার আলো।আপনিও ঠিক এভাবেই চলে গেলেন।সব আলো বড়ো তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিলেন আমাদের উপর থেকে।এত্তোসব ভালোবাসার মানুষ রেখে বেলা ফুরিয়ে দিলেন?এতোটা তাড়া ছিলো আপনার…আমরা জানতেও পারিনি।খুব খুব রাগ হয় আপনার উপর । তাইতো মনখারাপের সঙ্গে আড়ি দিয়েই আপনাকে…।

ছবি: গুগল