মনাকো: ক্ষুদ্র এই শহরটি সম্পদে ভরপুর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের পরিচালক যুগ্ম সচিব,বাংলাদিশ ট্যুরিজম বোর্ড

ভূমধ্যসাগরের তীরে আয়তনে পৃথিবীর দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম অথচ সবচাইতে সম্পদশালী ও ব্যয়বহুল দেশ মনাকো। মনাকোর অফিসিয়াল নাম Principality of Monaco। পশ্চিম ইউরোপের ফ্রান্স রভিয়োর একটি স্বাধীন সার্বভৌম নগর রাষ্ট্র মনাকো। এর উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বে ফ্রান্স এবং দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর।

অপরূপ মনাকো শহর

২.১ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট দেশটি ইউরোপের সবচাইতে ছোট এবং ভ্যাটিকান সিটির পর পৃথিবীর দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর মোট জনসংখ্যা ৩৯ হাজারের কাছাকাছি। এটি পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৯ হাজার মানুষের বাস।

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ইতালির মিলান থেকে একটি মাইক্রোবাসে আমরা পাঁচ জন মনাকোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি সকাল ০৮ টায়। ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আমরা দুপুর ১২ টায় মনাকো পৌছাই। মিলান থেকে জেনোয়া প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পথের দুদিকে বিস্তীর্ণ ভূমি। ছোট ছোট শহর সবুজে ঘেরা জনপদ। মসৃণ রাস্তা, লেক, পাহাড় ইত্যাদি মিলে অপরূপ সৌন্দর্য্য মন্ডিত পথ। জেনোয়া থেকে মনাকো পর্যন্ত ১৫০ কিলোমিটার পথ ভূমধ্যসাগরের কোল ঘেষে এগিয়ে চলেছে। কী অপূর্ব দৃশ্য। রাস্তা সরল এবং মসৃন। আঁকাবাঁকা, উচু নিচু কিছু নেই। যেখানে পাহাড় সেখানেই টানেল। ভূমধ্যাসাগরের উপকূল জুড়ে পাহাড়ের পাদদেশে নানা রঙের বাড়িঘর থরে থরে সাজানো। পাহাড় বৃক্ষরাজি আর সমুদ্রের জলরাশি মিলেমিশে একাকার। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের পি এস মো: জাহিদ হোসেনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, কারণ তার আগ্রহেই মনাকো যাওয়া সম্ভব হয়েছে। মনাকো ভ্রমণে আমার সঙ্গে আরো ছিলেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সহকারী পরিচালক মো: মহিবুল ইসলাম, পর্যটন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপক মো: সারওয়ার উদ্দিন এবং ট্যুরিজম উইন্ডোর সত্বাধিকারী এবং সিইও মো: মনিরুজ্জামান মাসুম।

কনস্যুলেট জেনারেল বাংলাদেশ মিলানের কনসাল ও দুতালয় প্রধান আমার প্রিয় সহকর্মী একে এম শামছুল আহসান মনাকো ভ্রমণের জন্য আমাদেরকে একটি মাইক্রোবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, যার চালক ছিল শ্রীলংকান বংশদ্ভুত একজন ইতালিয়ান। গাড়ী চালক অনবরত কথা বলছিলো আর ক্ষোভ প্রকাশ করছিলো ইতালি সরকারের পারিবারিক আইনের বিরুদ্ধে।

অপরূপ মনাকো শহর

এর কারন তার স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে তার এইট গ্রেডে পড়–য়া একমাত্র ছেলে তার সঙ্গে না থেকে মায়ের সঙ্গে আছে। তদুপরি তার আয়ের অর্ধেক আপনা আপনি চলে যাচ্ছে তার ছেলের মায়ের ব্যাংক হিসেবে। তার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে বলতেই হবে ইতালিতে নারী নিরাপদ, অন্তত আর্থিকভাবে। লোকটি ক্ষুদ্ধ হলেও আমি ভাবছিলাম নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়ে ইতালি সরকারের দৃঢ়তা ও অনমনীয়তার কথা। গাড়ী চালক বলছিলেন, এই আইনী নিষ্পেষণের কারণে ইতালীয় তরুনরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পায়। প্রকৃত অবস্থা কি তা যাচাই করার সুযোগ হয়নি।
আবার আসি মনাকো প্রসঙ্গে। আমরা যখন পৃথিবীর এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ভূখন্ডে প্রবেশ করি তখন মনে হলো, এসে গেছি আর কয়েক মিনিট। পাহাড়ের উপর থেকে গাড়ীর জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম নীচে ভূমধ্যসাগরের কোলে দুপুরের রোদে ঝলমল করছে একটি পরিপাটি শহর। মনে হলো দু’তিন মিনিটেই পৌছে যাব শহরে। কিন্তু আসলে তা নয়। আমাদের গাড়িটি সমুদ্র পৃষ্ঠের প্রায় ৫০০ ফুট উচু থেকে কম পক্ষে আট চক্কর খেয়ে অবশেষে মূল শহরে পৌছায়। পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটিকে খুবই শান্ত, স্নিগ্ধ ও মনোরম মনে হচ্ছিলো। কোথাও কোন শব্দ নেই, চিৎকার নেই, হৈ চৈ নেই, গাড়ির হর্নের আওয়াজ নেই। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে আপেল গাছে থোকায় থোকায় ঝুলে আছে পাকা আপেল। মনে হয়, পেড়ে খাওয়ার লোক নেই।

সাংবিধানিক রাজতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হয় মনাকো। প্রিন্স দ্বিতীয় আলবার্ট হচ্ছে মনাকোর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান। রাজনৈতিক প্রশাসনিক ও বিচার বিষয়ে অবারিত ক্ষমতা রয়েছে তার। ১৮৬১ সালে মনাকোর সার্বভৌমত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয় এবং ১৯৯৩ সালে মনাকো ভোটাধিকারসহ জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ সদস্য রূপে অন্তর্ভুক্ত হয়। মনাকোর পৃথক পররাষ্ট্র নীতি রয়েছে, রয়েছে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার তবে এর প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ফ্রান্সের, যদিও ক্ষুদ্র দুটি সামরিক ইউনিট রয়েছে মনাকোর ।
মনাকো আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়নি কিন্তু দেশটি ইইউ’র কিছু নীতিতে অংশগ্রহণ করে, বিশেষ করে কাস্টমস এবং বর্ডার কন্ট্রোল। ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে মনাকো মূদ্রা হিসেবে ইউরো ব্যবহার করে। দেশটি Council of Europe এ অংশগ্রহণ করে ২০০৪ সালে।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে মনাকোর অর্থনৈতিক উন্নতির সূচনা হয় প্রধানত দুটি কারণে প্রথমত: দেশটির প্রথম ক্যাসিনো বিখ্যাত মন্টিকার্লোর সূচনা এবং দ্বিতীয়ত: প্যারিসের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপন। মনাকোর ¯িœগ্ধ আবহাওয়া, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জুয়া খেলার অবারিত সুযোগ এই দেশটিকে বিত্তবান মানুষের পর্যটন ও বিনোদনের আকর্ষণীয় কন্দ্রেে পরিণত করছে।ে সাম্প্রতিককালে মনাকো পরিণত হয়েছে ব্যাংকিং সেন্টার তথা গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতের নিরাপদ ও লাভজনক জায়গা হিসেবে।

চিত্রকরগণ ছবি আঁকছে পর্যটকদের নিকট বিক্রয় করার জন্য

মনাকোতে কোন আয়কর দিতে হয় না এবং ব্যবসায় করও খুবই নগন্য। এ দেশটি কর স্বর্গ Tax Haven হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালেই দেশটির ৩০ শতাংশ মানুষ মিলিয়নিয়ার হিসেবে পরিগনিত হয়। ব্যবসা ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও কোম্পানী কর খুবই নগন্য এবং সহজ হওয়ার কারণে পৃথিবীর প্রায় একশ’টি দেশের মানুষ মনাকোতে তাদের সম্পদ বিনিয়োগ অথবা গচ্ছিত রেখেছে নির্বিঘেœ, নিরাপদে।
মনাকোর রাজা প্রিন্স তৃতীয় রাইনিয়ার এবং তার স্ত্রী বিখ্যাত অভিনেত্রী গ্রেস ক্যারী ১৯৮২ সালে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে প্রিন্স দ্বিতীয় এলভার্ট মনাকো সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখনও তিনি তার দায়িত্ব পালন করছেন। ১১৬০ সালে বর্তমান রাজা প্রিন্স দ্বিতীয় এলভার্টের পূর্বপুরুষ গিরমালডো রিপাবলিক অব জেনোয়া থেকে মনাকো প্রতিষ্ঠা করেন। ইউরোপের যে তিনটি রাষ্ট্রের দৈনন্দিন রাজনীতিতে রাজতন্ত্র এখনও সক্রিয়ভাবে কার্যকর মনাকো তার মধ্যে একটি। রাজা অথবা রানী সংবিধান ও আইন অনুসারে তার র্কতৃত্ব প্রয়োগ করে থাকেন। তিনি বিদেশে মনাকোর প্রতিনিধিত্ব করেন, বিদেশ নীতি নির্ধারণ করেন। দেশের জাতীয় কাউন্সিলের সম্মতি ক্রমে তিনি দেশের সংবিধান ও আইন পরিবর্তন করতে পারেন। আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হলে রাজা বা রানী তা উত্থাপন করেন এবং জাতীয় কাউন্সিলের ভোটে তা অনুমোদিত হয়। বর্তমান সংবিধান অনুসারে রাজা বা রানী হচ্ছেন আদালত ও ট্রাইবুন্যালের প্রধান। তার নামেই বিচার কার্য পরিচালনা করা হয়। রাজা বা রানী পদক, সম্মান, এওয়ার্ড প্রদান করতে পারেন। ২০১৫ সালে রাজ পরিবারের জন্য বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ ছিলো সাড়ে ৪৩ মিলিয়ন ইউরো বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ হবে ৪২০ কোটি টাকা।

সুন্দর, পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন, মনোরম একটি দেশ মনাকো। পুরো দেশটি একটি শহর, প্রাচীন রোমান নগর রাষ্ট্রের মতো। ক্ষুদ্র এই শহরটি সম্পদে ভরপুর। বলা হয় মনাকো বিশ্বের সবচাইতে ধনী দেশ, সবচাইতে ব্যয় বহুল দেশ। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট সমুদ্র উপকূল রয়েছে মনাকোতে। মাত্র আড়াই মাইল। সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা এই উপকূলে ভূমধ্যসাগরের জলরাশি আঁচড়ে পড়ে অপূর্ব দৃশ্যের অবতারনা করে। এই উপকূল নিরাপদে ব্যবহারের জন্য রয়েছে নানা আয়োজন, শিশুদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। চেষ্টা চলছে ভূমধ্যসাগর থেকে ভূমি উদ্ধারের। ইতোমধ্যে মূল ভূখন্ডের ২০ শতাংশ জমি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

অপরূপ মনাকো শহর

মনাকো যেহেতু খুবই ব্যয়বহুল দেশ তাই সেখানে রাতে অবস্থান না করে মাত্র ৫৫ কিলোমিটার দূরে ফ্রান্সের বিখ্যাত শহর নীস এ অবস্থান করা যায়। সুন্দর শহর নীস মনাকোর মতো ব্যয়বহুল নয়, তদুপরি দেখতেও সুন্দর। নীস সম্পর্কে পরে অন্য কোথাও লেখা যাবে।
‘মন্টি কার্লো’ খ্যাত মনাকো পর্যটন ও বিনোদনের প্রাণ কেন্দ্র। এ দেশটি বিশ্বের ধনী ও সম্পদশালী ব্যক্তিদেরকে আকৃষ্ট করে সম্পদ নিরাপদে রাখার জন্য, আনন্দ বিনোদনের জন্য। বিত্ত বৈভব না থাকলেও এ দেশের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। মাত্র একদিনেই পুরো দেশ দেখা সম্ভব। পর্যটন আকর্ষণের পরিশীলিত এ দেশটি ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে হাতছানি দেয়।

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]