মননে শ্রদ্ধায় স্মরণে পঁচিশে বৈশাখ ……

কাকলী পৈত

আমাদের বাঙালিদের কাছে পঁচিশে বৈশাখ  বাংলা সাহিত্যের অনন্য পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন পালনের
একটি আবেগররঞ্জিত দিন।তার রচিত গান কবিতা  পাঠ , তাকে নিয়ে  নানা আলোচনা সভার মধ্য  দিয়ে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আমরা তাকে স্মরণ  করে থাকি। শুধু আবেগ আর সম্মান প্রদর্শন করার জন্যই যে এই দিনটির প্রকৃত মূল্যায়ন তা নয়।আমরা যারা শৈশবে ইংরেজি স্কুলের প্রভাব মুক্ত তারা রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা হলেও জানার সুযোগ পেয়েছিলাম।আমাদের অক্ষর পরিচয় থেকে শুরু করে সহজ পাঠের ছোট ছোট লেখার মধ্যে দিয়ে মাত্রাজ্ঞান ,সহজেই বাংলা ভাষা শেখার প্রাথমিক পর্ব টুকু সমাপ্ত করেছিলাম। বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে তার কবিতা গল্প সাহিত্য জীবনে অনেকখানি জড়িয়ে গেছে। সেটা পাঠ্যসূচির মাধ্যমে হলেও তাকে জানার আগ্রহ ক্রমশ বেড়েছে। অন্যান্য লেখকদের প্রতি তাদের লেখার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি।আজকের শৈশব যা থেকে অনেকখানি বঞ্চিত।  তাদের কাছে বাংলা সাহিত্য অনেক টাই প্রশ্নচিহ্ন আর পঁচিশে বৈশাখ ও হয়ত  অন্যান্য দিনের মতই একটি সাদামাটা দিন।

সংস্কৃতি শব্দটির সঙ্গে ও পরিচয়
রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। ছোটবেলায়  স্কুলের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে  কবিতা বলতে  হলে তার কবিতাই আগে মনে হত ।গান গাইতে গেলে ও রবিঠাকুরের গানই গাইতাম। নাটক বা নৃত্যনাট্য যা পরিবেশিত হত তারই লেখা।  তার গান তার লেখা কোথাও যেন একটা অভ্যেস তৈরী করে দিয়েছিলো  তার সৃষ্টিকে আরো বেশি
করে গ্রহন করার। বড় হবার পরেও রবীন্দ্রসঙ্গীত রবীন্দ্রসাহিত্য সারা জীবন জুড়েই রয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথের গানে হৃদয়ের যে প্রশান্তি তার সঙ্গে অন্য কোন সঙ্গীতকে মেলানো যায়না। রবীন্দ্রনাথের গান এক অন্য মাত্রার অন্য পর্যায়। জীবনের সব স্হিতিতে সুখে দুঃখে, হাসি কান্নায়, আনন্দে বিষাদে,  সংকটে বিপদে, নির্জনে কোলাহলে  তার কবিতা বা গানের দু’কলি যে মনের আয়নায় ভেসে ওঠেনা তা নয়। বরং তিনি আমাদের মানসিক আশ্রয় হয়ে ওঠেন।পঁচিশে বৈশাখ তার জন্মদিনটিকে ঘিরে আমাদের উন্মাদনা উত্তেজনা কিছু কম ছিলনা। স্কুলে  রবীন্দ্রজয়ন্তী অনেক বড় করেই হতো। তাছাড়া আমরা পাড়ার ছেলেমেয়েরা কচিকাঁচারা মিলে নিজেরাই বাঁশ কাপড় যোগাড় করে
প্যান্ডেল তৈরী করে রবীন্দ্রজয়ন্তী করতাম । তার জন্য আবার দু মাস ধরে রিহার্সাল ও হতো। সে দিনগুলো এত
আনন্দের উৎসাহের  ছিল রবিঠাকুরের নাটকে নিজেরা অভিনয় করা নির্দেশক ঠিক করা সবটাই খুব অত্যুৎসাহে করা হত।  নিজের যা কিছু সৃষ্টিশীলতা  সবকিছুর প্রকাশ হয়েছিল যেন তারই হাত ধরে। আজকের দিনে হয়তো এই বিষয়গুলো খুব অমূলক তবু তিনি আমাদের কাছে আশৈশব স্মৃতিবিজড়িত।

এই দিনটি সারা বিশ্বেই খুব আনন্দঘন পরিবেশে শ্রদ্ধার সঙ্গে  পালন করা হয়। কিন্তু তাতেই আমাদের দায়িত্ব  শেষ হয়না। আজকের শৈশবের কাছে বাংলাভাষা বাংলাসাহিত্যের পরিচিতি ঘটাতে গেলে সহজ পাঠের হাত ধরেই করতে হবে।রবীন্দ্রনাথকে তাদের কাছে অনেক বেশি করে পৌছে দিতে হবে। তবেই তারা বাংলা সাহিত্যের বিপুল সম্ভারে সাঁতার কাটতে পারবে।স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও
তাকে জানার আগ্রহ তৈরী হওয়া দরকার।তার সৃষ্টিকে  নানা ভাষায় অনুবাদের চেষ্টা হলে ভিন্ন ভাষাভাষির দেশ
ভারতবর্ষের প্রতিটি গৃহে এবং সারা বিশ্ব বাসী তার সৃষ্টি র সাথে অনেক  বেশি  করে পরিচিত হবেন।

তিনি বাঙালি র প্রাণের  কবি
মনের কবি ।মনের গহন গভীরে তার স্বচ্ছন্দ অনুপ্রবেশ।সাহিত্যের  সব শাখায়  তার উজ্জ্বল  উপস্থিতি।রাজনীতি , রাষ্ট্র নীতি , ধর্মান্ধতা,  অস্পৃশ্যতা
সব কিছু র বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ  করেছিলেন। তিনি প্রথম এশীয় নোবেল জয়ী সাহিত্যিক।তার  সৃষ্টি  আমাদের  শৈশব কৈশোর যৌবন পেরিয়ে
যুগ হতে যুগান্তরে  কালোত্তীর্ণ ।বাংলা  ভাষা কে বিশ্বের
দরবারে পৌছে দেবার জন্য  বাঙালি  তার কাছে আজীবন  ঋণী । পঁচিশে  বৈশাখ  আর বাইশে শ্রাবণের
কবি শুধু  নন তিনি ।তিনি  চিরকালীন ।তিনি বিশ্ব কবি। তাই পঁচিশে বৈশাখ নানা অনুষ্ঠানে তাকে নিয়ে  বক্তৃতা তার কবিতা  গানের উন্মাদনা  র বাইরে
যদি একটু অন্য রকম ভাবে  ভাবা যায়!!!কিভাবে  তার সৃষ্টি কে আরো বেশি  সংখ্যক  মানুষের  কাছে পৌছে দেওয়া  যায় সকলেই যাতে তার সঠিক  মূল্যায়ন  করতে পারেন । তবে যাই হোক,প্রতিটি  বাঙালি হৃদয়ে,
‘আজি হতে শতবর্ষ  পরে ‘ও তার কবিতা  গান  বেঁচে  থাকবে।কবি তুমি  নব নব  রূপে এসো প্রাণে।
‘তোমার  প্রকাশ  হোক
কুহেলিকা করি উদঘাটন
সূর্যের  মতন।
ব্যক্ত হোক  জীবনের  জয়
ব্যক্ত  হোক  তোমা মাঝে
অসীমের  চির বিস্ময়।’

ছবি: গুগল